মার্কিন মুসলমানরা আসলে যেমন আছে
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:৫৬
মার্কিন মুসলমানরা আসলে যেমন আছে
মূল : লায়লা ফাদেল ভাষান্তর : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী
প্রিন্ট অ-অ+

দাউ দাউ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল মসজিদটা, কিন্তু শুধু চেয়ে-চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না আবে আজরামির। তিনি দেখছিলেন, তামার গম্বুজযুক্ত মসজিদটি জ্বলছে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ শহর ভিক্টোরিয়ায় এ মসজিদের অবস্থান। এই সেই মসজিদ, যেখানে আবে আজরামির মেয়ে অন্যান্য হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েটের সাথে হৈ হৈ করে খানাপিনা করত। এই সেই মসজিদ, যেখানে তার ছেলেমেয়েরা ধর্মশিক্ষা নিতে আসত। এই সেই মসজিদ, যেখানে তিনি ও তার পরিবার জুমআর নামাজ পড়তে আসতেন। নামাজ শেষে চলত তেল চপচপে, নানা রকম মসলার সৌরভে চার দিক মাতোয়ারা করা বিরিয়ানি ভোজন।


সেই মসজিদটা আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে! প্রচণ্ড আবেগে মাথা যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন মুসলিম আজরামির। পরে নিজ বাসায় বসে সে দিনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আজরামি। বলেন, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম নিজেকে সামলে রাখতে।


আজরামির সাথে কথা হচ্ছিল তার ড্রইংরুমে বসে। এ সময় সেখানে ছিলেন আজরামির পত্নী হেইডি; যিনি একজন ধর্মান্তরিত মার্কিন মুসলিম। আজরামির ডান দিকে বসেছিল তার দুই মেয়ে হান্নাহ ও জেনিন। বামের সিটটা খালি। সেখানে থাকার কথা তার ছেলে রামির। কিন্তু সে ওপরতলায় ঘুমাচ্ছে।


এ পরিবারকে দেখে আমার নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ে গেল। আমার বাবাও লেবাননের মানুষ। আজরামির মতো তিনিও লেখাপড়া করার এবং অপেক্ষাকৃত ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় একদিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। হেইডির মতো আমার মা-ও ছিলেন অমুসলিম। কলেজে পড়তে-পড়তে বাবার সাথে তার পরিচয় ও প্রণয় এবং ইসলাম গ্রহণের পর পরিণয়। আমরা আমাদের মা-বাবার পাঁচ সন্তান, যারা আমেরিকার মুসলিম এবং গায়ের রঙ না শ্বেতকায়, না কৃষ্ণকায়।


আজরামির কথায় ফিরে যাই। তার জন্ম গাজার এক দরিদ্র পরিবারে। লেখাপড়া করেছেন নার্সিং নিয়ে। কারণ, কেবল এ বিষয়ে পড়ার খরচ জোগানোর সামর্থ্যই তার পরিবারের ছিল। ১৯৯৪ সালে তারই এক বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের ওমাহায় অবস্থিত ক্লার্কসন কলেজে একটি বৃত্তি এবং মার্কিন ভিসা পেতে সাহায্য করেন আজরামিকে। এ কলেজেই হেইডির দেখা পান আজরামি। একের পর এক পিকনিক পার্টিতে দাওয়াত দিয়ে আর মজার মজার কথা বলে হেইডির মন জয় করতে সময় লাগে না আজরামির। বিনিময়ে হেইডিও তার প্রথম ফুটবল ওয়াচিং পার্টিতে ডাকে আজরামিকে। এরপর তারা চলে যায় ভিক্টোরিয়ায়। সেখানে একটি কলেজে ইংলিশ ইন্সট্রাক্টরের চাকরি পায় হেইডি আর আজরামি হন একটি হাসপাতালের ডাইরেক্টর অব নার্সিং। এখন তিনি মেডিক্যাল স্টাফিং ব্যবসা করছেন। ব্যবসা ভালোই চলছে তার। পরিবার নিয়ে থাকেন একটি বিশাল বাড়িতে, যেখানে একটি সুইমিং পুল পর্যন্ত আছে। এজন্যে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ তারা, যেভাবে এ শহরের বেশিরভাগ মানুষ আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।


কিন্তু যে-রাতে ওই মসজিদে আগুন দেয়া হলো, সেদিন অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, আজরামি এবং শহরের ছোট মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছে এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছে। কিন্তু কিছুই করতে পারেনি। কারণ, এর কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। আদেশে সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর আর চরমপন্থীরা বসে থাকে কী করে!


