রঙ তুলিতে স্বপ্ন আঁকেন উদ্যোক্তা রাইসা
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ১৭:৪৭
রঙ তুলিতে স্বপ্ন আঁকেন উদ্যোক্তা রাইসা
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

প্রত্যেকের জীবনেই ছোট বা বড় স্বপ্ন থাকে। তেমনিভাবে ছোটবেলা থেকেই রঙের ভুবনে হারিয়ে যেতে খুব ভাল লাগতো তার। স্কুলে গদ বাঁধা সিলেবাসের পড়ালেখায় বন্দি হতে তার ভালো লাগতো না। তাই পরীক্ষার আগের রাতেও ছবি আঁকতে, রঙ নিয়ে খেলা করতেই বেশি ভাল লাগতো তার। সব মেয়েদেরই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে, নানা রকমের প্রতিকূলতা ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তাই তিনি স্বাধীনভাবে কিছু করার আনন্দ খুঁজে নিলেন রঙ তুলি আর কাগজেই। এক সময় সেই রঙ তুলিই হয়ে উঠে স্বপ্ন পূরণের চাবি। আর এখন প্রতিদিনই রঙ তুলিতে স্বপ্ন আঁকেন তিনি।


বলছিলাম নারী উদ্যোক্তা (Artgenix) আর্টজেনিক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা রাইসা মানিজার কথা।



আর্টজেনিক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা রাইসা মানিজা।


রাইসার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্যস্ত নগরী ঢাকাতেই। পড়ালেখা ইংরেজি সাহিত্যে হলেও রঙের ভুবনে হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন তিনি। নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন এই উদ্যোক্তা। সেই শৈল্পিক চিন্তা থেকেই মনে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন জেগেছিল তার।


ছোটবেলায় রিকশার পেছনে সিনেমার কোনো বিশেষ দৃশ্যে নায়ক-নায়িকার ছবি, গ্রাম-বাংলার দৃশ্য, পাখি, ফুল, ময়ূর এগুলো দেখে হারিয়ে যেতেন রঙের ভুবনে। ছবিগুলো খুব বেশি টানতো তাকে। কোথাও কেউ যখন রিকশার গায়ে ছবি আঁকতো তখন সেটা তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। রিকশা পেইন্টারদের নিখুঁত হাতের এই পেইন্টিং দেখলে তার কাছে জীবন্তই চিত্রকর্ম মনে হতো। এক সময় এ পেশায় প্রচুর মানুষ কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি আর কম্পিউটার গ্রাফিক্সের আগমনে আজকে সেইসব রিকশা পেইন্টাররা প্রায় কর্মহীন। বিলুপ্তের পথে সেই ঐতিহ্যবাহী রিকশা পেইন্টিং। দেশের হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য ঐতিহ্যের মধ্যে এই রিকশা পেইন্ট অন্যতম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টা তাকে ভাবাতে থাকে। হারিয়ে যাওয়া লোকজ শিল্পকে নিয়ে কাজ করার চিন্তা-ভাবনা করেন তিনি, নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করেন এবং তা বাস্তবায়নে লেগে যান রাইসা।



সুবিধাবঞ্চিত কিশোরীদের সাথে রাইসা মানিজা।


ক্যারিয়ার নিয়ে রাইসার ভাষ্য, নানা পারিবারিক ব্যস্ততা, প্রতিকূলতাসহ বিভিন্ন কারণে আসলে সঠিক নিয়মে আমার ক্যারিয়ার গঠন নিয়ে ভাবিনি। এসব কারণে নিজের পরিচয় তৈরি করতে খানিকটা ব্যর্থ হয়েছিলাম। কিন্তু এক সময়ে এসে পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি নিজের মনের ভেতরে স্বাবলম্বী হওয়ার তীব্র তাগিদ অনুভব করি। প্রাণের সেই তাগিদ থেকে ভালোবাসার রঙের ভুবন নিয়েই উদ্যোক্তা জীবন শুরু করার চিন্তা করি। আমি বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী বিষয়বস্তু নিয়ে রিসার্চ করার পর লোকশিল্প এবং রিকশা পেইন্টকে বেছে নেই। কাজ শুরু করার কিছু দিন পরই মরণঘাতি করোনা এসে হানা দেয়। তবুও থেমে নেই। সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেও ধীরে ধীরে কাজ করে যাচ্ছি। একদিকে যেমন ঐতিহ্য রক্ষা পাচ্ছে, অন্য দিকে আর্থিকভাবেও স্বাবলম্বী হচ্ছি।


