ছাত্রনেত্রী রুশী চৌধুরীর জীবনের গল্প
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২১, ২২:০২
ছাত্রনেত্রী রুশী চৌধুরীর জীবনের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করতো বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও? আমার সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো আর রাজিবুল হক রনি ভাইয়ার মতো রাজনীতি করবো। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি পরীক্ষায় তৃতীয় হওয়া আমার বড় ভাইটি বিএনপির আমলে ছাত্রলীগের রাজনীতি করার অপরাধে অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ওর রাজনীতির সততা ও সাহস আমার কিশোরী মনে অনুপ্রেরণা দিতো, মুগ্ধ করতো। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখেছি বড় হয়ে রাজনীতি করার। কেননা আমার রক্তেই যে মিশে আছে, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় শেখ হাসিনা’র স্লোগান। এর পেছনেও রয়েছে আরো অনেক ঘটনা।


এভাবেই শৈশবে রাজনীতিকে নিয়ে দেখা স্বপ্নের কথাগুলো বলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চারুকলা অনুষদের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা তুজ জোহরা চৌধুরী রুশী। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পাঠাগার-বিষয়ক উপ-সম্পাদক এবং ছাত্রলীগের সংস্কৃতি-বিষয়ক উপ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি-বিষয়ক উপ-কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে আছেন।


রুশীর কিশোরী মনে রাজনীতি নিয়ে দেখা স্বপ্ন আর সেটা পূরণ এবং আজকে রাজনীতিতে এই পর্যন্ত আসার পেছনে রয়েছে আরো নানান ঘটনা। ওই ঘটনা ঘটেছে তার জন্মেরও আরো অনেক আগে। তাহলে কী সেই ঘটনা? চলুন জেনে নেয়া যাক।


ময়মনসিংহের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম ফাতেমা তুজ জোহরা চৌধুরী রুশীর। বাবা ব্যবসায়ী আর মা গৃহিণী। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রুশী সবার ছোট। বড় বোন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে অনার্স ও জগনাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে এখন বেসকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। ভাই রাজিবুল হক রনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারী ইউনিটের সহকারি অধ্যাপক। তিনি ঢাকা মেডিকেল ছাত্র সংসদের জিএস এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। সেইসাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সহ-সম্পাদক ছিলেন।



কথায় কথায় জানা গেলো, রুশীর মা ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথম দেখা, তাঁর কথা ও ব্যবহারে মুগ্ধ হন তিনি। এর পেছনে রয়েছে এক স্মরণীয় ঘটনা। রুশী বলেন, মার সাথে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি সাক্ষাৎ হয় ১৯৬৯ সালে। তখন মা কিশোরী। বঙ্গবন্ধু একটা কাজে ময়মনসিংহের ৩৩ নম্বর কলেজ রোড সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের বাসায় যান। মা থাকতেন ১২ নম্বর কলেজ রোডে নানুর বাসায়। আমার নানুর বাসা আর শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের বাসা ছিল একদম মুখোমুখি। মার বাল্য বান্ধবী ছিলেন বিলকিস। ওইদিন বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে কলেজ রোড পাড়ায় ছিল আনন্দ উৎসবের আমেজ। কিন্তু কেন এতো আনন্দ সেটা মা ও তার বান্ধবী বিলকিস জানতেন না। তারা শুধু শুনেছেন এখানে এক মহামানুষ এসেছেন। মহামানুষকে এক নজর দেখার কৌতুহল তাদের বেড়ে যায়। নজরুল সাহেবের বাসায় এতো মেহমানের সমাগম দেখে দুই বান্ধবী দৌড়ে ভেতরে যান। ঢুকতে ঢুকতেই দেখেন বিয়ে বাড়ির মতো চলছিল রান্নার সব আয়োজন। কৌতুহলের মাত্রা তাদের আরো বেড়ে গেলো। দুই বান্ধবী এক দৌড়ে নজরুল সাহেবের ঘরে ঢুকে পড়েন। ঢুকেই থমকে যান তারা।


মায়ের ভাষায়, ওই ঘরে ছিল অনেক মানুষ। কিন্তু শুধু আলাদা করা যায় এমন এক সুঠাম গড়নের লম্বা চওড়া-ব্যক্তিত্ববান মহা-মানুষ গোসল সেরে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চুল আঁচড়াচ্ছেন। প্রথম দেখা পেছনটা এবং সামনের দিকটা আয়নায়। ভালো লাগার কি যে এক অদ্ভুদ অনুভূতি হয়েছিল তা বলে বোঝানোর মতো ভাষা জানা নেই। তাকে দেখে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। জীবনে এতো উঁচু মানুষ তখনও দেখিনি। কি সুঠাম গড়ন! ভরাট কণ্ঠস্বর। বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, চিরুনি টা কই? কণ্ঠে যেন দেবদূতের শব্দ। আজো এতো বছর পর, সব ছবির দৃশ্যের মতো অম্লান স্মৃতি হয়ে আছে আমার মনে। পেটের একটু উপরের দিকে একটা লুঙ্গি পরা, সাদা গেঞ্জি পরা, পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল। অবাক হয়ে দেখা বন্ধ করে আমরা দুই বান্ধবী যখন ফিরে আসচ্ছিলাম, ঠিক তখন আমাদের দুই কিশোরীকে দেখে অনেকটা আদর মাখা কণ্ঠে বললেন, তোমরা চলে গেলে এতো খাবার খাবে কে? বঙ্গবন্ধুর সাথে আমাদের কিছু সময় আলাপ হয়েছিল। চলে আসার আগে বঙ্গবন্ধু আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। তার সেই যে বলিষ্ঠ কণ্ঠের আদর মাখা স্বর, আমি কোন দিনও ভুলিনি। আজোও ভুলতে পারি না। অল্প বয়সের জন্য ৬৯ সালের ওই দিন হয়তো বুঝিনি, উনি কে ছিলেন কিন্তু যতো জেনেছি, যতো শুনেছি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে কেবল মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে এসেছি। এযেনো এক মহাপুরুষ।


রুশী বলেন, আমার মাকে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা বলবো না, কারণ তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাড়ি ছেড়ে যেতে পারেননি। নানুর পরিবার রক্ষণশীল হওয়াতে মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ ছিল। মায়ের ভাষায়, ৭১ সালে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে পাগল হয়ে উঠেছিলাম। আমরা কিশোরী মেয়েরা কি যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে নেমে যেতে পারি? স্বাধীনতার স্বপক্ষে কাজ করতে কতো ফন্দি অ্যাঁটেছি। কোন সুযোগ ছিল না। কলেজ রোড থেকে সেন বাড়ি, বড় চাচার বাসায় যেতে মাথায় কাপড় দেয়া, সাবধানে যেতে হতো। কি করে যুদ্ধে নামবো? মুক্তিযোদ্ধা বড় চাচার বড় ছেলে মোজাম্মেল ভাইকে যুদ্ধে সাহায্য করা ছিল আমার প্রথম যুদ্ধে অংশগ্রহণ। তবে ঘরে থেকেই ১১নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, তাদের খাবার সরবরাহ করা, অস্ত্র, গ্রেনেড লুকিয়ে রাখা, তা জায়গা মতো আবার কাছে পৌঁছে দেবার মতো কাজগুলো করেছি।



রুশীর নানুর পরিবারের সবাই প্রত্যক্ষভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। সেইসাথে বাবার দিক থেকেও। তার বড় চাচা ,বড় মামা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি একবারের জন্যও পরিবারের সাথে দেখা করতে আসতে পারেননি।


পারিবারিক সূত্রেই রুশীর রক্তে বইছে রাজনীতির ধারা। সব সময় তিনি খেয়াল করতেন পরিবারে মা-বাবা, চাচারা, মামা, খালা, নানু মিলে যখন আড্ডা দিতেন তখনই সবাই রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে কীভাবে পরিবারে ফুটিয়ে তোলা যায়, বঙ্গবন্ধুর কাজ, নীতি নিয়ে নানান আলোচনা করতেন। এসব আলোচনা রুশীর কিশোরী মনে দোলা দিতো।


ঢাকা ইস্পাহানি স্কুলে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে রুশী চলে যান ময়মনসিংহে। সেখানে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। আবার ঢাকায় গিয়ে ভর্তি হন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তার টার্গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। বিপত্তি ঘটে সাবজেক্ট নিয়ে। কোনো সাবজেক্ট পছন্দ হচ্ছিল না। পরে একদিন চারুকলার পাশ যাওয়ার সময় খোঁজখবর নিয়ে কোচিং করতে যান চারুকলায়। ভেতরের কোচিংয়ের পরিবেশ আর শিক্ষা দেয়ার স্টাইল তাকে মুগ্ধ করে। ড্রয়িংয়ের হাত মোটামোটি ভালই ছিল। কোচিং করে চান্স পান। তখন চারুকলায় পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর ভর্তিও হন। ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ক্লাস শুরু করেন রুশী। ছোটবেলায় দেখা বড় হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে রাজনীতি করার স্বপ্নে যোগ হলো তার নতুন পালক।


