
বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগে পা দেয় ১৮৬২ সালে। কুষ্টিয়ার জগতি এলাকায় দেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করে ব্রিটিশ সরকার। যা পরবর্তীতে জগতি স্টেশন নামে পরিচয় লাভ করে। সে সময় কলকাতার রাণাঘাট থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ চালু হয়। তবে বর্তমানে কতৃপক্ষের উদাসীনতা আর অবহেলায় ঐতিহ্য হারাতে বসেছে কালের স্বাক্ষী জগতি স্টেশনটি।
তৎকালিন ব্রিটিশ সরকার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের পদ্মার মোহনায় জেলের জালে আটকা পরা ইলিশ মাছ কলকাতায় সহজে পরিবহন ও এই এলাকার ব্যবসা বানিজ্যের সমৃদ্ধি ঘটাতে ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি জগতি স্টেশন থেকে গোয়ালন্দ ঘাট অব্দি আরো ৭৫ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণসহ একের পর এক দেশজুড়ে রেলওয়ের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারন করে।
তবে কালের স্বাক্ষী আড়াই’শ বছর আগের এই জগতি স্টেশন দেশের প্রথম স্থাপিত স্টেশন হলেও বর্তমান স্টেশনটির অবস্থা খুবই নাজুক ও জরাজীর্ণ। সংস্কারের অভাবে দোতলা স্টেশন ভবনটি এখন ব্যবহার অনুপযোগী ও পরিত্যক্ত। আগের মতো আর নেই যাত্রীর উপস্তিতি, চারিদিকে শুধু নিরবতা।

সূত্র মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও পণ্য পরিবহনে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে জগতি রেলওয়ে স্টেশনটির গুরুত্ব ছিলো। কালের বিবর্তনে রুপ-সৌন্দর্য ও জৌলুস হারাতে বসেছে ঐতিহ্যমণ্ডিত এই স্টেশনটি। দোতলা স্টেশন ভবনটিতে ধরেছে ফাটল। দীর্ঘদিন মানুষের পদচারণা না থাকায় ভবনটির ছাদে জন্মেছে প্রচুর আগাছা, প্লাটফর্মের ইট ও গাঁথুনি ক্ষয়ে গেছে। বিলীন হয়েছে প্লাটফর্মের অদূরেই তৎকালে নির্মিত বিশাল আয়তনের ওভারহেড পানির ট্যাংকটি।
কাগজে-কলমে স্টেশনটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কেননা স্টেশন মাস্টারসহ প্রয়োজনীয় লোকবল পদায়ন নেই দীর্ঘকাল। ফলে গেট কিপার ও পয়েসম্যানসহ মাত্র দু’জন কর্মচারীই স্টেশনটি রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভাল করেন। এ স্টেশনে নিরাপত্তাকর্মী আরো ১০-১২টি পদ রয়েছে শূন্য।
জগতি স্টেশনের উপর দিয়ে, খুলনা-গোয়ালন্দ ঘাট, রাজশাহী-গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ী-পোড়াদহ জংশন রুটি প্রতিদিন ৮-১০টি ট্রেন চলাচল করলেও এখানে মাত্র ২ টি ট্রেন থামে। যাত্রীরা শুধুমাত্র নকশী কাঁথা মেইল ও স্যাটল ট্রেনে এই স্টেশন থেকে উঠা নামা করার সুযোগ পায়। যদিও স্টেশনে ওয়েটিং রুম, ওয়াশ রুমসহ যাত্র সেবার বালাই নেই। পর্যাপ্ত বাতি ও নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় রাতের বেলায় স্টেশনে নেমে আসে ভুতুড়ে অন্ধকার ও নিস্তবতা। ফলে স্টেশনটির জীর্ণদশা ও দুরবস্থায় যাত্রীদেরও পোহাতে হয় দুর্ভোগ।
এলাকাবাসী জানান, স্টেশনটি ২৪ ঘণ্টাই তালাবদ্ধ থাকায় যাত্রীদের প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তবে স্টেশনের গেটম্যান আব্দুর রাজ্জাক ট্রেন আসার আগে রেলগেট টি বন্ধ করে দেয়, আবার ট্রেন টি স্টেশন অতিক্রম করলে গেট খুলে দেয় এটাই এই স্টেশনে দৃশ্যমান। এক সময় এই জগতি স্টেশন থেকেই ভারতের কোলকাতায় যাতায়াত ও বাণিজ্যিকভাবে পণ্য আমদানি-রফতানি করা হতো। কিন্তু এখন তা শুধুই স্মৃতি। দেশের প্রথম এই রেলওয়ে স্টেশনটির প্রতি কর্তৃপক্ষের অযত্ন-উদাসীনতায় রেলওয়ে বিভাগ অতীত ঐতিহ্য ও গৌরব হারাচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র নিলয় বলেন, ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করা আমাদের দায়িত্ব। পাশাপাশি দেশের প্রথম স্টেশন হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে জগতি রেলওয়ে স্টেশনটিকে টিকিয়ে রেখে আধুনিক মডেল স্টেশনে রূপান্তরিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
এ বিষয়ে রেলওয়ে বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলীয় পাকশী কার্যালয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী বিরবল মন্ডল জানান, ঐতিহ্যমণ্ডিত জগতি রেলওয়ে স্টেশনটি সংস্কার ও সংরক্ষণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। স্টেশনটি সংরক্ষণে রেলওয়ে বিভাগ সজাগ ও যত্নবান রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিবার্তা/মিঠুন/এমও
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]