
যশোরে শীতের প্রকোপ দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। গত কয়েকদিন ধরে জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু শৈত্যপ্রবাহ ও হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
তীব্র শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলাজুড়ে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগের প্রকোপ। সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। এতে চাপ বাড়ছে চিকিৎসাসেবায়।
চিকিৎসকদের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ২৯০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে শতাধিক রোগী ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে ৫৪ জনই শিশু।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরেই যশোরের তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। দিনের বেশিরভাগ সময় সূর্যের দেখা মিলছে না। সেইসঙ্গে যুক্ত হওয়া উত্তরের ঠান্ডা বাতাস শীতের তীব্রতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় জেলাজুড়ে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর মা মিতা বেগম বলেন, আমার ছেলের বয়স ৫ মাস। গত কয়েকদিনের তীব্র শীতের কারণে ছেলের সর্দি ও জ্বর হয়েছে। চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি সে। ছেলেটা এখন কিছুটা সুস্থ।
আসমা নামে অপর এক শিশুর মা বলেন, শীতের কারণে ঠান্ডা লেগে আমার ছেলের নিউমোনিয়া হয়েছে। তিনদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ১০ জনের মৃত্য হয়েছে। এদের বয়স ৫৫ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে।
মৃত মুন্সি মহিউদ্দিনের ছেলে শামছুজ্জামান বলেন, ঠান্ডার কারণে আমার বাবার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ভোর ৬টার দিকে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
মৃত শেখ সদরুল আলমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আমার বাবার হার্টের সমস্যা ছিল। তবে গত কয়েকদিনের তীব্র শীতে তিনি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। গতকাল রাতে তাকে হাসাপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান তিনি বেঁচে নেই। তীব্র শীতের কারণেই তার বাবা মারা গেছেন বলে জানান তিনি।
মৃত মনিরা খাতুনের ছেলে শেখ মামুন বলেন, আমার মায়ের বয়স ৬৪ বছর। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তিনি গত ১০ দিন অসুস্থ ছিলেন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় গুরুতর অবস্থায় গতকাল রাতে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শেখ মামুনের বাড়ির অদূরে উম্মে হানি নামে ৬৫ বছর বয়সী একজন সাবেক শিক্ষিকা মারা গেছেন। তার ছেলে বনি জানান, তার মা এক সপ্তাহ ধরে ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি যশোর জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার ফুসফুস সংক্রমিত হওয়ায় মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁচ্ছাছিল না।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জোবায়ের আহমেদ বলেন, আমরা ইদানীং মৃত্যুর হার বেশি দেখছি। এক্ষেত্রে ঠান্ডার প্রকোপ বেশি থাকার কারণে মৃত্যুর সংখ্যাটা আরও ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। বয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর প্রবণতা বেশি। ফুসফুস সংক্রমণ ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে বয়স্কদের মধ্যেই মৃত্যুর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে ঠান্ডার ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা—সেটা ঘরে হোক বা বাইরে। বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা এবং ফুসফুস সংক্রমণজনিত কারণগুলো রোধ করার জন্য নিজেকে সতর্ক রাখা উচিত বলে পরামর্শ দেন এ চিকিৎসক।
বিবার্তা/এসএস
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]