চারুকলায় পড়ার সময়ের স্মৃতিচারণ করে রুশী বলেন, প্রথম বর্ষে ক্যাম্পাসে ঢুকেই চারুকলা থেকে যাদের রাজনীতি করতে দেখেছি তাদের সাথে মিশতাম, আড্ডা দিতাম। তখন সিনিয়রদের কাছে রাজনীতি করার আগ্রহের কথা জানালে তারা বলতেন, আরে তোর ভাই তো ঢাকা মেডিকেলের বড় নেতা ছিল। তুই নরম মেয়ে। আমরা আছি তো। তোর আলাদা করে রাজনীতি করা লাগবে না।


আমি জানি উনারা এটা কেনো বলতেন। আমার সম্পর্কে উনাদের ধারণা ছিল আমি বাসার ছোট মেয়ে। খুব আদরে বড় হয়েছি। যারা রাজনীতি করে তাদের অনেক শক্ত মনের হতে হয়। আমার দ্বারা রাজনীতি করা হবে না। আমি যে খুব বেশি শক্ত মনের মেয়ে, এটা কেউ আগে বোঝতে পারেননি। বাস্তবে আমি একটু ভিন্ন ধরনের মেয়ে ছিলাম। আমার জীবনের নীতি-আদর্শ সত্যের ও ভালো কাজে সমর্থন করা।


তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের চলমান কমিটিতে চারুকলার দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে রাজনীতি করার আগ্রহের কথা জানান রুশী। তারা জানান, রাজনীতি করবি, তুই তো কোনো হলে থাকিস না। হলে না থাকলে তোর জন্য এটা কঠিন হয়ে যাবে। আর চারুকলায় ইতোমধ্যেই কমিটি চলছে। এখন কাউকে নেয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। তবে তুই সেন্ট্রালে একটা এক্সটেন্ডেড কমিটি হবে সেখানে তুই চেষ্টা করে দেখতে পারিস।


রুশী বলেন, চারুকলার সিনিয়রদের এই কথার পরে তাদের সাথে নিয়মিত ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে যাওয়া আসা শুরু করি। তাদের সাথে বিভিন্ন আড্ডায় যোগ দেই। তবে কোন নির্দিষ্ট নেতাকে অনুসরণ করিনি। আমার জীবনের নীতিটা একটু ভিন্ন। যে নেতার আন্ডারে রাজনীতি করবো, তার প্রতি যদি হৃদয় থেকে কোনো শ্রদ্ধা, সম্মানই না আসে, তাহলে তাকে নেতা বলে ডাকা বা দেখানো স্মান প্রদর্শন করে কাজ করবো কীভাবে? আর কমিটিতে কোনো পোস্টের জন্য কাউকে তেলানোর স্বভাব আমার ছিল না। রাজনীতিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে সব আলাপ-আলোচনা বাসায় বাবা-মা, বড় ভাইয়ের সাথে হতো। সেই সাথে আশরাফ মামার সাথেও এসব বিষয়ে কথা বলেছি। পারিবারিক সূত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ষষ্ঠ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন আমার মামা। নানুর বাড়ি ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বাড়ি পাশাপাশি ছিল। ওই সময় থেকে আশরাফ মামার পরিবারের সাথে নানু, মা, মামাদের একটা শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে উঠে। সে সুবাদে মামার সাথে আমাদের পরিবারেরও ভাল সম্পর্ক হয়ে আসে। আশরাফ মামা আমাকে অনেক স্নেহ করতেন।