রিকশা পেইন্ট নিয়ে কাজ শুরু করার আগে তিনি জানার নেশায় গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। রিকশার বাস্তব অবস্থা দেখেছেন, অভিজ্ঞতা করেছেন। এ বিষয়ে রাইসা বলেন, রিকশা পেইন্ট নিয়ে কাজ করতে আমি যখন মাঠ পর্যায়ে গিয়েছি তখন দেখি রিকশা আর্টিস্টদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ছোটবেলায় রিকশার দিকে তাকালে যেমন রঙিন দেখতাম, সুন্দর সাজানো দেখতাম এখন সেই দৃশ্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এই শিল্পটা আমাদের ঐতিহ্যর একটা অংশ। এটা কিন্তু অনেকটা বিলুপ্তের পথে। সেই কারণে এই লোকশিল্প নিয়ে কাজ করা। এই ক্ষেত্র নিয়ে খুব বেশি উদ্যোক্তারা কাজ করছে না। আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসা, যত্ন এবং একনিষ্ঠভাবে লেগে থাকতে পারলে নিশ্চয় একদিন আমি সফলতা অর্জন করবো। আমার এক শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল ভাই বলেছেন, কাজের প্রতি পাগল হতে হবে। পাগলামি থাকতে হবে। তার কাছে আমি বর্তমানে পাটের ট্রেনিং করছি। এই সম্মানিত ব্যক্তিকে সকলে পাট পাগলা বলে জানেন। আর্টজেনিক্সের মাধ্যমে, রিক্সা আর্ট এবং সোনালী আঁশের ফিউশন নিয়ে কাজ করছি। বিশ্ব দরবারে পাটের একটা বিশাল মার্কেট আছে। আগামীতে আন্তর্জাতিক এসএমই মেলাতে অংশগ্রহণ করবো, তখন নিশ্চয় কিছু নতুন ঝলক নিয়ে হাজির হবো।



উদ্যোক্তারাইসা মানিজা।


অনলাইন পেজের মাধ্যমে তার উদ্যোগ শুরু হলেও আর্টজেনিক্স-এর সুনাম এখন সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। গৃহসজ্জার পণ্য ও কুটির শিল্প নিয়ে কাজ করছেন রাইসা। প্রায়ই বিভিন্ন মেলায় প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে আর্টজেনিক্স।


কেটলি, টেবিল ল্যাম্প, চায়ের কাপ, হারিকেন ইত্যাদি জিনিসে গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন গল্প, সেই রূপালি পর্দার নানা পোস্টার, কাহিনী রিকশা পেইন্টের মাধ্যমে তাদের পণ্যে ফুটিয়ে তুলছে। যা গৃহের সৌন্দর্য বাড়াতে বেশ সহায়ক ভূমিকা রাখছে। রুচিশীল অনেক মানুষের প্রথম পছন্দে রয়েছে আর্টজেনিক্স-এর সৌখিন পণ্য।


যে কোনো উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরোতে হয়। আমিও এর ব্যতিক্রম না। এই মুহূর্তে প্রতিবন্ধকতা অনেক বেশি, কারণ মাঠ পর্যায়ে কাজ করা খুব কঠিন। এখন বিক্রি যৎসামান্য। এত কম বিক্রি হলে আসলে একটা উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখাটা খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে বেশ খানিকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমি যেহেতু রুট লেভেলের আর্টিস্ট নিয়ে কাজ করি, তাই অনেক বেশি ফিল্ডওয়ার্ক করা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে করোনার এই মহাদুর্যোগের সময় বিক্রি কম হবে জেনেও নিজের মনকে শক্ত রেখেছি। কেননা শুধু আমি না, এটা গোটা দেশের সকল উদ্যোক্তা, চাকরিজীবী, ব্যবসার উপরে মারাত্মক আকারে প্রভাব পড়েছে। একটা সময় খুব হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম। তখন চারদিকে দেখলাম যে, অনেকে আমার থেকেও অনেক খারাপ অবস্থায় আছেন। সে তুলনায় আল্লাহর রহমতে আমি অনেক ভাল আছি। এ বছরও খারাপ যাবে সেই বুঝেই আমি একটু একটু করে কাজ করছি। প্রতিনিয়ত আমি সংগ্রাম করে যাচ্ছি- বললেন অদম্য উদ্যোক্তা রাইসা।



সুবিধাবঞ্চিত কিশোরীদের সাথে রাইসা মানিজা।


উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলার নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তার ভাষ্য, ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত পুঁজি এবং দ্বিতীয়ত বিক্রয়। অনেক কষ্ট করে পণ্যগুলো তৈরি করা হলেও কীভাবে সেগুলো সঠিক ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরা যায় সেটা নিয়ে অনেক ভোগান্তি। দক্ষ কর্মীদের প্রথম অবস্থায় কাজের মূল্য পরিশোধ করতে গেলে পণ্যের উৎপাদন খরচ হয়ে যায় অনেক বেশি। আবার বাল্ক প্রোডাকশন করাও বাস্তবমুখী না একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে।


