
গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। জীবনের প্রথম বড় এই পাবলিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে যখন শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে মগ্ন থাকার কথা, তখন লালমনিরহাটের হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর সময় কাটছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে আর ভ্যাপসা গরমে। দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাবে সৃষ্ট তীব্র লোডশেডিং এবং বৈশাখের অসহ্য দাবদাহে সীমান্ত ঘেরা এই জেলার শিক্ষা খাত এক চরম অস্থিরতার মুখে পড়েছে।
লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার গ্রামীণ ও শহর এলাকাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না অনেক এলাকায়। শহরের তুলনায় গ্রামের দৃশ্য আরও করুণ। বিশেষ করে মাগরিবের আজানের পর যখন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। মোমবাতি বা চার্জার লাইটের মৃদু আলোতে দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করতে গিয়ে পরীক্ষার্থীদের চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনার শিক্ষার্থী হুমায়রা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘এবারে বিদ্যুতের লোডশেডিং সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পরীক্ষার চলাকালে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়তে পারিনা ঠিকমতো। টর্চ লাইট জ্বালিয়ে পড়তে হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়ার মনোযোগ ধরে রাখা যাচ্ছে না।’ সেজন্য রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে ভোরে উঠে পড়তে হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে লালমনিরহাটের তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছে। বