বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সংহতি ও বিবৃতি
ঢাবির নারী শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ বৈষম্যের অবসান ঘটানো জরুরি
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৫১
ঢাবির নারী শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ বৈষম্যের অবসান ঘটানো জরুরি
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অঅ-অ+

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান বিতরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেও বাস্তব চর্চায় এখনো বিদ্যমান রয়েছে গভীর বৈষম্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নারী শিক্ষার্থীরা আজও নানা ধরনের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার জানিয়ে, অবরোধবাসিনীদের চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি ও স্পষ্ট বিবৃতি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।


রবিবার (৯ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনের পাঠানো সংহতি ও স্পষ্ট বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট নারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আবাসনসুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিয়মিত হল ফি প্রদান করা সত্ত্বেও অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের নিজ হলে প্রবেশের সুযোগ নেই—এমনকি বিরতি নেওয়া বা খাবার খাওয়ার প্রয়োজনেও নয়। আবাসিক শিক্ষার্থীদের মা-বোন কিংবা অন্য হলের নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশও নিষিদ্ধ, অথচ পুরুষ শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে এমন বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ নেই।


নিরাপত্তার অজুহাতে চালু থাকা ঔপনিবেশিক ‘সান্ধ্য আইন’—রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত—নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের চলাচল, শিক্ষা, সামাজিকতা ও নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করছে। মাঝরাতে দূরপাল্লার যাত্রা শেষে হলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি, প্রশাসনিক হেনস্তা ও চরিত্রহননের শিকার হওয়ার অভিযোগ প্রায় নিয়মিতই সামনে আসে।


ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাত ১০টার পর ছাত্রীদের হলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে প্রশাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করছে। কিন্তু ভোর ৬টা পর্যন্ত হলের বাইরে অবস্থানরত ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে পালন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


এই বৈষম্য শুধু আবাসন ও চলাচলের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। নারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদমাধ্যমে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে অবাধ অংশগ্রহণের সুযোগও বিভিন্নভাবে সংকুচিত হয়। ফলে দেশের মুক্তচিন্তার পাদপীঠ হিসেবে পরিচিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন তার নারী শিক্ষার্থীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, তখন এই বৈষম্যের অবসান ঘটানো জরুরি।


সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা নার্সিং কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ব্যবস্থাপনায় এমন দ্বৈতনীতি নেই। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আবাসিক নারী শিক্ষার্থীরা তাদের কাছের পরিবারের নারী সদস্য কিংবা বান্ধবীদের হলে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এমন মৌলিক সুযোগও সংকুচিত করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত না করে নারীর চলাচল সীমিত করা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে।


এইসব বৈষম্য ও দ্বৈতনীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ‘সময়ের শেকল ভাঙো’ আন্দোলনের মাধ্যমে তারা অন্যায়ভাবে সংকুচিত করে দেওয়া নিজেদের বিচরণক্ষেত্র পুনরুদ্ধার, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার এবং প্রশাসনের কাছ থেকে প্রাপ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।


অবরোধবাসিনীর এই চলমান আন্দোলনের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক সংহতি জানাচ্ছে। শেকল ভাঙার এই ন্যায্য লড়াইয়ে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের পাশে আছি। নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চলাচল, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমঅধিকারের দাবিকে আমরা ন্যায্য ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে বিবেচনা করি।


তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমাদের স্পষ্ট দাবি—


১. ছাত্রী হলের বৈষম্যমূলক ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিল করতে হবে এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দিতে হবে।


২. বৈধ বিশ্ববিদ্যালয় আইডি কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে সকল নারী শিক্ষার্থীকে যে-কোনো আবাসিক হলে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে এবং যথাযথ অনুমতি সাপেক্ষে রাতে অবস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।


৩. আবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের মা-বোনসহ নারী স্বজনদের হলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।


নারী শিক্ষার্থীদের চলাচলের স্বাধীনতা কোনো দয়া বা প্রশাসনিক অনুগ্রহ নয়—এটি তাদের অধিকার। নিরাপত্তার নামে বৈষম্য নয়, বরং বৈষম্যহীন ও নিরাপদ ক্যাম্পাসই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ।


শেকল ভাঙার এই ন্যায্য আন্দোলনে আমরা শিক্ষার্থীদের পাশে আছি।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com