'ছিকর' নিয়ে যতো কথা-গল্প
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২১, ১৪:০৩
'ছিকর' নিয়ে যতো কথা-গল্প
অনামিকা রায়
প্রিন্ট অ-অ+

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাইতিসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশের গরীব ও অসহায় মানুষের খাদ্য তালিকায় থাকা 'ছিকর'র ছবি ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায়, ক্ষুধা মেটাতে নিরুপায় হয়ে মাটির তৈরী বিস্কুট খাচ্ছেন তারা! ছিকর একটি ফারসি শব্দ। ‘ছিয়া’ মানে কালো আর ‘কর’ মানে মাটি। ছিয়াকর শব্দটিই পরে ছিকর হয়ে গেছে। এটি মূলত পাহাড়ি টিলায় গর্ত খুঁড়ে লম্বা বাঁশের সাহায্যে গভীর থেকে এক ধরনের সংগৃহীত মিহি মাটি।


বর্তমানে করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত। অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী অনেক দেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে পড়েছে। এমন অবস্থায় যে সকল দেশ অন্য দেশ বা সংস্থার সাহায্যের উপর নির্ভরশীল ছিলো তাদের অবস্থা একেবারেই করুণ। করোনা মহামারীর থেকে ক্ষুধার জ্বালা তাদের কাছে বেশি ভয়ংকর। আর এই ক্ষুধার জ্বালা মেটাতেই তারা অন্য খাবারের বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন মাটির তৈরি বিস্কুট! যা খেলে স্বাদ পাওয়া না গেলও অন্তত পেট ভরে।



কিন্তু এই পেট ভরানোর বিকল্প কৌশল মাটির বিস্কুট খোঁজার জন্য আফ্রিকা বা হাইতিতে যেতে হবে না আমাদের। কারণ বাংলাদেশেও একসময় নিম্নবিত্তদের খিদে মেটানোর প্রধান সামগ্রীই হয়ে উঠেছিল এই মাটির বিস্কুট।


৭০/৮০ দশকে হবিগঞ্জসহ সিলেটের কিছু অঞ্চলে এঁটেল মাটির তৈরী বিস্কুট সাদৃশ্য এই জিনিসটি খাবার হিসেবে প্রচলন ছিলো। দেশ জুড়ে তখন মুক্তিযুদ্ধের আবহ। দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভয়াবহ খারাপ। কিন্তু খিদে কি স্বাধীনতার স্বাদ বোঝে? তাকে শান্ত করতেই তাই এ দেশে প্রচলন শুরু হয়েছিল পোড়ামাটির বিস্কুট ছিকরের। আর এক সময় এই ছিকরই ছিলো হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামে নিম্নবিত্ত সমাজে প্রচলিত এক বিশেষ আহার্য।


পাহাড়ি টিলায় গর্ত খুঁড়ে লম্বা বাঁশের সাহায্যে গভীর থেকে সংগৃহীত এই মাটি মাখিয়ে খাই বানিয়ে ছাঁচে ফেলে প্রথমে তৈরি করা হতো মন্ড। তারপর তা পছন্দ মত কেটে টুকরো করা হতো। পরে বিশেষ এক পদ্ধতিতে সেই টুকরো আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করা হতো ছিকর। ছিকর বিভিন্ন আকৃতির হতো। কোনোটি দেখতে বিস্কুটের মত, কোনোটি ললিপপের মত লম্বা। আবার কোনো ছিকর ছোট লজেন্সের মতো ছিলো।


বিস্কুটের এমন অদ্ভুত নাম হওয়ারও কারণ রয়েছে। তবে এর উত্তর খুঁজতে পাড়ি দিতে হবে প্রায় এক শতাব্দী আগে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশের পাশাপাশি বাংলায় বিক্ষিপ্তভাবে ফরাসি আধিপত্যও কায়েম ছিলো তখন। বিভিন্ন নির্মাণ কাজের জন্য তারা বাংলা থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন কালো এঁটেল মাটি। সেই ফরাসি শব্দ ‘ছিয়াকর’-ই পরে ফিরে আসে ‘ছিকর’ হয়ে।


বিভিন্ন এলাকার ছিকর বিভিন্ন স্বাদের ছিলো। কোনো এলাকার ছিকরে খাই মাখানোর সময় গোলাপজল, আদার রস ইত্যাদি মেশানো হতো। যা মাটির সাথে পুড়ানোর পর ভিন্ন এক স্বাদের জন্ম দিত। স্থানীয় কুমার সম্প্রদায় বা মৃৎ শিল্পীদের কেউ কেউ ছিকর তৈরি করে বাজারজাত করতেন। দিনে দিনে ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ছিকর এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।


নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরে পাহাড়ি টিলা থেকে একসময় বিভন্ন এলাকার কুমাররা এসে মিহি মাটি সংগ্রহ করতেন। কিন্তু বর্তমানে কেউ আর মাটি সংগ্রহ করতে যায় না। এছাড়াও বানিয়াচং, বাহুবল ও মাধবপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছিকরের উপযোগী মাটি আহরণের ক্ষেত্র ছিলো। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন গ্রাম্য বাজারে ঘুরে এখন আর ছিকরের সন্ধান মিলে না।



হবিগঞ্জে প্রচুর পরিমাণে ছিকর পাওয়া যেত। গর্ভবতী মহিলাদের কাছে এটি একটি পছন্দনীয় সুস্বাদু খাদ্য ছিলো। তাদের ধারণা ছিলো এটা খেলে বিভিন্ন রোগ বালাই থেকে বেঁচে থাকা যাবে। তবে, ক্ষুধা নিবারণের জন্য নয়, বরং এক ধরণের অভ্যাসের বশে লোকজন এই মাটির বিস্কুট খেয়েছে বলে বৃহত্তর সিলেট এলাকার প্রবীণ লোকদের মতামত।


আজও বাংলাদেশের বেশ কিছু অংশে প্রচলিত আছে ‘ছিকর’। তবে কমেছে তার জনপ্রিয়তা। মাটির এই বিস্কুটের মধ্যে আদৌ যে পুষ্টিকর কোনো গুণ নেই, তাও বুঝেছে মানুষ। ফলে প্রায় অবলুপ্তির পথেই হাঁটছে ছিকরশিল্প। পেশা পাল্টেছেন অধিকাংশ ছিকর প্রস্তুতকারী মৃৎশিল্পীই।


তবুও মৃতপ্রায় এই শিল্পই যেন আজও মনে করিয়ে দেয় অতীতের অন্ধকার সময়কে। মনে করিয়ে দেয় শোষণ আর অনটনের মধ্যে লড়াই করতে থাকা বাংলার নিম্নবিত্ত সমাজের কথা। বছর পেরিয়ে সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়েছে বাংলা। কিন্তু হাইতির মতো দেশ এখনো চালিয়ে যাচ্ছে সে লড়াই। খিদের সঙ্গে অনটনের এক আজন্মকালীন সংগ্রাম। পূর্ণিমার চাঁদ পারতপক্ষেই সেখানে ঝলসানো এক রুটি।


বিবার্তা/বিআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com