উদ্যোক্তা ছাড়াও নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন রাইসা। তিনি জানান, বিশ্বের বেশ কয়েকটা দেশে আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপ করেছি। চারুকলার শিক্ষার্থীদের সাথে দেশ ও বিদেশে বেশ কয়েকটা আর্ট একজিবিশন এবং আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি। ২০১৯ সালে নড়াইলে এসএম সুলতান আন্তর্জাতিক একটা মেলা হয়। সেখানে তিনজন বেস্ট আর্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড পান। এর মাঝে আমিও একজন ছিলাম। সেটা ছিল আমার জীবনে শিল্পের দুনিয়ায় একটা উল্লেখ্যযোগ্য স্বীকৃতি। সেখানে দেশের এবং বিদেশের শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করেন। শুধু রঙের খেলা দেখেও যে আমাকে বেস্ট অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয় এটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে হয়। এভাবে সকলের ভালোবাসা ও স্বীকৃতি পাচ্ছি। এভাবেই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি।



এসএমই ফাউন্ডেশনের আয়োজিত প্রশিক্ষণ শেষে সার্টিফিকেট গ্রহণ করছেন রাইসা মানিজা।


এই করোনা কালীন, যখন তিনি হতাশায় চলে যাচ্ছিলেন। তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য নানা রকমের সরকারি ও বেসরকারি বাবস্থাপনায় অনলাইন এবং অফলাইন ট্রেনিংয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যান। নানা রকমের জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন এবং নিজের পরিচিতি বৃদ্ধি করতে থাকেন। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের স্কিল ডেভেলপ করার কাজে নেমে পড়েন। বিভিন্ন জায়গায় উদ্যোক্তা উন্নয়নের ট্রেনিং এবং নানা বিষয়ের উপরে নিজেকে দক্ষ করার জন্য ছুটতে শুরু করেন। তার শিখতে ভাল লাগে, তাই তিনি মনে করেন এই অতিমারীর সময়কে কাজে লাগানোর শ্রেষ্ঠ কাজ হল শিক্ষা অর্জন করা।


আর্টজেনিক্সের পক্ষ থেকে চমৎকার কিছু সামাজিক কাজ করছেন রাইসা। সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের হস্তশিল্পের নানা বিষয় প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। এই সুবিধাবঞ্চিতদের তৈরি করা পণ্য যেন মার্কেটে বিক্রি করা যায়, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার ভাষ্য, চেষ্টা করছি এই শিল্প নিয়ে যারা কাজ করছে, তাদের কয়েকজনের পাশে যেন আমি দাঁড়াতে পারি। তাদের জীবিকা অর্জনের জন্য কিছুটা অবদান রাখতে পারি। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত কিশোরী ও তরুণীদের স্কিল ডেভেলপ করতে সাহায্য করছি। ভবিষ্যতে তারাও যখন কর্মসংস্থানের খোঁজে নামবে তখন যেনো আর্টজেনিক্স তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে।



রিকশা পেন্টিং হাতে রাইসা মানিজা।


আর্টজেনিক্স নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে রাইসা বলেন, আমি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে চেষ্টা করছি যেনো সুবিধা বঞ্চিত কিছু মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজ করা খুবই কঠিন তবুও ধীরে সুস্থে পরিকল্পনা করে কাজ করছি যেন অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি। আর উদ্যোক্তা হিসেবে একটা স্বপ্ন দেখি সেটা হলো, দেশীয় হারিয়ে যাওয়া শিল্প যেগুলো আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখে সেগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমি কাজ করছি। সেই সাথে সারাদেশে স্থানীয় যে রিকশা পেইন্টাররা আছেন তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টায় আছি। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাকে সাহায্য করছে আর্টজেনিক্স-এর পুরো টিম।


আর একটা আধুনিক, উন্নত ও মানসম্পন্ন শোরুম দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে সকলে এসে আমাদের শিল্পকর্মগুলো দেখতে এবং চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো নিতে পারবেন। আমি বিশ্বাস করি ধীরে ধীরে আমাদের শিল্পকর্মগুলো অগ্রসর হবে এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে আর্টজেনিক্স-এর পণ্য একটা অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। শুধু দেশ নয়, সারা বিশ্বে সুনাম অর্জন করবে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের ব্র্যান্ড আর্টজেনিক্স।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com