তারা বসে থাকেওনি, আগুন দিয়েছে মসজিদে। আগুনে মসজিদ ভবনের বেশ ক’টি অংশ পুড়ে যায়। তবে অক্ষত থাকে তামার গম্বুজগুলো এবং পবিত্র কোরআনের বাণী উৎকীর্ণ করা মার্বেল পাথরের স্ল্যাবগুলো। আজরামি এর ছবি নেন এবং অনলাইনে পোস্ট করেন। ক্যাপশন দেন : ‘আমরা আবার বানাবো; ভালোবাসা দিয়ে।’ কয়েক দিনের মধ্যেই মসজিদ পুনর্নির্মাণের জন্য এক মিলিয়ন ডলার উঠে এলো। তাদের পক্ষে শহরবাসী র‌্যালি করল। সেই থেকে আজ অবধি মেইলে কারো-না-কারো অর্থসাহায্য আসছেই।


মসজিদের পোড়া ছাইয়ের মধ্যেই আজরামি নতুন পথের সন্ধান পেয়েছেন। নিজের ‘মুসলিম’ পরিচয়কে সামনে এনে দিয়েছেন। তিনি এখন প্রায়ই মিডিয়ার মুখোমুখি হন এবং নিজ ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলেন। এভাবে আজরামি হয়ে উঠেছেন স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর অঘোষিত মুখপাত্র।


আজরামি বলেন, কিন্তু কেন আমাকে এসব করতে হচ্ছে? কেন আমাকে ওদের কাছে প্রমাণ দিতে হচ্ছে যে, আমি একজন ভালো মানুষ!


কেন, কেন, কেন?


আবে আজরামির এসব ‘কেন’র উত্তর দিতে হলে একটু অন্য দিকে ফিরতে হয়। বর্তমানে আমেরিকায় ৩.৪৫ মিলিয়ন মুসলিম এক বৈরী পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছে। এখানে এক দিকে সহিংস চরমপন্থীরা ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করে উপস্থাপন করছে, অন্য দিকে চলছে মুসলিমবিরোধী প্রচারণা। এই বিদ্বেষের আগুনে ইন্ধন জোগাচ্ছে রক্ষণশীল ভাষ্যকার ও রাজনীতিকদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য। এ ধরনের রাজনীতিকদের মধ্যে আছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও। তিনি ইসলামকে ‘হুমকি’ বলে বয়ান করেছেন বহুবার, একটি ব্রিটিশ হেট গ্রুপের মুসলিমবিরোধী ভিডিও রি-টুইট করেছেন এবং এ ধর্মের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। দূরে থাকার অংশ হিসেবে তিনি এবার পবিত্র রমজান উপলক্ষে হোয়াইট হাউসে ডিনার পার্টির আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে হোয়াইট হাউসের এ ধরনের সিদ্ধান্ত এটাই প্রথম।


অবস্থা যখন এ রকম, তখন আজরামি তো ‘কেন’ এ প্রশ্ন করতেই পারেন। আরো পারেন এ কারণে যে, মার্কিন দেশে গত বছর শতাধিক মসজিদ হুমকি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এ হিসাব কাউন্সিল অব অ্যামেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস-এর।


মোদ্দা কথা হলো, দেশটিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘হেট ক্রাইম’ বাড়ছে। এফবিআইর এক হিসেবে দেখা যায়, ২০১৬ সালে মুসলিমবিরোধী সহিংসতার ঘটনা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেড়েছিল। ইন্সটিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং নামে যে সংস্থাটি মার্কিন মুসলিমদের স্টাডি করে থাকে, তাদের মতে, মুসলিম শিশুরা অপরাপর ধর্মাবলম্বী শিশুদের চেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন মুসলিমদের অর্ধেকই মনে করছেন, আমেরিকায় মুসলিম হয়ে টিকে থাকাটা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো কঠিন হয়ে গেছে।


তবুও এগিয়ে চলা


এসব বিঘ্ন ও শঙ্কার মধ্যেও মার্কিন মুসলিম জনগোষ্ঠী এগিয়ে চলেছে। যেসব মুসলিম নারী শালীন পোশাক পরতে চান, তাদের জন্য ওই দেশের মুসলিমরা বিভিন্ন নামে সে রকম পোশাক তৈরি কছে। এমনকি মেকি-র মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানও এখন মুসলিম নারীদের জন্য নানারকম ফ্যাশন উদ্ভাবন ও বিক্রি করছে। কস্টকো অ্যান্ড হোল ফুডস বিক্রি করছে হালাল খাদ্য। ম্যাটেল বাজারে ছেড়েছে মুসলিম বার্বি পুতুল। অলিম্পিক পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ ইবতিহাজ মুহাম্মাদের মতো দেখতে এ পুতুলের মাথায় রয়েছে হিজাব। ক্যালিফোর্নিয়ার সার্কলেতে রয়েছে মুসলিম লিবারাল আর্ট কলেজ এবং ক্লেয়ারমন্টে আছে একটি গ্র্যাজুয়েট স্কুল। মুসলিমদের সামাজিক কার্যক্রমও থেমে নেই। মুসলিম সমাজকর্মীরা অন্যান্য কোণঠাসা জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলেছেন।


আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন মুসলিমরা ক্রমেই বেশি করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। শুধু মেরিল্যান্ডের নির্বাচনেই কয়েক ডজন প্রার্থীকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্লুরালিজম প্রজেক্টের মতো বিভিন্ন গ্রুপ। এর ফল হয়েছে এই যে, মিনেসোটায় এক হিজাবধারী সোমালি-অ্যামেরিকান নারী এখন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। মিশিগানে গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন এক মুসলিম। কংগ্রেসেও আছেন দু’জন মুসলিম সদস্য এবং চলতি বছরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন আরো কয়েকজন।


