
রক্তরাঙা সেই পলাশ-শিমুল ফোটা দিনের স্মৃতি নিয়ে আজ ফিরে এলো ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি। আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিবসটি উপলক্ষ্যে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নেমেছে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রায় সব শ্রেণির মানুষই গভীর রাত থেকে শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন । সময়ের সাথে সাথে ফুল হাতে শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে বাড়ছে সারি।
১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউররা। আজ সেই আত্মত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল ৭৪ বছর পূর্ণ হলো।
একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্যদিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গেয়ে নগ্নপদে প্রভাতফেরি নিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা শহীদ মিনারে সমবেত হচ্ছেন। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি শহীদ মিনার আজ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে বীর সন্তানদের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতায়। দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। সরকারি-বেসরকারি সব ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং উত্তোলন করা হয়েছে শোকের প্রতীক কালো পতাকা।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং দেশ গড়ায় একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও দিনভর আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালন করছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাজপথে নেমে এলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন এবং গায়েবি জানাজায় অংশ নেন। শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে তৈরি করা হয় প্রথম শহীদ মিনার, যা ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয় তৎকালীন সরকার।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৫৪ সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাসের মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
বাঙালির এই আত্মত্যাগ আজ বিশ্ববাসীর সম্পদ। ১৯৯৮ সালে কানাডাপ্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালামের উদ্যোগে গঠিত ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর প্রচেষ্টায় এবং বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিবসটি প্রতিবছর পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।
আজকের এই দিনে জাতি কেবল ভাষাশহীদদের স্মরণই করছে না, বরং মায়ের ভাষার শুদ্ধ চর্চা এবং অপসংস্কৃতি রোধে নতুন করে শপথ গ্রহণ করছে। একুশ মানে মাথা নত না করা–সেই চেতনাই আজ বাঙালির হৃদয়ে অম্লান।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]