ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনের আমল ও করণীয়
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১
ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনের আমল ও করণীয়
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অঅ-অ+

আজ বুধবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এটি মানব জাতির শিরোমণি মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) এর জন্ম ও ওফাতের দিন ১২ রবিউল আউয়াল।


মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মরণে দিনটি বাংলাদেশে ধর্মীয় মর্যাদায় পালিত হয়। দিনটি সামনে রেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে-ঈদে মিলাদুন্নবীতে কী আমল করা উচিত? এ দিনের জন্য বিশেষ কোনো নামাজ, রোজা বা দোয়া কি রয়েছে?


কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।


১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ, বিশেষ রোজা, নির্দিষ্ট দোয়া কিংবা নির্দিষ্ট সংখ্যায় কোনো জিকির বা দরুদ পাঠের নির্দেশ কোথাও পাওয়া যায় না।তবে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর অনুসরণ, তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ এবং কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, দান-সদকার মতো নেক আমল ইসলামে সব সময়ই উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই এ দিনেও এসব আমল করা যেতে পারে।
মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ


মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করা।


পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছেন।


আবার সূরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের সঙ্গে আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।


অর্থাৎ শুধু একটি দিনে তাঁকে স্মরণ করাই নয়, তাঁর সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য নিজের জীবনে অনুসরণ করাই নবীপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।


দরুদ ও সালাম পাঠ


মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ সরাসরি কোরআনে রয়েছে।
সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন।


দরুদ পাঠের ফজিলত সম্পর্কেও সহিহ হাদিস রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি ১০ বার রহমত নাজিল করেন। তাই ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা যেতে পারে। তবে এ দিনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়নি।


মহানবী (সা.)-এর সিরাত জানা


রবিউল আউয়াল মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে জানার একটি উপলক্ষ হতে পারে। তাঁর জীবনী বা সিরাত পাঠ, পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের তাঁর জীবন সম্পর্কে জানানো এবং তাঁর শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা উপকারী হতে পারে।
মহানবী (সা.) পরিবার, প্রতিবেশী, দরিদ্র, অসহায়, নারী, শিশু ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন-এসব জানা এবং বাস্তব জীবনে অনুসরণের চেষ্টা করাই তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে অর্থবহ করে।
বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবীর জাতীয় কর্মসূচিতেও মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্ম, শান্তি, সৌহার্দ্য, সহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনার আয়োজন রাখা হয়েছে।


কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়া


কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, ইস্তিগফার ও দোয়া ইসলামে সব সময়ের নেক আমল। তাই এ দিনেও এসব করা যায়।
নিজের ও পরিবারের জন্য হেদায়াত, ক্ষমা ও কল্যাণ চাওয়া যায়। দেশ, জাতি এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্যও দোয়া করা যেতে পারে।


তবে ‘ঈদে মিলাদুন্নবীর বিশেষ দোয়া’ নামে কোরআন বা সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। তাই কোনো দোয়াকে শুধু ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য অবশ্যপাঠ্য মনে করার আগে তার নির্ভরযোগ্য সূত্র আছে কি না, তা যাচাই করা উচিত।


দান-সদকা ও অসহায়দের সাহায্য
দান-সদকা করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ নেক কাজ।
মিসরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া প্রতিষ্ঠান দারুল ইফতা মহানবী (সা.)-এর জন্মস্মরণ প্রসঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও মানুষকে খাবার দেওয়ার মতো নেক কাজকে বৈধ উপায়ে স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে এসব কাজ শুধু ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য নির্ধারিত নয়। একজন মুসলমান যেকোনো দিনই এসব নেক আমল করতে পারেন।


১২ রবিউল আউয়ালে বিশেষ রোজা কি আছে?
এ বিষয়ে সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস প্রায়ই আলোচনায় আসে।
আবু কাতাদা আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.)-কে সোমবার রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি জানান, ওই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ওই দিনই তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। হাদিসটির বিষয় সোমবারের রোজা। তাই এ হাদিসের ভিত্তিতে প্রতিবছর ১২ রবিউল আউয়ালে বিশেষভাবে রোজা রাখা সুন্নত-এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।


এ বছর বাংলাদেশে ১২ রবিউল আউয়াল পালিত হবে বুধবার, ২৬ আগস্ট। ফলে সোমবারের রোজা সম্পর্কিত হাদিসকে বুধবারের ১২ রবিউল আউয়ালের জন্য বিশেষ রোজার নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।


কেউ সাধারণ নফল রোজা রাখতে চাইলে ইসলামে অনুমোদিত নিয়মে তা রাখতে পারেন, কিন্তু সেটিকে ১২ রবিউল আউয়ালের বিশেষভাবে নির্ধারিত রোজা বলা উচিত নয়।


উদ্‌যাপনের ধরন নিয়ে আলেমদের মতভেদ


ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আলাদা অনুষ্ঠান বা বার্ষিক ধর্মীয় আয়োজন করার বিধান নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।


মিসরের ইসলামী শরীয়তের আলোকে ফতোয়া বা ধর্মীয় বিধান ও আইনি মতামত প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান দারুল ইফতার মতে, শরিয়তবিরোধী কাজ থেকে বিরত থেকে মহানবী (সা.)-এর জীবন আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া, দরিদ্র মানুষকে খাবার দেওয়া এবং মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁর জন্মস্মৃতি উদ্‌যাপন করা বৈধ।


অন্যদিকে সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ ইবন বাযসহ একদল আলেমের মতে, মহানবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামের প্রথম যুগে ১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে বার্ষিক ধর্মীয় উৎসব পালনের নজির না থাকায় এ ধরনের পৃথক ধর্মীয় উদ্‌যাপন করা উচিত নয়।


এই মতভেদের বাইরে কোরআনের দুটি স্পষ্ট নির্দেশ নিয়ে দ্বিধা নেই-মহানবী (সা.)-কে অনুসরণ করা ও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা।


তাহলে এ দিনে কী করবেন


ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনে একজন মুসলমান নিয়মিত ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করতে পারেন। কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়া করতে পারেন। মহানবী (সা.)-এর সিরাত পাঠ করতে পারেন এবং পরিবারের সদস্যদের তাঁর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে জানাতে পারেন।
অসহায় মানুষকে সাহায্য, দান-সদকা ও খাবার দেওয়ার মতো নেক কাজও করা যেতে পারে।


তবে কোনো বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট দোয়া, নির্দিষ্ট সংখ্যায় জিকির কিংবা ১২ রবিউল আউয়ালের বিশেষ রোজাকে ফরজ, ওয়াজিব বা বিশেষভাবে নির্ধারিত সুন্নত হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়, যদি তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল না থাকে।


মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার মূল শিক্ষা একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন তাঁকে মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাঁর শিক্ষা ও চরিত্র দৈনন্দিন জীবনে অনুসরণের মধ্য দিয়েই সেই ভালোবাসার সবচেয়ে অর্থবহ প্রকাশ ঘটতে পারে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com