তানিয়া হক শোভার জীবনের গল্প
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৮
তানিয়া হক শোভার জীবনের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন আমার চাচা এম খায়ের সাহেবের কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা যেমন, তোফায়েল আহমেদ, মুকুল বোস, আমির হোসেন আমু আংকেলরা আমাদের বাসায় নিয়মিত যাওয়া-আসা করতেন। আমি তখন তেমন কিছুই বোঝতাম না। উনারা যখন বাসায় আসতেন তখন মা অনেক বড় বড় পাতিলে চা বানাতেন, আমি বিষয়টা খুব এনজয় করতাম। আবার রাতে যখন ঘুমাতে যেতেন তখন উনাদের সাথে ঘুমানোর জন্য আমি আগে থেকেই বিছানায় বালিশ নিয়ে রেখে দিতাম। উনাদের সাথে ঘুমানোটা ছোটবেলায় মনের মধ্যে একটা অন্যরকম ভাললাগার অনুভূতি কাজ করতো মনে। উনাদের সান্নিধ্য, পিতৃতুল্য আদর, স্নেহ-ভালোবাসা আমার শিশু মনে দোলা দিতো। ভাল লাগতো। তখন ওই অবস্থায় মনে হতো আমিও বড় হয়ে একদিন অংকেলদের মতো দেশের জন্য রাজনীতি করবো। মানুষের সেবা করবো।


এভাবেই নিজের জীবনের শৈশবের গল্প বলছিলেন অদম্য আত্মপ্রত্যয়ী নারী তানিয়া হক শোভা। তিনি বাংলাদেশ যুব মহিলালীগের একজন আস্থার প্রতীক ও স্বচ্ছ রাজনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের ১ নং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য, বাংলাদেশ যুব মহিলালীগ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মুকসুদপুর উপজেলা যুব মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পাশাপাশি সম্মিলিত সংগীত শিল্পী সোসাইটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


সম্প্রতি বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে কথা হয় তানিয়া হক শোভার। দীর্ঘ আলাপে উঠে আসে তার জন্মভূমি গোপালগঞ্জে কৈশোরের স্বর্ণালী দিনগুলোর কথা, সময়ের পালাবদলে পড়ালেখা, রাজনীতে জড়ানো, উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা শুরুর গল্পসহ এসব নিয়ে বর্তমান হালচাল ও ভবিষ্যৎ ভাবনা সম্পর্কে।



প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তানিয়া হক শোভা।


গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের বাঁশবাড়ি ইউনিয়নের আওয়ামী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তানিয়া হক শোভা। বাবা আওলাদুল হক মিয়া (মরহুম) একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দীর্ঘদিন ধরে মুকসুদপুরের বাঁশবাড়ি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মা মনোয়ারা চৌধুরী মিনু বর্তমানে তেজগাঁও থানা মহিলালীগের সহ-সভাপতি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পরোক্ষভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন এবং দীর্ঘ দিন ধরে রাজনীতি করে আসছেন তার মা। চাচা আবুল খায়ের (মরহুম) স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জ-১ এর প্রথম সংসদ সদস্য ছিলেন।


শোভা বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের ও প্রিয় সন্তান। তার ছাড়া বাবা-মায়ের যে আর কোনো ছেলে-মেয়ে নেই এই বিষয়টা যাতে তারা কখনো অনুভব করতে না পারেন এর জন্য যা করতে হয় ঠিক তাই করবেন বলে ছোটবেলা থেকে সিদ্ধান্ত নেন শোভা। তার মতে, আমার বাবা-মায়ের যদি ১০টা ছেলে থাকতো তারা যে কাজ করতো আমিও বড় হয়ে একাই সে কাজ করবো বলে ছোটবেলা থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছি। বাবা-মা যাতে তাদের ছেলে-মেয়েদের অভাবটা বুঝতে না পারেন সে কাজটা করার চেষ্টা করেছি আর এখনো করে আসছি।


এ বিষয়ে ছোটবেলার কথা স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ছোটবেলায় যখন স্কুলে পড়তাম তখন স্কুলে কোনো প্রোগ্রাম হলে সব ফ্রেন্ডদের সাথে নিয়ে সেগুলো আয়োজন করা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম হতো সেখানে অভিনয় করা, যেকোনো বিশেষ দিবসে বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে সবাইকে খাওয়ানো এসব বিষয়গুলো আমার তখন থেকেই করতে খুব ভাল লাগতো।


