মজুরি বৈষমের শিকার নারী কৃষি শ্রমিক
হামরা কামাই না করলে কিস্তি দিবে কায়?
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১৭:৫৫
মজুরি বৈষমের শিকার নারী কৃষি শ্রমিক
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

হামরা কামাই না করলে ঋণ আরও বাড়বে, তাই ‘ওমার (স্বামীর আয়ে) কামাইয়ে কোনোমতে খাওয়া চলে। আর নিজের কামাইয়ে ঋণের কিস্তি দেই।’ আর হামরা যদি মাইনসের (মানুষের) কাম (কাজ) না করি তাহলে কিস্তি দিবে কায়? ঘর ছেড়ে মাঠে কাজ শুরুর আগে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন লালমনিরহাটের কাকিনা চাপারতল এলাকার পঞ্চাশোর্ধ নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম।


কৃষি ফসলে নারী শ্রমিকেরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মজুরি পান পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক ফলে মজুরি বৈষমের শিকার নারী কৃষি শ্রমিকরা। ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লেও বাড়েনি পারিশ্রমিক। নারী ও পুরুষ শ্রমিকের আয়ে কোন রকম চলে সংসার।


ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে লালমনিরহাটের চরাঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে নারী শ্রমিকের সংখ্যা। মজুরিতে বৈষম্য থাকলেও সংসার টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে মাঠে নামছেন আলেয়া বেগমের মতো গৃহবধূরা।


লালমনিরহাটের চরাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের বাস। এক সময়ের ধনী পরিবারগুলো নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন তিস্তা কূলবর্তী এলাকাতে। শ্রম বিক্রিই তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। বছরের বিভিন্ন সময়ে নিজ এলাকায় কাজ না থাকলে পরিবার প্রধানরা কাজের সন্ধানে ছুটে যান ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তারপরও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে বেসরকারি সংস্থার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে পরিবারগুলো।


সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার চরাঞ্চলসহ সব জায়গায় চলছে বোরো ধান ক্ষেতের পরিচর্যাসহ আগাম ধান কাটা, মিষ্টি কুমড়া ও মরিচ উত্তোলন চলছে।


গংগাচড়ার মহিপুর তিস্তার চরে একসঙ্গে কাজ করছিলেন কয়েকজন নারী শ্রমিক। এ সময় মিনতি রানী, আজোবালা ও খোদেজা জানায়, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজের বিনিময়ে তারা মজুরি পান মাত্র ৩০০ টাকা। সমপরিমাণ কাজের জন্য পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।


কাকিনা রুদ্রেশ্বর চরের মমেনা, আছিরন নেছা ও আকলিমা বেগম জানান, সংসার জীবনে এই প্রথম তারা বাড়ির বাইরে মাঠে শ্রম বিক্রি করছেন। কারণ জানতে চাইলে আঁচলে মুখ লুকিয়ে তারা কষ্টের বর্ণনা দেন, প্রতি সপ্তায় কিস্তির টাকা দেওয়া লাগে। কাজ না করলে আমাদের মরণ।


চরাঞ্চলে এমন কোনো পরিবার নেই যারা বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নেয়নি। কেউ কেউ একাধিক সংস্থা থেকেও ঋণ নিয়েছেন অভাবের কারণে। প্রতি সপ্তাহে ২৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের কিস্তি জমা দিতে হয় তাদের।


কাকিনা চাপারতল এলাকার হাছনা বেগম বললেন, ‘মানুষটাতো (স্বামী) বিদেশোত (ভিন্ন জেলায়) কাম (কাজ) করে। মোকে (আমি) কাম করি ঋণের কিস্তি দেওয়া নাগে (লাগে)।’ তিনটা গরু পুষি। ক্ষেত থাকি ঘাস তুলি আনি খাওয়াই। গত বছর মেয়ের বিয়ে দিতে ৬ মাস আগে এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। কাজ করে পরিশোধ করবেন।


কাকিনার ইউপি সদস্য ইয়াছিন আলী বলেন, বর্তমানে এলাকায় একজন শ্রমিকের মজুরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। আর নারী শ্রমিক হলে তার মজুরি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।


নারী উদ্যেক্তা ও সমাজকর্মী রুখশাহানারা মুক্তা জানান, চরাঞ্চলের পরিবারগুলো বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার ঋণের জালে আটকা পড়েছেন। সারা বছরই তাদের সাপ্তাহিক হিসেবে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। মজুরিতে বৈষম্য হলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাগিদে দিন দিন নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com