ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি
‘যুদ্ধের সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করলে লাইসেন্স বাতিল’
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৮
‘যুদ্ধের সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করলে লাইসেন্স বাতিল’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

ইরান যুদ্ধ কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুদ্ধের সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করলে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে।


আল-জাজিরায় সাংবাদিক ব্রায়ান ওসগুডের লেখা এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতার মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করছে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন। বিবার্তা পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো—


ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধের সমালোচনা করে সংবাদ পরিবেশন করলে সংবাদমাধ্যমগুলোর লাইসেন্স হুমকির মুখে পড়তে পারে। মার্কিন প্রশাসন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তথ্য ‘বিকৃত’ করার অভিযোগ এনেছে।


ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইরান যুদ্ধের সমালোচনামূলক খবর প্রচার করলে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে। এফসিসি চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার সাফ জানিয়েছেন, গণমাধ্যমকে ‘জনস্বার্থে’ কাজ করতে হবে, অন্যথায় ভুয়া খবর বা তথ্য বিকৃতির অভিযোগে লাইসেন্স নবায়নের আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, “সম্প্রচারকারীদের অবশ্যই ‘জনস্বার্থে কাজ করতে হবে’, অন্যথায় তাদের লাইসেন্স হারাতে হবে।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, ‘যেসব সংবাদমাধ্যম ধোঁকাবাজি এবং ভুয়া খবর (ফেক নিউজ) প্রচার করছে, তাদের লাইসেন্স নবায়নের সময় আসার আগেই সতর্ক হওয়া উচিত।


কারের এই বক্তব্যকে সংবাদমাধ্যমের ওপর এক ধরনের চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগেও তিনি এমন বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর কৌতুক অভিনেতা জিমি কিমেলের ওপর চটেছিলেন কার। কিমেলের রাতের শোতে প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করা হতো। তখন কার এবিসি (ABC) চ্যানেলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তারা কিমেলের আচরণ পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেয়। এমনকি একটি পডকাস্টে তিনি কিমেলকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘কাজটা আমরা সহজভাবেও করতে পারি, আবার কঠিনভাবেও করতে পারি।’ এই মন্তব্যের পরপরই এবিসি সাময়িকভাবে কিমেলের শো বন্ধ করে দিয়েছিল।


কারের সাম্প্রতিক বক্তব্য শোনার পর রাজনীতিবিদ এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা একে সেন্সরশিপ বা গণমাধ্যমের মুখ চেপে ধরার চেষ্টা বলে মনে করছেন। হাওয়াইয়ের সিনেটর ব্রায়ান শাটজ লিখেছেন, ‘এটি পরিষ্কার নির্দেশ— হয় যুদ্ধের ভালো ভালো খবর দেখাও, না হলে লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কৌতুক অভিনেতার ঘটনার চেয়ে এটি অনেক বেশি ভয়াবহ। কারণ, এখানে ঝুঁকি অনেক বেশি। তিনি কোনো হাসির অনুষ্ঠানের কথা বলছেন না, তিনি বলছেন যুদ্ধের খবরের কথা।’


ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিভিজুয়াল রাইটস অ্যান্ড এক্সপ্রেশন (ফায়ার)-এর অন্যতম পরিচালক অ্যারন টের একইভাবে যুদ্ধের খারাপ খবর বন্ধ করার চেষ্টার জন্য কারের সমালোচনা করেছেন। টের বলেন, ‘সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী সরকার নিজের চালানো যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো তথ্য সেন্সর করতে পারে না।’


যুদ্ধের খবর নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ


সৌদিতে ইরানের হামলায় আমেরিকার তেলের বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে— গণমাধ্যমের এমন খবরের ওপর রেগে গিয়ে ট্রাম্প একটি পোস্ট দেন। সেই পোস্টের পরেই কার তার বক্তব্যটি দিয়েছেন। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ লেখেন, ‘ঘাঁটিতে কয়েক দিন আগে হামলা হয়েছিল, কিন্তু বিমানগুলোর ক্ষতি হয়নি বা ধ্বংস হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচটার মধ্যে চারটার কোনো ক্ষতিই হয়নি এবং সেগুলো ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে।’