মার্কিন মুসলিমদের তুলনামূলক একটা বড় অংশ নতুন অভিবাসী ও তাদের স্বজন। মসজিদের ইমামদের অনেকেই বিদেশী বংশোদ্ভূত। তবে এমন মুসলিম নেতা ও আলেমের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ ও বাদামি। তারা এ দেশের ভাষায় কথা বলেন এবং যে ধর্মটিকে প্রায়ই ‘বিদেশী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়, সেটিও যে এদেশের সংস্কৃতির অংশ, তা বুঝিয়ে দেন।


মার্কিন মুসলিমদের প্রায় অর্ধেকেরই জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। তবে এদেশে ইসলাম এখনো স্বল্পপরিচত। একে পরিচিত করাতে যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের একজন উসামা ক্যানন। এই অর্ধ-কৃষ্ণাঙ্গ, অর্ধ-শ্বেতাঙ্গ ধর্মপ্রচারক মানুষটি থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। ১৯৯৬ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং দেশে ও বিদেশে আলেম-ওলামাদের সান্নিধ্যে থেকে ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেন।


হিউস্টনের এক মসজিদে একবার রাতভর ওয়াজ করেন উসামা ক্যানন। এরপর তার সাথে কথা হয় আমার। তিনি আমাকে বলেন, ‘খুব বড় একজন আলেম আমাকে বলেছেন যে ইসলাম হচ্ছে বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার পানির মতো, যা যে নদী দিয়ে বয়ে যায় তার তলদেশের রঙ ধারণ করে। তাই আমি আশা করি, অ্যামেরিকান মুসলিমরা নিজ ধর্মের মূলনীতি বহাল রেখে অ্যামেরিকান রঙ ধারণ করবেন এবং এদেশের জন্যই কাজ করবেন।’


সত্যি বলতে কি, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলোর যে রঙ ও সৌরভ, তার তুলনা দেয়ার মতো আমি কোথাও আর কিছু খুঁজে পাই না, যদিও আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্ব নিয়ে লেখালেখি করে চলেছি। যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম আসলেই একটি বহুমাত্রিক ধর্ম। কেননা, তারা এসেছে বিশ্বের ৭৫টি দেশ থেকে এবং সাথে করে এনেছে ইবাদতের পৃথক পদ্ধতি। আমি দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও মধ্য-পশ্চিমের মুসলিমদের দেখতে গিয়েছি। দেখেছি নানা গোত্র, প্রথা, শ্রেণী, সংস্কৃতি ও ভাষার কলরোল, যেমনটি হজের সময় পবিত্র নগরী মক্কাতেই কেবল দেখা যায়।


পেনসিলভানিয়ার দূর পল্লীতে আমি দেখতে গিয়েছি সুফি মুসলিমদের। তাদের বেশিরভাগই শ্বেতাঙ্গ। তারা ধ্যান করেন, আল্লাহর জিকির করেন এবং ধর্মের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে পরস্পরকে বেঁধে রাখেন। তাদের বাসস্থানের নামগুলোও চমৎকার। ইসলাম গুরুত্ব দেয় এমন শব্দ দিয়েই বাড়িগুলোর নামকরণ করা হয়েছে - দয়া, সাহস, প্রশংসা, ভালোবাসা ইত্যাদি। দেড় শ’ একর আয়তনের এক কৃষিখামারে এসব বাড়ি অবস্থিত। একে বলা হয় শান্তির খামার। এখানে আছেন একজন ইমাম। তিনি ধ্যান করেন, নামাজে ইমামতি করেন, অসুখ-বিসুখে আকুপাংচার থেরাপি দেন। মোটের ওপর তিনিই সব কিছু - খামারের পশুপালকও তিনি, কসাইও তিনিই।


শিকাগোতে আমি দেখেছি বসনিয়ান মুসলিমদের; তাদের মেয়েরা রাসূল সা: -এর শানে হামদ-নাত গেয়ে থাকে। শিকাগোর উপকণ্ঠে এক ছোট ম্যলের পাশে একটি মসজিদেও গিয়েছি। এখানে দেখেছি প্রধানত দক্ষিণ এশিয়ার শিয়া মুসলিমদের। এ মসজিদে দেখলাম বাড়তি নিরাপত্তার জন্য দরজায় ডিজিটাল তালা লাগানো হয়েছে। ইমাম সাহেবকে বলতে শুনলাম ভোট দেয়ার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার, কমিউনিটিকে সংগঠিত করায় এবং মানুষের সেবা করার কথা বলতে। মিশিগানের ডিয়ারবর্নের মুসলিমদের দেখেছি। বেশির ভাগই বিভিন্ন আরব দেশ থেকে আসা। আমার পিতার দিকের আত্মীয়স্বজনের বেশিরভাগই এখানে থাকেন। এদের মুখের ভাষায় আরবি ও ইংরেজি মিশে গেছে, সাথে যোগ হয়েছে স্থানীয় উচ্চারণভঙ্গি। মধ্যপ্রাচ্যের রান্নাই বেশি চলে এখানে; পিজার চল খুবই কম।