শোভার বাবা একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকার চারজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও কন্ট্রাক্টরের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। সেই সুবাদে রাজধানীতেই থাকা হতো তাদের। রাজনীতি ও ব্যবসায়ী পরিবেশ পরিমণ্ডলে কেটে যায় শোভার শৈশবের স্বর্ণালী দিনগুলো। শহুরের স্কুল থেকে ক্লাস সেভেন পাস করে চলে যান নিজের এলাকা মুকসুদপুরে। ভার্তি হন ক্লাস এইটে।


ইডেন মহিলা কলেজ থেকে পাস করার পরে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের উপরে এমবিএ সম্পন্ন করেন শোভা। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেক মেনেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্সে শেষ সেমিস্টার এবং একই সাথে ধানমন্ডি ল কলেজ থেকে ল বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তার ইচ্ছে আছে ল’টা শেষ করার পরে ব্যারিস্টারি পড়া ও পিএচডি ডিগ্রি নেয়ার।


এবিষয়ে শোভার ভাষ্য, আমার বাবা সবসময় চাইতেন আমি যেনো পড়াশোনা করে অনেক বড় হই। বাবা জীবিত থাকাকালে বলতেন, আমি যদি কখনো মরে যাই, তখন আমি দেখতে চাই আমার মেয়ে কবরে গিয়ে বলবে যে, বাবা দেখো তোমার মেয়ের হাতে এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের সবগুলো সার্টিফিকেট আছে। এই কথাটা আমার খুব বেশি মনে পড়ে। আর এর জন্য আমি সব সময় সবাইকে বলি যে আমার বাবার এই ইচ্ছেটা আমি পূরণ করবোই।


ক্যারিয়ার জীবনের শুরুটা কীভাবে? শোভা জানান, ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল, বাবার যেহেতু আর কোনো ছেলে-মেয়ে নেই, তাই আমি এমন কিছু করবো যাতে আমার বাবার ছেলে-মেয়ে না থাকার অভাবটা আমি পূরণ করতে পারি। বাবাকে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি করার পাশাপাশি ব্যবসা করতে দেখে আসছি। বাবা একাই নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। মারও একটা সিউরিটি ফার্ম ছিল। মাও ব্যবসা করতেন। এসএসসি পাস করার পর থেকেই তাদের দুজনের ব্যবসার কাজগুলো দেখাশোনা করা শুরু করি। তখন মনে হতো আমিও তাদের মতো একজন বড় ব্যবসায়ী হবো। ওই তখন থেকেই বলা যায় উদ্যোক্তা জীবনের স্বপ্ন দেখা শুরু। তবে ছোটবেলা থেকেই আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে যেকোনো কাজ করতে ভীষণ পছন্দ করি। আমার নিজের উপরে খুব বেশি আত্মবিশ্বাস আছে। যখন যেটা ভবেছি করবো, সেটা করেই ছেড়েছি।


আওয়ামী যুব মহিলালীগের সভাপতি নাজমা আক্তারের সাথেতানিয়া হক শোভা।


পল্লী গণ জাগরণ ফাউন্ডেশন নামে একটা এনজিও আছে শোভার। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তাকে গোপালগঞ্জে ওটিজমের উপরে একটা ফান্ড দিয়েছিলেন। সে প্রোজেক্টটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেন তিনি। শোভার ভাষ্য, আমি মানুষের সেবামূলক কাজে আনন্দ পাই। তাই ওটিজমের প্রোজেক্টটা খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন করি। এরপরে ‘দ্য রকস’ নামে একটা প্রজেক্ট আছে যেটা নিরক্ষতা দূর করতে ঝরে যাওয়া স্কুল বাচ্চাদের পড়াশোনা করানো হয়। সেটা গোপালগঞ্জে ছিল না। গোপালগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোহাম্মদ ফারুক খান ভাই যখন বিমান বন্দরে থাকতেন তখন ভাইয়ের মাধ্যমে ওই প্রোজেক্টটাকে গোপালগঞ্জে অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমার এনজিওর মাধ্যমে এই প্রোজেক্টটা খুব ভালভাবে বাস্তবায়ন করেছি। এসব কাজ করার পাশাপাশি বাবা-মায়ের ব্যবসাও দেখাশোনা করতাম। তখন আমার মনে হলো যে বাবা-মায়ের ব্যবসা তো দেখছি। এখন নিজের চেষ্টা ও উদ্যোগে কিছু একটা করা দরকার। যেটার মাধ্যমে আমার নিজের আলাদা, নিজস্ব ও স্বতন্ত্র একটা পরিচয় তৈরি হবে। এমন কিছু করবো যাতে মানুষের বিনোদন দেয়া যায়, মানুষের উপকারে আসে, কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হয়, আমারও ব্যবসা হয়, আলাদা পরিচিতিও তৈরি হয়।