২০১৬ সালে চারুকলায় ছাত্রলীগের নতুন কমিটি হলো। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চারুকলা অনুষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান রুশী। শুরু হয় তার কমিটির দায়িত্ব নিয়ে পথচলা। দলে দায়িত্ব পেয়েও যেকোনো মিটিং-মিছিলে পেছনেই থেকেছেন তিনি। এ বিষয়ে রুশীর ভাষ্য, অন্যদের ধাক্কা দিয়ে পেছনে ফেলে রেখে মিছিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই কী মুজিব সৈনিকের পরিচয় ও তার আদর্শ বেশি বুঝানো হয়ে যায়? বিষয়টা আমার মাথায় ঢুকে না। আমি তখন প্রথম বর্ষে পড়ি। শাহবাগ আন্দোলনের সময় চারুশিল্পীদের যেদিন ডাকা হয়, উপস্থিতির দিক দিয়ে আমি ছিলাম তৃতীয়। তারপর চারুকলার সিনিয়রদের নির্দেশ মতো কাজ করেছি। তখন নব দা, চঞ্চল দা, মৌ আপু, রিয়া আপুদের সাথে সাথে সব সময় মিছিলে থেকেছি উনাদের পিছে। উনারা সামনের জায়গা ডিসার্ভ করেন। তাই পিছে থেকেও স্লোগান দিয়ে গলা ভেঙে ফেলে তা ফলাও করে ফেসবুকে দেইনি। আমি খুব শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমি কারো পিছে লাগি না। কেউ পিছে লাগলে তাকায় হাসি দিয়ে বলি প্রকৃতিই এর জবাব দেবে আল্লাহ এর তরফ থেকে।


২০১৬ সালেরর শেষের দিকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সেন্ট্রাল কমিটি হবে। তখন রুশী আশরাফ মামার সাথে কথা বলেন। মামা তাকে ছাত্রলীগের সেন্ট্রাল কমিটির সব প্রোগ্রামে যাওয়া পরামর্শ দেন। সে মতে তিনি সব প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। যখন ছাত্রলীগের সেন্ট্রাল কমিটি গঠন করা হয় তখন তাকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সংস্কৃতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়।


চারুকলায় পড়ার সময় ডাক্টার রনি ভাইয়ের সাথে ঢাকা মেডিকেলের কোয়াটারে থাকতেন আত্মপ্রত্যয়ী রুশী। ক্লাসে যাওয়া আসার বাসা থেকে টাকা নিয়ে চলবেন, ক্লাস করবেন এরকম ভাবনা কখনো ছিল না তার। সব সময় মনে হতো পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে এমন কিছু একটা করতে হবে, যেটা দিয়ে অন্তত হাত খরচটা চালানো যায়।


রুশীর ভাষ্য, বাবা-মা, ভাইয়া (রনি) সবসময় আমাকে হাত খরচের টাকা দিতো। আপু-দুলাভাই (তখন দুলা ভাই বেঁচে ছিলেন) বেড়াতে আসলেও আমাকে কিছু কিছু না কিছু দিতোই। মা আমাকে সব সময় বলতো, নিজে নিজে কিছু একটা করবা। এটা এই জন্যই করবা যাতে করে খুব ছোট করে হলেও কাওকে কিছু কিনে দিতে পারো। দেখবা ভালো লাগবে। মায়ের কথাটা আমাকে আরো অনুপ্রেরণা দেয়। তো কি করবো বা কি করা যায়, ভাবতে ভাবতে চারুকলায় যেয়ে দেখলাম আমাদের ব্যাচের ছেলে-মেয়েরা কোন না কোন আর্ট একাডেমিতে ক্লাস নেয়। খোঁজ-খবর নিয়ে আমিও একটা আর্ট স্কুলে ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। স্কুলটা বনশ্রীতে ছিল। ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ওই বাসে করে জ্যাম ঠেলে বনশ্রী যেতাম, ফেরার সময় সিএনজিতে আসতাম। আমি একদমই বাসে অভ্যস্ত ছিলাম না।



এদিকে তখন আবার শাহবাগে আন্দোলন চলছিল। মিছিলের পেছনে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিয়ে ভাঙা গলা নিয়ে ক্লাস করতেন রুশী। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের পর আবার আর্ট স্কুলে ক্লাস নেয়া। দুই মাসের মতো ক্লাস নিয়ে কুলাতে না পেরে বনশ্রীর আর্ট স্কুলে কাজটা ছেড়ে দেন। জয়েন করেন বেইলি রোডের আরেকটা আর্ট স্কুলে। ওখানে সাড়ে চার বছর ক্লাস নেন। সেইসাথে দুটা টিউশনিও করতেন। সপ্তাহে ১দিন করে যেতে হতো। একটায় পেতেন ৪ হাজার, আরেকটায় ৩ হাজার। মোট সাত হাজার। আর্ট স্কুলের টাকা তো ছিলই।


বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়টাতে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে যুক্ত ছিলেন রুশী। বিভিন্ন পত্রিকাগুলোতে টুকটাক ফটোশ্যুটের কাজ করতেন। কয়েকটা ফ্যাশন হাউজের কাজ করেছেন। একটা কোম্পানির পাঞ্জাবির ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। বেশ কয়েকটা টিভিসিতে কাজ করেছেন। তার প্রথম টিভিসিতে কাজ ছিল অ্যাপেল বক্সের সাথে। তাও আবার এয়ারটেলের একটা টিভিসি। যদিও খুব অল্প সময় দেখা যায়, তাও প্রথম কোন কাজ বলে কথা। বিশাল ব্যাপার। কয়েকদিন যাওয়ার পর কেনো যেন তার ক্যামেরার সামনের কাজ থেকে ক্যামেরার পেছনের কাজ বেশি ভালো লাগতে শুরু করে। পরে অ্যাপেল বক্সে তিন মাস ইন্টার্নশিপ করেন। এরপর কারখানা প্রোডাকশন হাউজে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে এক বছরের মতো কাজ করেন। এরপর দেশ টিভিতে একটা অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করেন দুই মাস।


এদিকে আবার দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে সাংবাদিকতা বা লেখালিখির শুরু করেন রুশী। তিন মাস ইন্টার্নশিপ করার সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হয়। ইত্তেফাকের চাকরিটা যখন পারমানেন্ট হবার কথা, ঠিক তার আগেই ছাত্রলীগের সেন্ট্রাল কমিটিতে যোগ দেন তিনি। দায়িত্ব বেড়ে গেলে ইত্তেফাকের চাকরিটাও ছেড়ে দেন।


মানুষ হিসেবে ভাল কাজের জন্য প্রচণ্ড জেদি রুশী। কোন কিছু পাওয়ার চিন্তা মাথায় চাপলে সেটা নিজের করে না পাওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়ার পাত্রী নন তিনি। অনার্স শেষ করার রুসির মা বলেন, তোমার ছোটবেলার স্কুল ইস্পাহানিতে চাকরির সার্কুলার দিয়েছে। একজন আর্ট টিচার নেবে। চেষ্টা করো। উত্তরে রুশী জানান, স্কুলে চাকরি? আমার পক্ষে শিক্ষকতা করা সম্ভব না। স্কুলের শিক্ষকদের অনেক ধৈর্য লাগে। মা বললেন, জানি ট্রাই করবা না এই জন্যই যে, স্কুলে শিক্ষক নেবে একজন, আর আবেদন পড়বে অসংখ্য। আর সেই প্রতিযোগিতায় তোমার চাকরিটা হবে না, তাই না? মায়ের কথায় মাথায় প্রচণ্ড জেদ উঠে তার। আবেদন করেন। ওখানেও চাকরি হয় রুশীর। বিপত্তি হয় অন্যদিকে। প্রতিদিন সকাল ৭ টায় শাড়ি পরে স্কুলে যাওয়া, রিপোর্টিং করা, ৭ টা থেকে ২টা পর্যন্ত স্কুলে ক্লাস নেয়া, কতো কাজ। স্কুল শিক্ষকদের এতো কষ্ট? নতুন চাকরি। তিনদিন করার পর মানসিক দ্বন্দ্বে আর টানাপোড়নে পড়ে সেটাও ছেড়ে দেন তিনি।


রুশী বলেন, তখন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ সকল শিক্ষকদের জন্য খুব খারাপ লাগছিল। মানুষ হিসেবে উনারা খুবই চমৎকার। প্রচণ্ড ধৈর্য নিয়ে মেয়েদের ক্লাস করান। উনারা আমার ছোটবেলার শিক্ষকও। উনাদের সাথে কাজ করতে যেয়ে আমার সম্মানটা আরো কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার সমস্যা শুরু হলো অন্য জায়গায়। আমি মন থেকে এই চাকরিটা করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই তিনদিনের মাথায় চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে হাঁটা দিলাম। মাকে কল দিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার কথা জানালে মা পারে তো আমাকে ফোনেই গিলে ফেলে। আমি চিল মুডে ক্যাম্পাসে চিত্রন-সুপ্রিয়ার সাথে আড্ডা দিয়ে বাসায় গেলাম। বাসার পরিবশে পুরো থম থমে। দেখি বাবা মিট মিট করে হাসে। সাথে যোগ দেয় ভাবিও। রনি ভাইয়া বলে, কী চাকরিটা ছেড়েই দিলা নাকি? আমি হাসলাম। পরে আমার উপরে আর কেউ কোন কিছু জোর করে চাপিয়ে দেয়নি।