প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক সংবাদ কভারেজ এবং ভিন্নমতকে শাস্তি দিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। রাজনীতিবিদ ও বাকস্বাধীনতা কর্মীরা একে সেন্সরশিপ হিসেবে নিন্দা করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।


প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, উল্টো খবরগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে ভুল বোঝানোর জন্য দেওয়া হচ্ছে। তিনি লেখেন, “বাজে ‘পত্রিকা’ এবং মিডিয়া আসলে চায় আমরা যুদ্ধে হেরে যাই।” এভাবে প্রেসিডেন্ট এবং তার সহযোগীরা সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে ভিন্ন মতকে দমনের চেষ্টা করছেন। ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।


জনমত ও যুদ্ধের বাস্তবতা


যদিও ট্রাম্প দাবি করছেন যুদ্ধ সফলভাবে এগিয়ে চলছে, কিন্তু জনমত জরিপ ভিন্ন কথা বলছে। কুইনিপিয়াকের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধী। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৬০ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার। তাছাড়া আইন বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছেন, কারণ আন্তর্জাতিক আইন বিনা উস্কানিতে আক্রমণ নিষিদ্ধ করে।


অন্যদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের অব্যাহত হামলা এবং বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তারা জিতে গেছেন। চলতি সপ্তাহে কেনটাকিতে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জিতেছি। আমি আপনাদের বলছি, আমরা জিতেছি। প্রথম ঘণ্টাতেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।’


গণমাধ্যমকে দোষারোপ


এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন জনমতকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার জন্য সংবাদ মাধ্যমকে দোষ দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘তারপরও গণমাধ্যমের এই দলের কেউ কেউ যেন থামতেই চাইছেন না।’ ফক্স নিউজের সাবেক সঞ্চালক হেগসেথ সাংবাদিকদের ‘দেশপ্রেমিক’ হতে এবং যুদ্ধের ইতিবাচক খবর দিতে বলেন। টিভিতে যখন লেখা ওঠে ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাড়ছে’, তখন তিনি তার সমালোচনা করেন।


জরিপ অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধী এবং আইন বিশেষজ্ঞরা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলছেন। অথচ হরমুজ প্রণালী বন্ধ এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা সত্ত্বেও ট্রাম্প দাবি করছেন, ‘আমরা জিতেছি, প্রথম ঘণ্টাতেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল’
হেগসেথ বলেন, “তার বদলে কী লেখা উচিত? ‘ইরান ক্রমেই দিশেহারা হয়ে পড়ছে’— কেমন হয়? কারণ তারা আসলেই দিশেহারা। তারা সেটা জানে এবং আপনারা যারা খবর দেখছেন, আপনারাও জানেন; যদি সত্যিটা স্বীকার করেন।”


সিএনএন নিউজ চ্যানেলের একটি খবরেরও তীব্র নিন্দা করেন হেগসেথ। সেই খবরে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প সরকার ভুল ভেবেছিল যে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে পারবে না। একই সঙ্গে হেগসেথ রসিকতা করে বলেন, তিনি আশা করেন একটি চুক্তির মাধ্যমে শিগগিরই সিএনএন ‘ডেভিড এলিসনের’ নিয়ন্ত্রণে আসবে। ডেভিড হলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং টেক এক্সিকিউটিভ ল্যারি এলিসনের ছেলে। তিনি যোগ করেন, ‘ডেভিড এলিসন যত তাড়াতাড়ি ওই নেটওয়ার্কের দায়িত্ব নেবেন, ততই মঙ্গল।’


লেখক : ব্রায়ান ওসগুড, আল-জাজিরা।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com