গুজব-এআই ছবির বিভ্রান্তি ভেঙে সত্য উন্মোচন: টাঙ্গাইলের কবির হোসেন প্রকৃত কৃষক
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৪৬
গুজব-এআই ছবির বিভ্রান্তি ভেঙে সত্য উন্মোচন: টাঙ্গাইলের কবির হোসেন প্রকৃত কৃষক
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড পাওয়া কবির হোসেনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি ও বিতর্কের অবসান ঘটেছে। এআই-নির্ভর ছবি ও আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ‘অপ্রকৃত কৃষক’ হিসেবে প্রচার করা হলেও, সরেজমিন তদন্ত, প্রশাসনের যাচাই এবং স্থানীয়দের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে তিনি একজন প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক।


মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত কৃষক কার্ড বিতরণ ও প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির হাত থেকে কার্ড গ্রহণ করেন ঘারিন্দা ইউনিয়নের উত্তর তারটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবু সাইদ মিয়ার ছেলে কবির হোসেনসহ ১৫ জন কৃষক। অনুষ্ঠানে তিনি কৃষক হিসেবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বক্তব্যও দেন।


তবে অনুষ্ঠান শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কিছু ছবি ভাইরাল হয়ে পড়ে। সেখানে তাকে বিত্তশালী বা ‘অপ্রকৃত কৃষক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি পূর্বে তার পোস্ট করা কিছু এআই-নির্ভর ছবিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে, যা বিভ্রান্তিকে আরও উসকে দেয়।


কিন্তু বুধবার বিকাল ও বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। কবির হোসেন একটি সাধারণ টিনের ঘরে বসবাস করেন। বাড়ির সামনে সবজি চাষ এবং পেছনে গরু, হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার নিজস্ব জমি রয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করে আসছেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি একজন ক্ষুদ্র ও পরিশ্রমী কৃষক হিসেবেই পরিচিত।


স্থানীয় কৃষক মো. জয়নাল ও কুরবান আলীসহ একাধিক ব্যক্তি জানায়, কবির নিয়মিত কৃষিকাজের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করেন। এই দুই পরিচয়ের কারণে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছেন। তবে কৃষিকাজই তার মূল পেশা,এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। কৃষক কার্ড কার্যক্রম নিয়েও একই ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।


জানা যায়, কবির হোসেনের জীবন সংগ্রামমুখর। ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যান। সেখানে সফল না হয়ে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার একটি সেচ মেশিন রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি নিজে ও আশপাশের জমিতে সেচ সুবিধা দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি ফেসবুকে ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে কিছু অতিরিক্ত আয়ও করেন।


বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বাড়লে কৃষি প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগ নেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার (১৫ এপ্রিল) তার বাড়িতে গিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তারা নিশ্চিত করেন, কবির হোসেন প্রকৃত কৃষক এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।


এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিও ঘটনাটি খতিয়ে দেখে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী কবির হোসেন একজন প্রান্তিক কৃষক হিসেবে কার্ড পাওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য।


এ বিষয়ে কবির হোসেন বলেন,আমি একজন কৃষক। অল্প কিছু জমি আছে, পাশাপাশি অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করি। কৃষিকাজের পাশাপাশি ফেসবুকে কনটেন্ট তৈরি করি। কিছু এআই ছবি পোস্ট করার কারণে মানুষ ভুল বুঝছে। ভালো পোশাক পরা বা পরিপাটি হয়ে কথা বলা কি অপরাধ?


তিনি অভিযোগ করেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যার ফলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।


স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ঘারিন্দা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সৈয়দ কবিরুজ্জামান ডল জানান, কবির দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং গরু পালন ও সবজি চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার বিরুদ্ধে ছড়ানো তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন,আমরা সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করেছি এবং কবির হোসেনকে একজন প্রকৃত কৃষক হিসেবেই পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সম্মানিত করতে সরকারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিকে বিতর্কিত করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখতে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।


বিবার্তা/বাবু/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com