তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে দূষিত পানি, হুমকিতে মাছের প্রজনন
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৮
তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে দূষিত পানি, হুমকিতে মাছের প্রজনন
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত বেড়েছে তামাকচাষ। লাভজনক হওয়ায় কৃষকের ঝোঁক বাড়লেও এই চাষে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নদীর পানি দূষিত করছে। এর ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে মাছসহ নানা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। তবে বিস্ময়করভাবে, তিস্তার চরাঞ্চলে ঠিক কত জমিতে তামাকচাষ হচ্ছে—তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে। একই সঙ্গে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে কার্যকর উদ্যোগেরও অভাব রয়েছে।


স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বুকে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ নানা ফসল আবাদ সম্ভব হলেও অধিক মুনাফার কারণে অধিকাংশ জমিই এখন তামাকের তারা জানান, গত দুই দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্ররোচনা, সহজ ঋণ ও আগাম চুক্তিভিত্তিক কেনাবেচার কারণে এই প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। তামাকচাষে অন্যান্য ফসলের তুলনায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।


রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুর এলাকার কৃষক সামাদ সরকার জানান, “প্রায় ২৫ বছর ধরে আমি প্রতি মৌসুমে ১২ থেকে ১৫ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করছি। অন্য ফসলও হয়, কিন্তু লাভ কম। তামাকেই আয় বেশি।”


তিনি আরও বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি কম থাকে, মাছও কম থাকে। তাই তামাকচাষে পানি দূষণের কারণে মাছ কমছে—এটা পুরোপুরি ঠিক নয়।”


একই ধরনের মত দিয়েছেন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধান এলাকার কৃষক নজু মিয়া । “আগে আমরা গম, কাউন, পেঁয়াজ-রসুন চাষ করতাম। এখন সবাই তামাক করছি। খরচ বেশি হলেও লাভ হয়,” বলেন তিনি।


তবে তিনি স্বীকার করেন, “রাসায়নিকের কারণে কিছুটা পানি দূষণ হয়, কিন্তু এতে মাছের প্রজনন পুরোপুরি বন্ধ হয়—এটা আমরা মনে করি না।”


কৃষকদের এই দাবির সঙ্গে একমত নন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। জেলেদের দাবি নদীরবুকে তামাকচাষ তিস্তায় মাছ প্রজনন ঘটাতে অন্তরায় ভূমিকা রাখছে।


লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি এলাকার জেলে নারায়ন চন্দ্র দাস বলেন, “তামাকচাষ শুরু হওয়ার আগে তিস্তায় অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন নদী প্রায় ফাঁকা। শুষ্ক মৌসুমে তো পানি থাকে না, বর্ষাতেও আগের মতো মাছ নেই।”


তিনি অভিযোগ করেন, “তামাকচাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে পানি দূষিত হচ্ছে। এতে মাছের ডিম নষ্ট হয়, প্রজনন কমে গেছে। ফলে আমাদের জীবিকাই হুমকিতে।”


আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার চরে যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই তামাকখেত। কিন্তু চরাঞ্চল আবাদি জমি অস্থায়ী হওয়ায় এখানে ফসলের নির্ভরযোগ্য কোনো জরিপ করা সম্ভব হয় না।”


তিনি জানান, কৃষকদের তামাকচাষ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হলেও তামাক কোম্পানির প্রভাবের কারণে তারা তা মানছেন না। “তামাকচাষ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে,” বলেন তিনি।


লালমনিরহাট জেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন জানান, তামাকচাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নদীতে প্রবেশ করে পানি বিষাক্ত করে তোলে।


তিনি বলেন, এসব রাসায়নিক মাছের শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটায়। মাছের ডিম ধ্বংস করে। দীর্ঘমেয়াদে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটায় ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে।


তিনি আরও বলেন, “রাসায়নিক সারের নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পানিতে মিশে অতিরিক্ত শ্যাওলা সৃষ্টি করে, যা পানির অক্সিজেন কমিয়ে মাছের মৃত্যুর কারণ হয়। এতে পানি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে।


রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক আয়নাল হক জানান, “দুই যুগ আগেও তিস্তা নদীতে ১৪০-১৫০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০-৩৫ প্রজাতিতে, তাও খুবই কম পরিমাণে।”


তিনি বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের পাশাপাশি তামাকচাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যান্য জলজ প্রাণীও কমে যাচ্ছে।”


তিনি বলেন, তিস্তা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ “তিস্তার বুক থেকে তামাকচাষ বন্ধ করতে হবে। নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখতে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com