হিউস্টনে আমি কিছু সময় কাটাই যুক্তরাষ্ট্রে স্প্যানিশভাষীদের প্রথম মসজিদ সেন্ট্রো ইসলামিকোতে। এটি চালু হয় ২০১৬ সালে। যে রাতে আমি সেখানে যাই, দেখি শতাধিক মানুষ নামাজ পড়তে মসজিদে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের যেসব মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে, ল্যাটিনোরা তাদের অন্যতম।


সেন্ট্রো ইসলামিকো মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা জেইমি মুজাহিদ ফ্লেচার। কথা হয় তার সাথে। তিনি এক সময় অপরাধী চক্রের সাথে যুক্ত ছিলেন, ইসলাম তাকে সুপথে এনেছে। নাইন-ইলেভেনের ঠিক আগে-আগে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার পরিবার থাকে কলম্বিয়ায়। ধর্মে রোমান ক্যাথলিক। তিনি পরিবারকে বোঝাতে পারেন না কেন তিনি নতুন ধর্ম গ্রহণ করলেন। কেননা, স্প্যানিশ ভাষায় ইসলাম বিষয়ক তেমন কোনো বই নেই। স্প্যানিশভাষী কোনো আলেমও নেই, যিনি স্পেনীয়দের ইসলাম বিষয়ক ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিতে পারেন। তবে তার মসজিদ থেকে এখন কিছু কিছু বই প্রকাশ করা হচ্ছে। জুমআর খুতবাগুলো স্প্যানিশ, ইংলিশ ও আরবি ভাষায় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।


কালো মুসলিমদের কথা


মার্কিন মুসলিমদের কথা বলতে গেলে কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের কথা বলতেই হবে। এদের বেশির ভাগই নিজেদের ‘আদিবাসী মুসলিম’ বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। অ্যামেরিকান মুসলিমদের এক-পঞ্চমাংশ এরা। কোয়েস্ট নামের কালো মুসলিমদের বাড়িঘরের দরজায় দেখা যায় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ‘আসসালামু আলাইকুম’ লেখা। নিউ ইয়র্ক নগরীর হারলেমে বহু কাল ধরে কালো মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের খাবারের দোকানে লেখাই থাকে : ‘এখানে শূয়রের মাংস বিক্রি হয় না’। ফিলাডেলফিয়ায় দেখেছি, কালো মানুষেরা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ‘সালাম’ ‘যাকাত’ ইত্যাদি ইসলামি পরিভাষা অবলীলায় বলে চলেছে। সাউথ লস অ্যাঞ্জেলেসে জিহাদ সাফির নামে এক ইমাম ও আলেম তার পিতার গড়া মসজিদকে কার্যত কমিউনিটি সেন্টার ও স্কুলের রূপ দিয়ে ফেলেছেন, যেখানে মুসলিম ক্ষমতায়ন এবং আফ্রিকান ও আফ্রো-অ্যামেরিকান ইতিহাসের আলোকে ইসলামের ইতিহাস শেখানো হয়।


রমজানের এক সন্ধ্যায় সাফিরের মসজিদে আমরা ইফতারের জন্য বসেছিলাম। আমাদের সামনে চীনা হালাল ফুড। আমার ঠিক পেছনেই বসেছিলেন হামিদাহ আলী। ২৭ বছর বয়সী এই আফ্রিকান-আমেরিকান নারী দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিম। কথায়-কথায় তার কাছে জানতে চাইলাম তার চোখে অ্যামেরিকায় ইসলামের চেহারাটি কেমন। কোনো দ্বিধা না করেই তিনি জবাব দিলেন, ‘ইসলাম ইজ কুল’। ইসলাম শান্ত ধর্ম, শান্তির ধর্ম।


মার্কিন দেশে জন্মগ্রহণকারী মুসলিমদের কাছে সাফিরের মসজিদকে খানিকটা ‘বিদেশী’ বলেই মনে হবে। কারণ, এখানে নানা দেশের নানা ভাষার মুসলিমরা এসে জড়ো হন। ইসলাম চায়ও যে, তরুণেরা তারা ছায়াতলে সমবেত হোক।


মার্কিন দেশে ইসলাম : পেছন ফিরে দেখা


অ্যামেরিকান জাতিসত্তার নকশী কাঁথায় ইসলাম একটি অংশ হয়ে আছে দীর্ঘকাল থেকে। ষোড়শ শতাব্দীতে দাস হয়ে প্রথম মুসলমানের এ দেশে আগমন। তাদের বেশির ভাগকেই আনা হয়েছিল পশ্চিম আফ্রিকা থেকে। পণ্ডিতদের মতে, নতুন দুনিয়ার ১০ থেকে ২০ শতাংশ দাস ছিলেন মুসলিম। এখানে তাদের ধর্ম পালন করতেও দেয়া হতো না। তাই তারা গোপনে নামাজ-রোজা করতেন; এতটাই গোপনে যে এক পর্যায়ে ওসব পরিবার আপন ধর্মকে ভুলে যায়। ক্রীতদাস সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে ইসলাম হারিয়ে যায়।


কিন্তু প্রবল চাপে ইসলাম হারিয়ে গেলে তার মৃত্যু ঘটেনি। বহু বছর পরে কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটে। ইসলাম তাদের কাছে পরিণত হয় অধিকার আদায় ও ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী অস্ত্রে। ‘ন্যাশন অব ইসলাম’-এর মতো সংস্থার মাধ্যমে এ আন্দোলনের সূচনা হয়। তবে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন মুসলিম চর্চা করছেন ইসলামের মূল ধারার, যা করতে বলে গেছেন প্রথমে ম্যালকম এক্স এবং পরে ওয়ারিখ দীন মোহাম্মদ। ন্যাশন অব ইসলাম গোষ্ঠীর বিশিষ্ট নেত্রী এলিজাহ মুহাম্মাদের পুত্র মোহাম্মাদও এ ধারারই অনুসারী। তার চেষ্টায় কালো মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের প্রথাগত ধারার চর্চা অনেক বেড়েছে।


আধুনিক ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম অভিবাসীদের ঢেউ আসতে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে; প্রধানত লেভান্ত থেকে। তাদের লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা অর্জন। তাদের বেশিরভাগই বসতি স্থাপন করে অ্যামেরিকার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে। প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় নর্থ ডাকোটায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম মসজিদ, যেটি এখনো টিকে আছে, সেটি আইওয়ায়। এটিই অ্যামেরিকার মাতৃমসজিদ, দ্য মাদার মস্ক অব অ্যামেরিকা। তবে ১৯২৪ সালে একটি অভিবাসন আইনবলে মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আইনটিতে এশীয়দের অ্যামেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা চলে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। সে বছর নতুন একটি আইনে বিশ্ববাসীর জন্য যুক্তরাষ্ট্র আবার তার দরজা খুলে দিলে অভিবাসীদের নতুন স্রোত শুরু হয়, যা এখন অবধি বহাল আছে। মুসলিম অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় দলটি এসেছে দক্ষিণ এশিয়া থেকে।


যুক্তরাষ্ট্রে এখন মসজিদের সংখ্যা ২,১০০-এর বেশি। তবে কোনো-কোনো অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে নিজস্ব মসজিদ এখনো স্বপ্নের মতো। যেমন, ক্যালিফোর্নিয়ার সাউথ স্যান জোসের স্যান্টা ক্লারার গ্রামাঞ্চলে।


এলাকাটির ভূ-প্রাকৃতিক দৃশ্য ভারি চমৎকার। আছে ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু সারি-সারি পাহাড় আর তারই ফাঁকে-ফাঁকে অনেকগুলো ভেড়ার খামার। এখানে আছে মোহাম্মদ ইদ্রিস হোসাইনের একটি খামারও। ফিজি বংশোদ্ভুত এই অ্যামেরিকান মানুষটি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধেও অংশ নেন। ১৯৮০’র দশকে তিনি এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তারই খামারের গোলাঘরে সাউথ ভ্যালির নানা বর্ণের মুসলিমরা নামাজ আদায় করেন। এটাই তাদের অস্থায়ী মসজিদ।


শুরুতে অবশ্য অস্থায়ী মসজিদ ছিল স্থানীয় শপিং মলের একাংশে। পরে তা এখানে সরে আসে। মাসে দেড় হাজার ডলার ভাড়া সাশ্রয়ের জন্য এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। অবশ্য মুসলিম জনগোষ্ঠী চাঁদা দিয়ে দ্রুত একটি তহবিল গঠন করে ফেলে। সে অর্থ দিয়ে তারা এক টুকরো জমি কিনলো। পরিকল্পনা হলো, এখানে গড়ে তোলা হবে কর্ডোভা সেন্টার। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা যেন এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। তারপর এক দশকেরও বেশি দিন কেটে গেছে, মুসলিম পরিবারের সংখ্যাও এখন এক শ’র কাছাকাছি, কিন্তু তাদের কোনো মসজিদ নেই। ইদ্রিস হোসাইনের গোলাঘরটিই এখনো তাদের মসজিদ।


নিজেদের একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলিমরা প্রায় ৩০ লাখ ডলার ইতোমধ্যে খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু সেটি এখনো এখনো আটকে আছে সোহাইল আখতারের নকশায়। পাকিস্তানি-অ্যামেরিকান সোহাইল হচ্ছেন এ প্রকল্পের ম্যানেজার। তিনি বলেন, ভীতি সৃষ্টিই হচ্ছে আমাদের বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় অস্ত্র। এটাই ওরা ব্যবহার করে। কারণ, আমরা সংখ্যায় খুবই কম। এই বিরোধীরা বলে যে আমরা নাকি এখানে সন্ত্রাসবাদীদের ট্রেইনিং ক্যাম্প বানানোর চেষ্টা করছি। আসলে এখানকার মানুষ আগে খুব বেশি মুসলিম দেখেনি। তারা জঙ্গিদের সাথে আমাদের গুলিয়ে ফেলেছে এবং ভয় পাচ্ছে।


ওই এলাকায় মুসলিমবিরোধী প্রধান গ্রুপগুলোর মধ্যে আছে গিলরয়-মরগান হিল প্যাট্রিয়টস এবং দ্য পিপলস কোয়ালিশন ফর গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি। প্যাট্রিয়টস নিয়মিত মুসলিমবিরোধী পোস্ট দেয় ফেসবুকে। এছাড়া তারা স্থানীয় পাঠাগার ও লায়ন্স ক্লাবে একজন বক্তা নিযুক্ত করেছে, যার কাজ হলো ‘ইসলাম অ্যামেরিকার জন্য হুমকিস্বরূপ’ এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা।


তবে ফ্যাট্রিয়টসের নারী প্রেসিডেন্ট জর্জিন স্কট-কোডিগা অবশ্য নিজেদের ইসলামবিরোধী বলে স্বীকার করতে রাজি নন। তার বয়ান, আমরা ইসলামবিরোধী নই, পরিবেশবাদী। এসব লোক এখানে এসে আশপাশ ভরিয়ে ফেলেছে। গাড়ি-ঘোড়ার জট লেগে যাচ্ছে রাস্তায়, হট্টগোল বেড়ে গেছে। আমরা এ এলাকাটাকে বাঁচাতে চাচ্ছি। আর ‘মুসলিমরা আমাদের জীবনধারা বদলে দেবে’ ভেবে যেসব লোক উদ্বিগ্ন, আমরা তাদের দুর্ভাবনাটাকেও বিবেচনায় নিই।


নাগরিক অধিকারের প্রবক্তারা মুসলিমবিরোধিতার এসব সস্তা কৌশল সম্বন্ধে সচেতন ও সোচ্চার। তারা বলেন, মুসলিমবিরোধী গোষ্ঠীগুলো। মুসলিমদের মসজিদ নির্মাণ বা গোরস্তান প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে প্রায়ই পরিবেশ বাঁচানোর ধুয়া তোলো। এটা চলছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সর্বত্র জর্জিয়া, ম্যাসাচুসেটস, মিনেসোটা, টেনেশি ও টেক্সাসে।


ফিরে আসি সাউথ ভ্যালিতে। ২০১২ সালে কাউন্টি প্ল্যানিং কমিশনে হয় ভূমি ব্যবহার বিষয়ক সভা। ওখানে উপস্থিত ছিলেন স্থপতি সোহাইল আখতার এবং অন্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ। কিন্তু সভায় তাদের কথাই বলতে দেয়া হয়নি। উল্টো বলা হয়, তোমরা তোমাদের নিজেদের দেশে ফিরে যাও।


সোহাইল আখতার বলেন, আমি এখানে আছি ১৯৯০ সাল থেকে এবং সেবারই প্রথম আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। আমার ছোটবেলা কেটেছে ইন্ডিয়ানার ওয়েনে। চরম বর্ণবাদী গোষ্ঠী কেকেকের ঘাঁটি ছিল ওটা। কিন্তু ৯/১১-পরবর্তী কালের মতো এত গোলমেলে পরিস্থিতি কখনো দেখিনি।


মসজিদ প্রতিষ্ঠা নিয়ে এই গোলযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের হেনস্তা করার প্রভাব পড়েছে সোহাইল আখতারের স্ত্রী ও সন্তানদের ওপরও। তিনি দেখছেন, মুসলিম বলে স্কুলে ঠাট্টা-তামাশার শিকার হয়ে এবং ‘সন্ত্রাসবাদী’ গালি শুনে তার জন্মসূত্রে অ্যামেরিকান সন্তানরা ইসলাম থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। তার স্ত্রী নুসরাত পেশায় একজন রিয়্যাল এস্টেট এজেন্ট। তিনিও এখন ক্রেতাদের বাড়ি দেখাতে নিয়ে যেতে ভয় পান। বলেন, অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। মাঝেমধ্যে ওকে (স্বামীকে দেখিয়ে) সঙ্গে নিয়ে যাই।


নুসরাত মনে করেন, তার হিজাব দেখে ক্রেতারা হয়তো ক্ষেপে যাবে এবং অপ্রীতিকর কিছু ঘটিয়ে বসবে। তিনি জানান, একবার এক মহিলা এসে তার হাতে ছোট একটি বুকলেট ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘এটা পড়ো। মজা পাবে।’ নুসরাত বলেন, আমি তখন বুঝতেই পারিনি জিনিসটা কী। পাতা ওল্টাতেই দেখি, ওটা মুসলিমদের নিয়ে একটি কমিক বই, যেখানে একজন মুসলিমের মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছে, ‘আমরা সবাইকে মেরে ফেলবো।’ পুরো বইটিতে মুসলিমদের নিয়ে অশালীন কৌতুক। আমি হতভম্ব হয়ে যাই।


নুসরাতের স্বামী সোহাইল আখতার অবশ্য বিষয়টাকে অন্যভাবে নেন। তার কথায়, ‘এই অপমান অবশ্যই কষ্টদায়ক। কিন্তু এটাই মুসলিমদের তাদের ঈমান ও অধিকার রক্ষায় আরো কৃতসঙ্কল্প করেছে।’ তিনি বলেন, ‘এটাই আমাদের দেশ। একজন এসে বলল, ‘তোমরা তোমাদের দেশে চলে যাও’ আর অমনি আমরা সুড়সুড় করে চলে যাবো? এত সোজা!’


মালয়েশিয়ান-অ্যামেরিকান বাকরি মুসা পেশায় সার্জন। তিনি বিরোধিতা মোকাবেলায় আইনের আশ্রয় নেয়ার পক্ষপাতী। তার কথা, ওরা আমাদের মসজিদে আগুন দিলো তো, আমরা ওদের মামলা দিয়ে ভোগাবো।


মার্কিন মুসলিম হওয়াটাকেও ভালোবাসেন মুসা। কারণ, এ দেশে কথা বলা ও ধর্ম পালনের অধিকার সুরক্ষিত। এখানে যে-কেউ যা খুশি তা হতে পারে। অ্যামেরিকান হতে পারে, মুসলিমও হতে পারে।


মুসা থাকেন একটি ভেড়ার খামারের সাদাসিধে এক বাড়িতে। সেখানে শেলফে বইয়ে বোঝাই। শিয়া ও সুন্নি উভয় মতবাদী লেখকদের বই। মুসা বলেন, আমার দেশ মালয়েশিয়ায় আমি যদি শিয়া মতবাদের বই রাখতাম তো আমাকে নিয়ে জেলখানায় ভরে দিত। কিন্তু এটা অ্যামেরিকা। এখানে কোনোর রকম বাধাবিঘ্ন ছাড়াই মুসলিম হওয়া যায়, পণ্ডিত হওয়া যায়।


মুসার সাথে আলাপের পরদিন মসজিদ কর্তৃপক্ষ একটি কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিয়ে আয়োজন করে এক আন্তঃধর্ম নৈশভোজের। দাওয়াত দেয়া হয় ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতা এবং আরো অনেক অতিথিকে। মুসা ও তার কানাডিয়ান বংশোদ্ভুত স্ত্রী বসেছিলেন এক ইহুদি দম্পতির পেছনে এবং পরিবেশিত দক্ষিণ এশীয় খাবার কোনটা কী বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। এখানকার মুসলিম কমিউনিটি প্রায়ই এই আন্তঃধর্মীয় সমাবেশটা করে থাকে। বিরোধীরা যত সোচ্চারই হোক, মুসলিম জনগোষ্ঠী মনে করে একদিন এখানকার সমাজ তাদের কাছে টেনে নেবে এবং মসজিদ নির্মাণে আর বাধা দেবে না।


একজন রামি নাশাশিবি


শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলে আমি দেখা পাই রামি নাশাশিরির। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন ইনার-সিটি মুসলিম অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ইমান) নামে একটি সংগঠন। দুই দশক ধরে সেটি চালিয়ে আসছেন তিনি। তার অফিসের সাথেই আছে একটি ক্লিনিক, নামাজের জায়গা ও ক্যাফেটেরিয়া।


৪৬ বছর বয়সী সমাজকর্মী রামি নাশাশিবি তার সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামকে কাজে লাগিয়ে বঞ্চিত মানুষের সেবা করার লক্ষ্যে। এখন তিনি নানা জাতিগোষ্ঠীর মুসলিমদের একটি জোটে নিয়ে আসার কাজ করে চলেছেন কালো, দক্ষিণ এশীয়, আরব, শ্বেতাঙ্গ, ল্যাটিনো সব জাতি ও ধর্মের মুসলিম। সবাইকে নিয়ে এ এলাকার সামাজিক সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করতে চান তিনি আর এ কাজে ব্যবহার করতে চান ধর্মকে।


অথচ কী আশ্চর্য, নাশাশিবির জন্মই হয়েছে এক ধর্মহীন আরব বাবা-মায়ের ঘরে। অনেক ধর্মান্তরিত মার্কিনির মতো হিপ-হপ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনে যোগ দিয়ে ইসলামের সন্ধান পান নাশাশিবি। নিজের সঙগঠন ‘ইমান’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নাশাশিবি হরদম উদ্ধৃতি দেন ইমান ওয়ারিথ দীন মোহাম্মদের। ইনিই ধর্মের পথে নিয়ে আসেন নাশাশিবিকে। তাই তাকে ভুলতে পারেন না নাশাশিবি, যদিও ইমাম ইন্তেকাল করেছেন সেই ২০০৮ সালে।


নাশাশিবির সংগঠন এখন কাজ করছে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর মানুষকে কম দামে খাবার দেয়া, চিকিৎসা দেয়া এবং কারামুক্ত মানুষকে সমাজের মূল ধারায় পুনঃপ্রবেশে সহায়তা দেয়ার কাজে।


