কানিজ ফাতেমার স্বপ্ন পূরণের গল্প
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:৩২
কানিজ ফাতেমার স্বপ্ন পূরণের গল্প
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় জীবনকে নিয়ে সবাই নানান ধরনের স্বপ্ন দেখেন। কেউ সরকারি চাকরি করার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার হওয়ার, কেউবা পাইলট হওয়ার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন নিজ উদ্যোগে কিছু করার। সেটা শুধু নিজের জন্য নয়, দশের জন্য ও দেশের জন্য। কথায় আছে না, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। সেটিই বাস্তব হয়ে ধরা দেয় তার জীবনে। পরিবারের সহায়তা, প্রবল ইচ্ছে শক্তি, অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিক চেষ্টায় আজ তিনি স্বাবলম্বী। নিজের একটা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। যেখানে রয়েছে একদল দক্ষ কর্মীবাহিনী।


বলছিলাম টপ লেদারের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমার কথা। আত্মপ্রত্যয়ী ও সংগ্রামী এই উদ্যোক্তার সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক ঘটনা। অসংখ্যবার ব্যর্থ হয়েও দমে যাননি। বারবার কঠিন আঘাতেও ভেঙে পড়েননি। দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অদম্য ও অধ্যবসায়ী এই জীবন যোদ্ধা।


সিরাজগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম কানিজ ফাতেমার। বাবা সরকারি চাকুরে। মা গৃহিণী। ২০০৭ সালে সিরাজগঞ্জ থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। ইলেক্ট্রো মেডিকেলে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেছেন ঢাকার আগারগাঁও মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে। পরে বিএসসি করার জন্য ভর্তি হন ইউল্যাব ইউনিভার্সিটিতে। পারিবারিক অসুবিধার কারণ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংটা আর শেষ করা সম্ভব হলো না তার। এরই মধ্যে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। শুরু হয় নতুন জীবন। তার কোল জুড়ে আসে ভালোবাসার ফসল। সন্তানের মা হন তিনি। সন্তান, পরিবার, স্বামী, সংসার সব সামলে স্নাতক আর শেষ করা হলো না তার। মুখোমুখি হন নানান চ্যালেঞ্জের।



কানিজ বলেন, যখন আমর জীবনের এই বাস্তবতা আসে তখন বাবাকে জিজ্ঞেস করি, বাবা এখন আমি কী করবো? বাবা তখন পরামর্শ দিলেন তুমি ব্যবসা করো। কিন্তু কীসের ব্যবসা করবো? বাবা জানালেন, বুটিকসের ব্যবসা করতে পারো। এটা নিয়ে প্রথমে জানো। পরে ব্যবসা শুরু করো। তখন আমি উদ্যোক্তা সম্পর্কে এসএমই ফাউন্ডেশন, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বিসিক, বি’ইয়া থেকে বেশ কয়েকটি ট্রেনিং করি। কিন্তু বুটিকের ব্যবসার করার সায় দিলো না মন। ভালো লাগেনি। আমি দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য নিয়ে কাজ করার কথা চিন্তা করি। বাবা বললেন, তুমি লেদার ফুটওয়্যার নিয়ে কাজ করো।


২০১৯ সাল। নিজের ফিউচার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন কানিজ। নিজের জমানো ৪ লাখ টাকা নিয়ে লেদার ফুটওয়্যারের ব্যবসা করার পরিকল্পনা করেন তিনি। তখন ৬ লাখ টাকা নিয়ে পরম মমতায় পাশে দাঁড়ালেন বাবা তোজাম্মেল হক। হাজারীবাগ নোয়াখালী টেনারি ভবনে মাত্র ৪০০ স্কয়ার ফিটের ৫ জন কর্মী ও ৬টি মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এক স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তার। ডাবল সেটাপ ও লেদারগুডসের প্রোডাক্টাসের। লেদার সু, লেদার ফুটওয়্যার, লেডিস, জেন্টসের এবং পুরুষদের জন্য নাগরা। ঈদের প্রথম রাতেই সেল হয়ে গেলো ৮০ হাজার টাকার সু। স্বপ্নভরা চোখ নিয়ে কাজ করা শুরু করে তরুণ উদ্যোক্তা কানিজ। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। আবার বিকেলে ৪-৫ ঘণ্টা নিজের পণ্যের মান উন্নয়নে গবেষণা, নিজের হাতে সব তদারকি করা, সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করাসহ নিবিড়ভাবে কাজ করেন কানিজ। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করেন তিনি। কেননা এ যুদ্ধ যে জয় করতেই হবে তাকে।


মাত্র ২ মাসে হোল সেলে ফুল রোটেশনে পড়ে যান নিজের উৎপাদিত পণ্যের প্রোডাক্টশন নিয়ে এই উদ্যোক্তা। ৫ ডজন থেকে ২০ ডজন কাস্টমার বাড়তে থাকে। সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে অনইলানে পণ্যের অর্ডার আসতে থাকে। কাস্টমারদের পছন্দ, রুচি ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে হরেক রকমের সু বানাতে থাকেন কানিজ। সম্পূর্ণরূপে ফ্যাক্টরি হয়ে দাঁড়ালো লেদার ফুটওয়্যার ফ্যাক্টরিতে। মাত্র ৯ মাসে ৫০-৬০টি ডিজাইনের লেডিস এবং জেন্টস সু, স্যান্ডেল তৈরি করেন তিনি। একের পর এক তৈরি করেন নিত্যনতুন ডিজাইনের সু। উদ্যোক্তা পথে এগিয়ে যান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একেকটি সিঁড়ি বেয়ে। নিজেকে প্রমাণ করেন আমিও পারি।