ভাবতে থাকেন কী নিয়ে কাজ করা যায়। কলেজ পড়াবস্থায় থেকে শোভার রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট নিয়ে ব্যবসা করার বিষয়ে আলাদা ভালোলাগা কাজ করতো মনে। তাই আর কোনো অপশনে না গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ঢাকার আশপাশে রিসোর্ট করার। সিদ্ধান্ত অনুসারে পরিকল্পনা করেন। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করেছেন। সাথে নিয়েছেন একজন পার্টনারকে। ঢাকা অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে পাঁচ মিনিটের পথ গেলেই দেখা মিলবে স্বপ্নের রিসোর্টটির। দুই বিঘা জমির উপরে বাস্তবায়ন করেছেন স্বপ্নটি। স্বপ্নের নাম ‘গ্রিনল্যান্ড ঢাকা রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। এখানে ১৪টি দোকান ফুড কর্ণার করে ভাড়া দিয়েছেন। মানুষের বিনোদনের জন্য রয়েছে মুভিজোন। ভ্রমণপিপাসুরা ইচ্ছে মতো মুভি এনজয় করতে পারবেন। সুইমিং করার জন্য একটা সুইমিংপুল করা হয়েছে। পিকনিক বা পার্টি হলে দিনে বিশ্রামের জন্য চারটি কর্টেজ আছে। লাইফ ফিসিং, লাইফ বার্বেকিউ জোন, লাইফ কিচেন, রেস্টুরেন্ট, অনলাইন রেডিয়েশন ও নিজের জন্য একটা পার্সোনাল অফিস রয়েছে। দ্বিতীয় তলাতে প্রায় ২০০০ লোকের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটা কনভেনশন সেন্টার রয়েছে। এখানে ইতোমধ্যেই প্রায় ৩০ জন কর্মীকে নিয়োগ দিয়েছেন। এই রিসোর্টটাকে সুন্দরভাবে দেখাশোনার ও পরিচালনার জন্য আরো কর্মীকে নিয়োগ দেয়া হবে।


বংশগতভাবে নেতৃত্বের গুণ পেয়েছেন শোভা। আওয়ামী লীগের রাজনীতি তার রক্তে মিশে আছে। স্কুলের নেতৃত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, মুকসুদপুরে ছাত্রলীগের একটা নাট্য সংগঠন ছিল। ক্লাস এইট থেকেই ওই সংগঠনের ছেলে-মেয়েদের সাথে নাটক করতাম। স্কুলে পড়ে কলেজের ছাত্রলীগের ছেলে-মেয়েদের সাথে থানা পর্যায়ে নাটক করতাম। ওই সময়টাতে অনেক অভিনয় করেছি। সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলাম। সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। নেতৃত্ব দিয়েছি। স্কুলেও নানান অনুষ্ঠান পরিচালানা করতাম। নেতৃত্ব দিতে আমার খুব ভাল লাগতো।


আওয়ামী লীগের আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করা উদ্যোমী এই আত্মপ্রত্যয়ী নেত্রীর ভাষ্য, আমার জীবনে প্রথম গর্বের বিষয় আমি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর জন্ম নেয়া জেলা গোপালগঞ্জের মাটিতেই জন্মগ্রহণ করেছি এবং বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দেখে শিখেছি বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের প্রতি তার সম্মান এবং শ্রদ্ধাবোধ। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শ সৈনিক ছিলেন এবং তার একমাত্র মেয়ে হিসেবে আমিও বঙ্গবন্ধুর নীতি আর আদর্শকে বুকে ধারণ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমাদের যুব মহিলা লীগের সভাপতি, প্রিয় নাজমা আপার নেতৃত্বে সর্বদা রাজপথে ছিলাম আছি এবং থাকবো ইনশাআল্লাহ।


শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সৈনিক হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন রাজপথের এই যোদ্ধা। তিনি বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনকের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দেশের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি স্বপ্ন পূরণে। আমরা সেই জননেত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সৈনিক হয়ে যুব মহিলা লীগের যোগ্য সভাপতি নাজমা আপার নেতৃত্বে দলের দুঃসময়েও যেমন রাজপথে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে অবস্থান করেছি আজও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে জননেত্রী শেখ হাসিনার কর্মী হয়েই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী এবং সকল ষড়যন্ত্র ও নীল নকশা প্রণয়নকারীদের রুখে দিতে আজও রাজপথে আছি।


স্কুলজীবন থেকে শুরু করে রাজনীতিতে এ পর্যন্ত পথচলায় যাদের বিশেষ অবদান রয়েছে তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন শোভা। কৃতজ্ঞতা ভরা হৃদয়ে তিনি বলেন, আমি আজ গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের ১ নং প্যানেল চেয়ারম্যান ও গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের ১ নং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়া এসবের সব কিছুর অবদান উপরে আল্লাহ এরপরে আমার প্রাণপ্রিয় বাবা-মা, জননেত্রী শেখ হাসিনা, আমার গুরু গোপালগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোহাম্মদ ফারুক খান ভাই এবং যুব মহিলালীগের সম্মানিত সভাপতি ও গোপালগঞ্জের কৃতি সন্তান নাজমা আক্তার আপার। পরিবার থেকে আমার রাজনীতির হাতে খড়ির শুরু। পরে মাঠে নেমে পাই শ্রদ্ধেয় গুরু মোহাম্মদ ফারুক খান ভাই এবং নাজমা আপাকে। এখন কাজ করছি নাজমা আপার সাথে।


বাবার রাজনীতির জীবনের স্মৃতিচারণ করে শোভা বলেন, ছোটবেলা আমি প্রায় দেখতাম পুলিশ এসে আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যেতেন। আর জেলে ভরে রাখতেন। অন্যদিকে মা আমাকে বাসায় রেখে বাবাকে জেলে দেখতে ও খাবার রান্না করে নিয়ে যেতেন। বাবাকে জামিন করে আনার পাগলের মতো উকিলের কাছে যেতেন। তখন কিছুই বুঝতাম না। বাবা কি এমন অন্যায় করেছে? আমার বাবা আসলে কি করে? এমন নানান প্রশ্ন জাগতো শিশু মনে। আস্তে আস্তে বড় হলে বুঝতে পারি। এসবই ছিল রাজনীতির বিষয়।


ছোটবেলা থেকেই অসহায় মানুষের জন্য মন কাঁদতো শোভার। মানুষের জন্য কিছু করা ও দেয়ার মধ্যে আসীম আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি পেতেন তিনি। গ্রামে ছোটবেলায় দেখতেন মানুষ যখন বাড়িতে ভিক্ষা করতে আসতেন তখন মা তাদের একমুঠো করে চাল দিতেন। বিষয়টা তার পছন্দ হতো না। তার চিন্তা হতো একমুঠো চাল একটা মানুষের কি হয়? আমার বাবার তো অনেক চাল আছে, কিন্তু মা কেন দেয় না? তখন তিনি ভিক্ষুককে বলতেন, দুপুরে আমার মা যখন গোসলে যাবেন তখন আসতে। আর ওই ভিক্ষুক আসার সাথে সাথে তাকে এক সাথে দুই কেজি করে চাল দিয়ে দিতেন।