রমজান মাসে বছরের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে ‘ইমান’। ঠিক এ সময়টাতেই আমি তাদের কার্যক্রম দেখতে যাই। সেদিন তাদের ক্লিনিকের পেছনের পার্কিং লটে ছিল ইফতার মাহফিল। ছিল নানা রকম ইফতারসামগ্রী। দাওয়াত করা হয়েছিল আশপাশের অনেককে সামাজিক সংগঠক, রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও বন্ধুবান্ধব।


ইফতারের আগে সমবেত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন নাশাশিবি। বলেন, ‘আমরা হেলথ কেয়ার কাজ করছি, আবাসন নির্মাণ করছি। কিন্তু যত যা-ই করি না কেন, সব কিছু অর্জন করতে হবে ক্ষমতা অর্জন, সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং জোট বাঁধার মধ্য দিয়ে। তাই আমাদের হ্যাশট্যাগ হলো ‘ফাইট ফিয়ার, বিল্ড পাওয়ার’ (ভয়কে জয় করো, ক্ষমতা অর্জন করো)। আমি এ কথাটি আপনাদের মুখেও শুনতে চাই।’ বলেই হাঁক দেন নাশাশিবি - ‘ফাইট ফিয়ার!’ জনতার সগর্জন প্রত্যুত্তর আসে ‘বিল্ড পাওয়ার!’


পরদিন ইমান-এর একদল কর্মী কাছের একটি দোকানে যায়। তাদের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় আমের সালসা ও অন্য দু-এক রকম হালকা ইফতারি। সেদিন সন্ধ্যায় তারা পথচারীদের হাতে তুলে দেন ইফতারির প্যাকেট। প্যাকেটের গায়ে লেখা : জুস যত মিষ্টি, সম্পর্ক তত গভীর।


দোকানের সামনে বসেছিলেন সাদিয়া নওয়াব। ২৮ বছর বয়সী এ পাকিস্তানি-অ্যামেরিকান তরুণী ‘ইমান’-এর শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক ব্যবস্থাপক। তার মাথায় বহু রঙে বর্ণিল স্টাইলিশ হিজাব, নাক ফোঁড়ানো।


সাদিয়া বড় হয়েছেন বিচিত্র এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। তার বাবা-মা পাকিস্তানি, কিন্তু তার বেড়ে ওঠা শিকাগোর এমন এক শহরতলিতে, যেখানে প্রধানত আরব অভিবাসীরাই বসবাস করে। আবার লেখাপড়া করেছেন যে স্কুলে, সেখানকার বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই শ্বেতাঙ্গ। পাশাপাশি অন্যান্য জাতির শিক্ষার্থীও ছিল। সব মিলিয়ে মিশ্র সংস্কৃতির কোলাহলে সাদিয়া তার মুসলিম স্বত্বটি হারাতে বসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম যে আমি মুসলিম। কিন্তু এর অর্থ কী, তা বুঝতাম না। লোকজন আমাদের নানা ভাগে ভাগ করে দেখত আরব, মুসলিম, অভিবাসী, ইংরেজি না জানা ইত্যাদি। বুঝতাম না, আমি এর মধ্যে কোন ভাগে পড়ি।


‘ইমান’-এর সংস্পর্শে এসে সাদিয়া বুঝতে শুরু করেন ‘মুসলিম’ হওয়ার অর্থ কী। এখানেই নিজ ধর্মে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পান তিনি। শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলের অনগ্রসর মানুষদের মধ্যে কাজ করতে-করতে তার মধ্যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বলেন, আমার বয়স তখন ১৭। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বয়স। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি মানসিকভাবে উজ্জীবিত বোধ করতে থাকি।


সাদিয়ার মতে, ওই সময় তার দরকার হয়ে পড়েছিল কিছু মেন্টরের (বিজ্ঞ পরামর্শদাতা বা পথ প্রদর্শক), যারা একজন অ্যামেরিকান মুসলিম তরুণী হিসেবে তাকে বুঝতে পারবেন। ‘ইমান’ সংগঠনে এসে তিনি যা চাইছিলেন তা পেয়ে যান। তাই বলেন, এখানে নিজেকে কখনোই বহিরাগত মনে হয় না। মনে হয়, আমি এখানকারই।


নাশাশিবি বলেন, এদেশের টেলিভিশনগুলোতে ইসলামকে প্রায়ই ‘অ্যামেরিকার জন্য বিদেশী হুমকি’ হিসেবে দেখানো হয়। ‘ইমান’ হচ্ছে এমন একটা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মার্কিন মুসলিমরা ইসলামের সাথে ভালোভাবে পরিচিত হবে। আর আজকের দিনে মুসলিমদের জন্য অ্যামেরিকাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ স্থান। কেননা, এদেশ বরাবরই, এমনকি তার চরম অন্ধকার দিনেও, নানা মত ও পথকে জায়গা করে দিয়েছে।


বিবার্তা/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com