পান্থপথে ‘হোটেলে’ জঙ্গি হামলার ৮ বছর পর সব আসামি খালাস
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৪
পান্থপথে ‘হোটেলে’ জঙ্গি হামলার ৮ বছর পর সব আসামি খালাস
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন জাতীয় শোক দিবসের (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের শাহাদাতবার্ষিকী) দিনে রাজধানীর পান্থপথে ‘হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল’-এ আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সম্প্রতি সব আসামি খালাস পেয়েছেন। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গত ৫ জানুয়ারি এ রায় ঘোষণা করে।


সম্প্রতি প্রকাশিত এ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আইনগতভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে।


ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিবরণ:পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হামলাকারীরা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল। দেশব্যাপী শোক পালনের দিনে রাজধানীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জোরদারের মধ্যেই ঘটনাটি ঘটে।


গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ১৫ আগস্ট রাতে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল ঘেরাও করে। হোটেলের ৩০১ নম্বর কক্ষে অবস্থানকারী যুবককে বারবার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও সে সাড়া দেয়নি। ভেতর থেকে বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দিতে থাকে। ১৬ আগস্ট সকাল ৯টা ৪২ মিনিটে সোয়াট সদস্যরা চূড়ান্ত অভিযান শুরু করলে সাইফুল ইসলাম (জঙ্গি অভিযুক্ত) নিজের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় হোটেলের দেয়াল ও রেলিং ধসে রাস্তায় পড়ে।


মামলা ও তদন্ত প্রতিবেদন :হামলার ঘটনায় ১৬ আগস্ট কলাবাগান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করেন মহানগর পুলিশের উপ-পরিদকর্শক (এসআই) সৈয়দ ইমরুল সাহেদ। মামলার তদন্তভার প্রথমে এসআই প্রদীপ কুমার সরকারের ওপর এবং পরবর্তীতে পুলিশ পরিদর্শক রাজু আহম্মেদের ওপর অর্পিত হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে দুই বছর পর ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর ১১ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।


আসামিদের পরিচয় ও জবানবন্দি :মামলাটিতে মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মূল হামলাকারী সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বাকি অভিযুক্তদের মধ্যে আকরাম হোসেন খান নিলয়কে হামলার পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নিলয়ের আত্মীয় ও সহযোগী হিসেবে মামলায় অভিযুক্ত হন আবু তুরাব খান ও সাদিয়া হোসনা লাকী।


এছাড়া আবু তুরাব খানের মেয়ে তাজরিন খানম শুভকেও এই মামলার আসামি করা হয়। অন্যদিকে, তানভীর ইয়াসিন করিমকে নব্য জেএমবির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। যা সেসময় মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে উঠে আসে।


মামলার অন্য অভিযুক্তরা হলেন—নাজমুল হাসান মামুন, আবুল কাশেম ফকির ওরফে আবু মুসাব, আব্দুল্লাহ আইচান কবিরাজ ওরফে রফিক, লুলু সরদার ওরফে সহিদ মিস্ত্রি, তারেক মোহাম্মদ ওরফে আদনান এবং আব্দুল্লাহ।


তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তদের মধ্যে ৯ জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। যা মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।


তদন্তে প্রাপ্ত আলামত ও ফরেনসিক রিপোর্ট :নথি অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৪৬টি গুলির খোসা, ৯৯৫টি লোহার স্প্লিন্টার, বিস্ফোরিত বোমার অংশ এবং চারটি মোবাইল ফোন জব্দ করে।


পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক পরীক্ষায় সাইফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে জঙ্গি কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট অডিও এবং ভিডিও ফাইল পাওয়া যায়। এছাড়া আসামি নাজমুল হাসান মামুনের মোবাইলে অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের ছবি ও ভিডিও পাওয়া গিয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়।


রায়ের প্রেক্ষাপট :সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষ মোট ৬৫ জন সাক্ষীর নাম দিলেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তারা আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। ফলে গত ৫ জানুয়ারি ঘোষিত রায়ে আদালত সব আসামিকে খালাস দেন।


এ বিষয়ে জানতে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখান এবং রায়ের বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।


যা বলছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী :শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে আসামিপক্ষের আইনজীবী সুব্রত দেবনাথ বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে—এটি সঠিক এবং বিষয়টি সবার জানা। তবে এ ঘটনায় আসামিদের সম্পৃক্ততা নেই। বিষয়টি আদালত আমলে নিয়ে মনে করছে, গত আট বছর আগের এই মামলায় প্রসিকিউশন আর সাক্ষী উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে না। তারা সাক্ষী হাজির করতেও ব্যর্থ হয়েছে।


তিনি বলেন, আদালত আরেকটি বিষয় আমলে নিয়েছে, আসামি তানভীর ইয়াসিন করিমকে নব্য জেএমবির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে যে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক নয়। তানভীর জাতীয় গুম কমিশনে আবেদন করেছিলেন এবং কমিশন বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। আদালত এ বিষয়টিও আমলে নেয়।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com