
হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ইরানের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে 'শক্তিশালী' হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মঙ্গলবার (৬ জুলাই) রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক নাবিকদের পরিচালিত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ‘মূল্য চুকাতেই' এই অভিযান শুরু হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে বিবিসি লিখেছে, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং সিরিক অঞ্চলে এই মার্কিন হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা গত মাসে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। তেহরান এর জবাবে ‘চূড়ান্ত পদক্ষেপ’ নেবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞায় দেওয়া সাময়িক ছাড় প্রত্যাহার করে নেয়। ওই ছাড়ের ফলে ইরান সীমিত পরিসরে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেয়েছিল। এটি গত মাসে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের অংশ ছিল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তকে ‘সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘অসৎ উদ্দেশ্য, অসঙ্গতি ও অবিশ্বস্ততা’ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তেহরান তাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় যে কোনো পদক্ষেপ নেবে বলেও সতর্ক করেছে ইরান।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনায় কাতার ও সৌদি আরবও ইরানকে দায়ী করেছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, ‘আল-রেকাইয়াত’ নামের একটি কাতারি জাহাজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় হামলা চালানো হয় এবং তার দাবি, এর জন্য ইরান দায়ী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানকে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো সমস্ত কাজ’ অবিলম্বে বন্ধ করার এবং ‘সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য’ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে বিপদে না ফেলার আহ্বান জানান।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদা পোস্টে বলেছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় ‘ওয়াদিয়ান’ নামের একটি সৌদি জাহাজে হামলা করেছে ইরান।
রিয়াদ এ ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর হামলা’ বলে বর্ণনা করেছে।
তবে কাতারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ ‘সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের নীতির পরিপন্থি’।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাঘাই বলেন, যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে চলাচল করে, কিংবা জাহাজের ট্র্যাকিং সিস্টেমে কারচুপি করে, সেগুলো ‘সংঘর্ষের ঝুঁকি’ তৈরি করে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ইরানি প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সোমবার প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ট্যাংকারের ইঞ্জিন রুমে ‘অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে’ আগুন ধরে যায়।
সংস্থাটি আরও জানায়, মঙ্গলবার আরও দুটি ঘটনা ঘটে; একটি ট্যাংকারে আঘাত লাগার পরও সেটি পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং অন্য একটি ট্যাংকারে আঘাতের পর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।
চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। পাশাপাশি দেশটির ‘পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল, যদিও এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
চুক্তিতে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী দেশ ইরান ও ওমান উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই জলপথের ভবিষ্যৎ পরিচালন ও সামুদ্রিক পরিষেবা করবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়।
যুদ্ধ চলাকালে ইরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করে, যার মাধ্যমে প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের অনুমতিপত্র (সেইফ প্যাসেজ পারমিট) দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছিল, নতুন সমঝোতা অনুযায়ী ভবিষ্যতে ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা দেখবে ইরান। এ ব্যবস্থার আওতায় প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে সেবা ফিও নেওয়া হতে পারে।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]