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পরের সময়গুলো বেশ ভালই কাটছিল রুশীর। বাবা-মায়ের হোটেলে খেয়ে প্রিয়জনের সাথে ঘুরেফিরে প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগের সেন্ট্রাল কমিটির বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আনন্দে কাটে দিনগুলো। ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ পারিবারিকভাবেই বাবার আপন খালাতো বোনের ছেলে সংগীত শিল্পী আশিকুর রহমান মেহরাবের সাথে অ্যানগেজমেন্ট হয় রুশীর। পরে ৮জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।



অন্যদিকে সংগঠনের নিয়ম অনুসারে কেউ বিয়ে করলে আর ছাত্ররাজনীতি করতে পারবে না। তাই ৭জুলাই ছাত্রলীগের কার্যালয়ে অব্যাহতি পত্র জমা দেন রুশী।এরপর রাজনৈতিক পরিবারের সাথেই যুক্ত থাকার জন্য রুশী নিয়মিত ধানমন্ডি ৩এ-র কার্যালয়ে যাতায়াত করতে থাকেন। এর ফল হিসেবে পরে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য হন।


ছাত্ররাজনীতির এই পথচলায় সংগঠনের সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাদের কাছ থেকে যে আন্তরিক সহযোগিতা, মেন্টালি সাপোর্ট, স্নেহ, ভালোবাসা পেয়েছেন সেটা তার জন্য একটা অন্যতম অর্জন বলে মনে করেন তরুণ এই ছাত্রনেতা। সিনিয়র ত্যাগী নেতারা কোন না কোনভাবে বুঝতে পেরেছেন যে রুশীর মধ্যে এমন সততা আছে যে, তিনি কখনো রাজনীতির শক্তিকে অপশক্তি হিসেবে ব্যবহার করবেন না। এটা বুঝে সবসময় তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকার জন্য সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। এখনো দিয়ে যাচ্ছেন। এর থেকেও তার বড় অর্জন হলো ২০১৮ সালে কোরবানী ঈদের সময় প্রধানমন্ত্রীর নিমন্ত্রণে গণভবনে গেলে কাছে থেকে হাসিমাখা মুখে প্রধানমন্ত্রীকে দেখা।


রুশী বলেন, ওইদিন সকালে গণভবনে সবার মতো আমিও বসেছিলাম। আপা যখন আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন আমি বলেছি, আসলামুয়ালাইকুম আপা। ঈদ মোবারক। তখন তিনি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ঈদ মোবারক। ওই মুহূর্তটা আমার কাছে একটা মেজিকেল টাইম মনে হয়েছিল। এখনো মনে পড়ে।


ছাত্ররাজনীতির শুরু থেকেই মনে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে রুশীর পাশে ছায়ার মতো আছেন স্বামী আশিকুর রহমান মেহরাব। তার যেকোনো কঠিন কাজ বা সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় পাশে থাকেন বন্ধুর মতো। আর মেহরাবের বাবাও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।


ছবি তুলতে, গান শুনতে, মেটালের কাজ করতে, রান্না করতে ও গল্পের বই পড়তে ভীষণ পছন্দ করেন রুশী। স্কুল-কলেজ জীবনে গল্প-সাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, রম্যরচনা পড়ার অভ্যেস ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ইতিহাস, তাদের নিয়ে গবেষণধর্মী বই, দেশের রাজনীতির ইতিহাস, রাজনীতির অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বদের বইগুলো বেশি করে পড়েন। এখন রাজনীতির বিষয়ে জানতে ও পড়তে বেশি ভালোলাগে তার।


রাজনীতিতে কাজ করার ভবিষ্যৎ বিষয়ে রুশী বলেন, আমাকে যে এমপি বা মন্ত্রী হতেই হবে, তা না। বড় কোন পোস্টে থাকতে হবে তাও না। আমার ইচ্ছে সারা জীবন আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হয়ে কোন না কোনভাবে মানুষের জন্য কাজ করার।


বিবার্তা/গমেজ/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com