সময়ের পালাবদলে উদ্যোগ বড় হতে থাকে। প্রতি মাসে নতুন নতুন অর্ডারে যুক্ত হতে থাকে বড় পরিমাণের অংক। কখনো ২ লাখ টাকার ২৫টি ডিজাইনের সু। কখনো ২৫ হাজার টাকার ২টি ডিজাইনের সু। এভাবে এগিয়ে যান তরুণ উদ্যোক্তা। সেসাথে বাড়তে থাকে নতুন কর্মসংস্থান।


ইউরোপ কিংবা আমেরিকার নতুন যেকোনো ডিজাইনের যেকোনো সুর আদলে সুর অর্ডার দিলে সেগুলো একের পর এক তৈরি হতে থাকে কানিজের ফ্যাক্টরিতে। নিজের দক্ষতাকে আরো শাণিত করতে চামড়া ও চামড়াজাতপণ্য বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। আজ তার ক্লায়েন্ট লিস্টে ৭০-৮০টি নাম সারাদেশের ২০টির বেশি জেলায় তার পণ্য পৌঁছে সরাসরি বা অনলাইনে যাচ্ছে নিয়মিত।


৫ জন কর্মী এবং ১০ লাখ টাকার মূল্যমানের পণ্য নিয়ে শুরু করা ব্যবসাটি মাত্র এক বছরে সেটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখ টাকার মূল্যমানের ব্যবসা। বিভিন্ন জাতীয় উদ্যোক্তা মেলায় অংশগ্রহণ করেন কানিজ। ২০১৯ সালে বি‘ইয়া মেলায় অংশগ্রহণ করে পেয়েছেন শীর্ষ ১০ উদ্যোক্তা সম্মাননা।



কানিজের প্রতিষ্ঠানের পণ্যগুলো শতভাগ চামড়া দিয়ে তৈরি। গাজীপুরে তার একটি শোরুম রয়েছে। বর্তমানে অনেক সাড়া পাচ্ছেন। দারাজসহ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত আছেন। এছাড়াও ফেসবুকে এবং অনলাইনে অর্ডার নিয়ে থাকেন। পাইকারি এবং খুচরা বিক্রি করেন।


কাঁচামাল কোথা থেকে সংগ্রহ করেন? জাবাবে জানিজ জানান, রাজধানীর হাজারীবাগ, সিদ্দিকবাজার, বংশাল ও নয়াবাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করি। আমার কারখানায় নারী ও পুরুষের নানা ধরনের জুতা ও স্যান্ডেল তৈরি করা হয়।


নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বিভিন্ন সময় নানান প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে কানিজকে। তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে আমাকে কোনো সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়নি। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংক ঋণ পাওয়া অনেক জটিল। অনেক জটিলতার পর ঋণ পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, নারীরা এমন কিছু সমস্যা মোকাবিলা করে যেটা একই সমাজের একজন পুরুষকে করতে হয় না। বিশেষ করে যখন একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ঘর থেকে বের হই, তখন অনেকে সুনজরে দেখেন না। অনেকে অশালীন মন্তব্যও করেন। তাই এ ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে একজন নারী শুধু চাকরির বাজারে নয়, বরং নিজে উদ্যোক্তা হয়ে অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি পর্যায় থেকে কী কী সুবিধা দেয়া দরকার বলে মনে করেন? কানিজের ভাষ্য, প্রথমত, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা। তাহলে অনেকে ব্যবসায় আগ্রহী হয়ে উঠবেন। অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এতে বেকারত্ব দূর হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতি ত্বরান্বিত হবে। দ্বিতীয়ত, নারীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাসহ নারীদের তৈরি পণ্যের প্রচার করতে হবে।


নতুন উদ্যোক্তার প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে? জবাবে তিনি বলেন, নতুন নারী উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলবো ব্যবসার সাফল্য মানসিকতা ও কাজের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে। তাই যেকোনো ব্যবসা শুরুর আগে এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ধৈর্যশীল হতে হবে। আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। কথায় ও কাজে মিল থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা ও ক্রেতার আস্থা অর্জনে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে হবে। জীবনে উন্নতি করতে চাইলে পরিশ্রমী হতে হবে। সফল হওয়ার অদম্য ইচ্ছা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, নারীদের চলার পথে অনেক বাধা আসে। তাই ভেঙে পড়া যাবে না। এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে। আর বিশেষ কথা হলো স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছে থাকলে সেটি একদিন পূরণ হবেই।


উদ্যোগ নিয়ে ভবিষ্যতের ভাবনা সম্পর্কে কানিজ বলেন, স্বপ্ন দেখি ২০২৩ সালেরে মধ্যে সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটা ঘরের মানুষ যেনো জানতে পারে দেশীয় ব্র্যান্ড টপলেদার সম্পর্কে। অনলাইন ও অফ লাইন দুটি মাধ্যমেই এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সারাদেশের পর পরকিল্পনা রয়েছে বিদেশে পণ্য রফতানি করার। টপ লেদারের বাজারজাত করা পণ্যের সুনাম থাকবে মানুষের মুখে মুখে। যেসব পণ্য উৎপাদন করছি এর সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বাড়াতে চাই। আমি চাই আমার প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করুক। বিশেষ করে দেশের হাজারো বেকার নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।


বিবার্তা/গমেজ/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com