কঠিন বিপদ থেকে মুক্তির ৩ আমল ও দোয়া
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৮
কঠিন বিপদ থেকে মুক্তির ৩ আমল ও দোয়া
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অঅ-অ+

বিপদ-আপদ কখন আসবে কেউ জানে না। তবে বিপদের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি মহান রবের কাছে সাহায্য চাওয়া প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণের ক্ষেত্রে বিপদের প্রথম মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে যারা ধৈর্য ধারণ করতে পারেন, প্রকৃতপক্ষে তারাই সফলকাম হতে পারেন।


আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- প্রকৃত ধৈর্যধারণ করা হলো বিপদ-আপদের প্রথম মুহূর্তে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২০১১)


এ জন্য যেকোনো বিপদ-আপদ কিংবা দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি অথবা কোনোকিছু চেয়ে বরাবরই মুমিনরা মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দুহাত তুলে ধরেন।


মহান আল্লাহ তাআলাও খোদ ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। যখন কোনো বান্দা তার নিকট দুই হাত তুলে প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেন না।


পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই। সুতরাং, তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় ও ঈমান আনয়ন করে। আশা করা যায়, তারা সফলকাম হবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৬)।


এ ক্ষেত্রে কঠিন বিপদে কিংবা একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বেশকিছু আমল রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে মহান রবের কাছে সাহায্য চেয়ে দোয়া করা যায়। নিচে এমন তিনটি আমলের কথা ‍তুলে ধরা হলো যার মাধ্যমে কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি চেয়ে দোয়া করতে পারেন।


দোয়া ইউনুস পাঠ


দোয়া ইউনূস মূলত পবিত্র কোরআনের ২১তম সুরার একটি আয়াতের অংশ।


১১২ আয়াতবিশিষ্ট এই সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। যেখানে নবীদের ওপর মহান আল্লাহর পরীক্ষা এবং ধৈর্যধারণের বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। এরমধ্যে অন্যতম হলো হযরত ইউনুস (আ.) এর ৪০ দিন মাছের পেটে থাকা ও বিশেষ একটি দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। মূলত, এই দোয়াটিই দোয়া ইউনূস হিসেবে পরিচিত।
আরবিতে দোয়া ইউনুস


لَّآ إِلَـٰهَ إِلَّآ أَنتَ سُبْحَـٰنَكَ إِنِّى كُنتُ مِنَ ٱلظَّـٰلِمِي


বাংলা : লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন। অর্থ : হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র ও মহান, আমি তো সীমালঙ্ঘনকারী।


মাছের পেটে থাকাবস্থায় দোয়ার মাধ্যমে যেভাবে হযরত ইউনুস (আ.) রক্ষা পেয়েছেন, ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলা দোয়াটির কথা উল্লেখ করে মুমিনদের রক্ষার কথা বলেছেন।


পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর স্মরণ করো জুননুন (ইউনুস আ.) এর কথা, যখন তিনি ক্রোধভরে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করবো না; অতঃপর সে অন্ধকার থেকে (মাছের পেট থেকে) আহ্বান করেছিল- আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ (উপাস্য) নেই; আপনি পবিত্র, মহান; আমিতো সীমালংঘনকারী। অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭-৮৮)


অন্যদিকে হাদিসেও এই দোয়ার ফজিলতের কথা এসেছে। হযরত সা’দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- জুননুন (মাছ ওয়ালা) ইউনুস (আ.) মাছের পেটে দোয়া করেছিলেন- ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন’। কোনো মুসলিম যখনই এই দোয়া করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দোয়া কবুল করে থাকেন। (মেশকাত, হাদিস : ২২৯২; সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)


বেশি বেশি ইস্তিগফার


ইস্তিগফার অর্থ মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়ার পরও দিনে ৭০ বারের বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি- আল্লাহর কসম! আমি প্রত্যহ (প্রতিদিন) আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করে থাকি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮৬৮)


রাসুল (সা.) এর সাহাবা আগার আল মুযানী (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আমার অন্তরে কখনো কখনো অলসতা দেখা দেয়, তাই আমি দৈনিক ১০০ বার আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৭৫১)


অন্যদিকে ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার ফলে যেমন গুনাহ মাফ হয়, তেমনি এটি দুশ্চিন্তা দূর করে, রিজিক বৃদ্ধি করে এবং অন্তরকে প্রশান্ত করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা চাও, আর অনুশোচনাভরে তার দিকেই ফিরে এসো, তাহলে তিনি একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবনসামগ্রী ভোগ করতে দেবেন, আর অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তিনি তার অনুগ্রহ দানে ধন্য করবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তোমাদের উপর বড় এক কঠিন দিনের আযাবের আশঙ্কা করছি।’ (সুরা হূদ, আয়াত : ৩)


এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ছোট ইস্তিগফার হলো- أَسْتَغْفِرُ اللهَ (বাংলা : আস্তাগফিরুল্লাহ)। যার অর্থ- ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।’ এছাড়াও আরও অনেক ইস্তিগফার রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। তবে সবচেয়ে উত্তম ইস্তিগফার হলো সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার। আরবিতে সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার-


اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ


বাংলা : আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানি ওয়া আনা আ’বদুকা ওয়া আনা আ’লা আহ্‌দিকা ওয়া ও’য়াদিকা মাসতাত’তু আ’উযুবিকা মিন শার্‌রি মা ছা’নাতু আবূউলাকা বিনি’মাতিকা আ’লাইয়্যা ওয়া আবূউলাকা বিযানবী ফাগ্‌ফির্‌লী ফাইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুয্‌যুনূবা ইল্লা আনতা।


অর্থ : হে আল্লাহ তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নিয়ামত দিয়েছো তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। কারণ তুমি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।


হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি দিনের (সকাল) বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এ ইস্তিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যদি সে মারা যায়, তবে সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতের (প্রথম) বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এ দোয়া পড়ে নেবে, আর যদি ভোর হওয়ার আগেই সে মারা যায় তবে সে জান্নাতি হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮৬৭)


নবীজির ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ


কঠিন বিপদে বা দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নবীজির (সা.) এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন। কারণ, নবীর ওপর দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতের। এর সাধারণ প্রতিদান হিসেবে একবার দরুদ পাঠ করলে ১০টি রহমত ছাড়াও ১০টি পাপ মাফ ও জান্নাতে ১০ স্তরের মর্যাদার কথা এসেছে। এছাড়াও দরুদ পাঠের আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে।


অন্যদিকে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ (ঊর্ধ্বজগতে ফেরেশতাদের মধ্যে) নবীর প্রশংসা করেন এবং ফেরেশতারা নবীর (সা.) জন্য দোয়া করে। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করো এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও। (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৬)


এ ক্ষেত্রে বান্দা যখন নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করে, এর মাধ্যমে মূলত আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়, যেন মহান রব রাসুল (সা.) এর ওপর রহমত করেন। আর দোয়া একটি ইবাদত। নু’মান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, ‘দোয়া হলো ইবাদত। তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, ‘তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি কবুল করব’ (সুরা গাফির, আয়াত : ৬০)।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৬৯)। সুতরাং, কেউ বারবার দরুদ পড়লে প্রকারান্তরে এর মধ্যদিয়ে সে মূলত ইবাদতের মধ্যেই থাকবে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com