
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট উৎসবে মেতে উঠেছে সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত প্রচার- প্রচারণা শুরু হতেই প্রতিশ্রুতির শব্দে সরগরম হয়ে উঠেছে জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী মাঠ। গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, পথসভা ও জনসভায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। দম ফেলার ফুসরত নেই তাদের কর্মী- সমর্থকদেরও।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আগ্রহ এবার চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার ক্ষোভ থাকলেও, এবার নিজের ভোট নিজেই দেওয়ার প্রত্যাশায় তারা আশাবাদী। প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ভোটাররা খুঁজছেন এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি কেবল আশ্বাস নয়—বাস্তব কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফেরাবেন।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের উত্তরের প্রান্তে অবস্থিত লালমনিরহাট জেলা পাঁচটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এক পাশে প্রবাহিত তিস্তা নদী, অন্য পাশে দীর্ঘ ভারতীয় সীমান্ত। এই দুই বাস্তবতা নিয়েই জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা। তিস্তা যেন এ জেলার দুঃখের প্রতীক। বাঁধ নির্মাণ, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও ন্যায্য পানিবণ্টনের প্রতিশ্রুতি এসেছে বারবার। সরকার বদলেছে, প্রতিশ্রুতিও বদলেছে—কিন্তু বদলায়নি নদীপাড়ের মানুষের ভাগ্য।
বর্ষা মৌসুমে তিস্তার ভাঙন ও বন্যায় সর্বস্ব হারান হাজারো পরিবার। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন কৃষকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তাহীনতা, চোরাচালান ও নানা সামাজিক ঝুঁকি। এসব সমস্যা সমাধানই এবার ভোটারদের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিকভাবে এবারের নির্বাচনে লালমনিরহাটের তিনটি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তবে একটি আসনে সদ্য নিবন্ধন পাওয়া ‘জনতার দল’ আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাসান রাজীব প্রধান এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজুর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন।
লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) আসনে বিএনপির রোকন উদ্দিন বাবুল, জামায়াতের ফিরোজ হায়দার লাভলু এবং সদ্য নিবন্ধিত জনতার দলের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার শামীম কামাল ভোটের মাঠে রয়েছেন। এই আসনে ত্রিমুখী লড়াই ভোটের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লালমনিরহাট-৩ (সদর উপজেলা) আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবিব দুলু এবং জামায়াতের জেলা আমির আবু তাহের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একসময় জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটির প্রভাব এখন অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জেলার তিনটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯৬ জন। ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব, তিস্তার স্থায়ী সমাধান, কৃষকের ন্যায্য অধিকার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জেলা ও গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন। জেলার একমাত্র মহাসড়কসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও রয়েছে ভোটারদের প্রত্যাশার তালিকায়।
সব মিলিয়ে লালমনিরহাটে এবারের নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, অনেকের কাছে এটি ভাগ্য বদলের অঙ্ক। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আর বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নের মুখে ভোটাররা কাকে বেছে নেবেন—সেই উত্তরই দেবে ব্যালট।
প্রবীণদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দাপট থাকলেও, নবীনদের পরিবর্তনের বার্তা ভোটের মাঠে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ভোটারেরা। নির্বাচনী মাঠে লালমনিরহাট তিনটি আসন এখন প্রবীণদের মর্যাদা রক্ষা আর নবীনদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাবনার লড়াই হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]