এমন আরেকটি ঘটনার কথা জানালেন শোভা। তখন তিনি এসএসসি পাস করেছেন। থাকেন ঢাকায়। মুকসুদপুরের গরিব পরিবারের একটা আট বছরের বাচ্চা এক্সিডেন্ট করে মাথার গিলু বের হয়ে যায়। তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বিষয়টা শোভা জানতে পারেন। ছুটে যান তিনি। তখন তার হাতে ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। ওই টাকা দিয়ে বাচ্চাটাকে আনোয়ার খান মডার্ণ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাক্তার ফিরোজ আহমেদ কোরাইসির আন্ডারে ভর্তি করতে গেলে শুরুতে ১৫ হাজার টাকা জমা নেয় হাসপাতাল। চলতে থাকে চিকিৎসা। ১৫ দিন পরে হাসপাতাল থেকে বিল আসে ৮০ হাজার টাকা। কিশোরী অবস্থায় এত টাকা পাবেন কোথায়? তখন চিন্তা করেন মায়ের গহনা চুরি করবেন। আর কোনো উপায় না পেয়ে তাই করেন শোভা। মায়ে হাতের স্বর্ণের মোটা বালা বিক্রি করে সেই বিল পরিশোধ করেন। ছোটবেলা থেকে জীবনে অসহায়, গরিব-দুঃখীদের জন্য এমন অনেক কাজ করেছেন। এসব কাজে তিনি পান হৃদয়ে প্রশান্তি আর তৃপ্তি।


তানিয়া হক শোভা।


গরিব-দুঃখীদের নিয়ে শোভার ভাবনা হলো, সব সময় নামাজে বসেও আল্লাহর কাছে তিনি মোনাজাত করে বলেন, যদি কখনও ভাল কোনো অবস্থানে যেতে পারি, যদি এমপি বা বড় কোনো রাজনৈতিক নেতা হতে পারি বা বড় কিছু হতে পারি তখন আমার সেবার প্রথম গুরুত্ব থাকবে পথের পাশে শুয়ে থাকা, খেটে খাওয়া গরিব মানুষদের জন্য কিছু করার। এটা আমি নিজের সাথে কমিটেড। এটা করবোই।


নেত্রী হিসেবে সবার কাছ থেকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা পাওয়াটাকে জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে মনে করেন শোভা। একজন মানুষ হিসেবে পাসোনালিটিটা অনেক বড় জিনিস। তার মতে, আমার হয়তো অনেক বেশি টাকা-পয়সা, গাড়ি, বাড়ি অনেক কিছুই নেই। কিন্তু মানুষের কাছে সম্মানটা পাই। আমি যেখানেই যাই সবার সাথে মিশতে পছন্দ করি। কোনো জায়গায় গেলে ছাত্রলীগের ছেলে-মেয়েরা, যুব মহিলালীগের সবাই আমাকে ভালোবাসেন, বয়সে ছোটরা খুব আপন করে আপু বলে ডাকে, সম্মানের জায়গাটাতে বসতে দেয়, শ্রদ্ধা ও সম্মান করে, হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে এটা একজন নেত্রী হিসেবে আমার কাছে বড় অর্জন বলে মনে করি।


গোপালগঞ্জে যেখানে শেখা হাসিনা, ফারুক খান, শেখ সেলিমের মতো বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন সেখানে আমার মতো একজন নারী এই বয়সে এসে গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের ১নং প্যানেল চেয়ারম্যান ও গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের ১নং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়াটা আমার জন্য অনেক গর্বের বিষয়। এসব অনুকরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়াটা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তির।


‘গ্রিনল্যান্ড ঢাকা রিসোর্ট’কে নিয়ে শোভার স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া। স্বপ্ন দেখেন সারা দেশের ৬৪ জেলায় একটা করে ‘গ্রিনল্যান্ড ঢাকা রিসোর্ট’করার। তিনি বলেন, যদি আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন আর আমার সে সামর্থ্য হয়, তাহলে আমার এই স্বপ্ন এক দিন বাস্তবায়ন করবোই। আর একটা ইচ্ছে আছে সেটা হলো আমার নিজের আয়ের টাকা দিয়ে একটা মসজিদ, এতিম খানা ও একটা বৃদ্ধাশ্রম করবো। কেননা আমি বিশ্বাস করি মানুষের জন্য কিছু করলে আল্লাহ কাছ থেকেও আমি কিছু পাবো। আমাদের তো এটাই শুধু লাইফ না। এর পরেও একটা জগত আছে। এই জগতে কিছুই করলাম না। যদি পরকালের জন্য কিছু না করি, তাহলে কি হবে?


বিবার্তা/গমেজ/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com