
রাগ মানুষের স্বাভাবিক একটি অনুভূতি। জীবনের নানা পরিস্থিতিতে আমরা রেগে যাই, কষ্ট পাই, কখনো অভিমানও করি। কিন্তু সেই রাগের মুহূর্তে আমরা কীভাবে নিজেকে সামলাই, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুহূর্তের উত্তেজনায় বলা একটি কথা যেমন প্রিয় মানুষকে কষ্ট দিতে পারে, তেমনি নষ্ট করে দিতে পারে দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্ক। একটু ধৈর্য, কিছুটা নীরবতা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারে।
আমরা যাঁর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য কামনা করি, সেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ আমাদের রাগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ও ক্ষমার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের নানা ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি-কষ্ট বা অপমানের মুহূর্তেও কীভাবে নিজেকে সংযত রাখা যায়।
তায়েফের ঘটনা ও ক্ষমার শিক্ষা
ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তায়েফে গিয়ে রাসুলুল্লাহ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁকে পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। অসহ্য কষ্টের সেই সময়েও তিনি প্রতিশোধের কথা ভাবেননি।
পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা এসে তাঁকে বলেছিলেন, চাইলে দুই পাহাড় এক করে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ তা চাননি। বরং আশা করেছিলেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এমন মানুষ আসবে, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে। (সহিহ বুখারি: ৩২৩১)
তায়েফের এই ঘটনা আমাদের শেখায়, কষ্ট পেলেও প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা ও ধৈর্যের পথ বেছে নেওয়া যায়।
রাগের সময় নীরব থাকা
রাগের সময় আমরা অনেকেই বেশি কথা বলে ফেলি। নিজের অবস্থান বোঝাতে গিয়ে এমন কিছু বলে ফেলি, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “যখন তোমাদের কারো রাগ আসে, সে যেন চুপ থাকে।” (মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৬)
রাগের সময় কিছুক্ষণ নীরব থাকা দুর্বলতা নয়। বরং এটি নিজেকে সামলে নেওয়ার একটি সুযোগ। কয়েক মিনিটের নীরবতা অনেক সময় একটি সম্পর্ককে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
তাই রাগের মুহূর্তে কথা বলার আগে একটু থেমে যাওয়া জরুরি। যে কথাটি তখন খুব প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে, কিছুক্ষণ পর হয়তো সেটিই আর প্রয়োজনীয় মনে হবে না।
অবস্থান পরিবর্তনের শিক্ষা
রাগ নিয়ন্ত্রণের আরেকটি উপায়ও শিখিয়েছেন রাসুলুল্লাহ। তিনি বলেছেন, “তোমাদের কারো যখন রাগ হবে, সে যদি দাঁড়িয়ে থাকে তবে যেন বসে পড়ে; এতে যদি রাগ দূর হয় তো ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮২)
অর্থাৎ রাগের সময় নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে কিছুটা সময় নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সেই স্থান থেকে সরে যাওয়া বা কিছুক্ষণ একা থাকাও পরিস্থিতি শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
ওজুর শীতল পরশ
রাগের সময় নিজেকে শান্ত করার আরেকটি উপায়ের কথাও এসেছে হাদিসে। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে, আর শয়তানকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। আগুন নেভানো হয় পানি দিয়ে; সুতরাং তোমাদের কারো যখন রাগ আসে, সে যেন অজু করে নেয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
তাই রাগের মুহূর্তে কিছুক্ষণ থেমে অজু করা, নামাজ পড়া কিংবা নীরবে থাকা যেতে পারে। এতে নিজেকে শান্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রকৃত শক্তিশালী কে?
আমরা অনেক সময় শক্তিশালী বলতে এমন কাউকে বুঝি, যে অন্যকে পরাজিত করতে পারে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ শক্তির ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সে প্রকৃত শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে অন্যকে আছাড় মারে; বরং আসল শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।” (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
অর্থাৎ অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই প্রকৃত শক্তি।
জীবনে রাগ আসবেই। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা সামাজিক জীবনে নানা কারণে আমরা কষ্ট পেতে পারি। কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখানো জরুরি নয়। কখন থামতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে এবং কখন ক্ষমা করে দিতে হবে-এটিই পরিপক্বতার পরিচয়।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]