রাজনীতিতে সমতা ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন চান নারী নেত্রীরা
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০১
রাজনীতিতে সমতা ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন চান নারী নেত্রীরা
আঙ্গুর নাহার মন্টি, মানিকগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রিন্ট অঅ-অ+

জাতীয় সংসদে নারী-পুরুষের ৫০ শতাংশ সমতা বা ‘প্যারিটি’ এবং স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে সাধারণ আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন নারী নেত্রী ও অধিকারকর্মীরা।


মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুই দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে বক্তারা এসব কথা বলেন।


তারা বলেছেন, মিছিল-আন্দোলন বা গণমাধ্যমে নারীর দৃশ্যমানতা বাড়লেই রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। প্রার্থী মনোনয়ন, নেতৃত্ব নির্বাচন ও নীতিনির্ধারণের জায়গায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প ও নারীবাদী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।


ইউএন উইমেন ও নরওয়ে দূতাবাসের সহযোগিতায় ‘জনজীবনে নারীর নেতৃত্ব বিকাশ’ প্রকল্পের আওতায় নারীপক্ষ এ জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেছে। উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং।


জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনে তরুণ নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে গীতাঞ্জলি সিং বলেন, পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অনেককে দেখা যায়নি। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে এখন শুধু ৩০ শতাংশ কোটা নয়, সংসদে নারী-পুরুষের ৫০ শতাংশ সমান অংশীদারিত্ব অর্জনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নারী নেতৃত্ব বিকাশে আন্তদলীয় ও আন্তপ্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সংসদে নারী সদস্যদের নিয়ে একটি ‘ইন্টার-পার্টি ককাস’ এবং সংসদের বাইরের নারী নেত্রীদের যুক্ত করে বৃহত্তর একটি নেটওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাব দেন গীতাঞ্জলি সিং।


নারীপক্ষের সভানেত্রী কে. এ. জাহান রুমি বলেন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে তরুণ নারীর কণ্ঠ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।



নারীপক্ষের সদস্য মাহিন সুলতান বলেন, ‘নারী অধিকারই রাজনৈতিক অধিকার।’ তাঁর মতে, রাজনীতি শুধু দলীয় কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়; জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব রয়েছে। তাই রাজপথে নারীর উপস্থিতি বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাদের অনুপস্থিতি দূর করতে হবে। প্রচলিত নেতৃত্বের পাশাপাশি বিকল্প ও নারীবাদী নেতৃত্বের চর্চার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।


মূল অধিবেশনে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নারীদের এখনও দ্বিতীয় সারির রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অভিজ্ঞতা না থাকার অজুহাত নারীর ক্ষেত্রে কেন প্রযোজ্য হবে, যখন অভিজ্ঞতা ছাড়াই পুরুষদের রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করে দেওয়া হয়?


১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪-এর আন্দোলনে নারীদের সামনের সারির ভূমিকার কথা তুলে ধরে নিলোফার বলেন, নারীরা প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বজনপ্রীতি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করা নারী কর্মীদের মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রভাবশালী নেতাদের স্বজনদের মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতারও সমালোচনা করেন তিনি।


সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি বলেন, মিছিলের সামনে থাকা বা আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যেতে চাওয়াকে এখনও সহজভাবে দেখা হয় না। তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে বসা কোনো নারীর জন্য বিশেষ লক্ষ্য নয়; এটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সমাজে নারীকেই বারবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।


নারীদের রাজনৈতিকভাবে টেকসই ভূমিকা রাখতে শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপরও গুরুত্ব দেন নুসরাত। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টি ও নিজের যত্ন নেওয়াকেও রাজনৈতিক সক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।


নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক তাপসী দে প্রাপ্তি বলেন, বয়স ও লিঙ্গ—দুই দিক থেকেই তরুণ নারীরা অবমূল্যায়নের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। নারীর জন্য কেউ আলাদা করে জায়গা তৈরি করে দেবে—এমন অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের জায়গা নিজেদেরই তৈরি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শ্রমিক নেত্রী জলি তালুকদার বলেন, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই হাজারের বেশি প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন এবং নির্বাচিত হন সাতজন। তৈরি পোশাক ও চা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা বড় শ্রমশক্তি হলেও শীর্ষ ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


সাংস্কৃতিক কর্মী বীথি ঘোষ বলেন, রাজপথ ও গণপরিবহণে নিরাপত্তাহীনতা এবং অনলাইনে ট্রলিংয়ের ভয়ে নারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ তৈরি হচ্ছে। রাজপথে নারীরা কতটা নিরাপদ, তার ওপরই রাষ্ট্র ও সমাজের প্রকৃত নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহারের সঞ্চালনায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রান্তিক নারীরা স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত নারী আসনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাদের ভাষ্য, তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে সাধারণ আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার দাবি জানান তারা।


আন্তঃবিভাগীয় অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহীর তৃণমূল অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ১৮ জন তরুণ নারী। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথাগত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও বর্তমানে প্রায় ২১ জন নারী হেডম্যান এবং ৬০০-এর বেশি নারী কারবারি নেতৃত্বে রয়েছেন বলে জানান লেখক ও মানবাধিকারকর্মী এলিরা দেওয়ান ও স্থানীয় তরুণীরা।


রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সাঁওতাল নারীদের যত্নের কাজ, শ্রম ও পানির সংকটের অভিজ্ঞতা আলোচনায় আসে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার তরুণীরা নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, সামাজিক উদ্যোগ ও ডিজিটাল স্টোরিটেলিংসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সংস্কৃতি অঙ্গনে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি এবং চলাচলের নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।


নারী নেতৃত্ব বিকাশে নিরাপদ সড়ক, জনপরিসর ও ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান অংশগ্রহণকারীরা।


বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম নারী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে ১৯৭০-এর দশকে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, সংগঠনের বিস্তৃত সদস্যভিত্তি এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।


ইউএন উইমেনের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তপতী সাহা বলেন, নারীবাদী আন্দোলন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নয়; পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও পারস্পরিক সংহতি।


নারীপক্ষের সদস্য সামিয়া আফরীন বলেন, নারী অধিকারের লড়াই কোনো স্বল্পমেয়াদি বিষয় নয়। বছরের পর বছর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তরুণদের হতাশ না হয়ে বড় স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্ষীয়ান নেত্রীরা তাদের পাশে আছেন; তাই দ্বিধা বা ভয় না পেয়ে যৌথভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।


নারীপক্ষের সদস্য ওয়ারদা আশরাফ ও সাদাফ সায সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় জাতীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের প্রথম দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকার শতাধিক তরুণ নারী নেত্রী, রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক নেত্রী ও নারী অধিকারকর্মী এতে অংশ নেন।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com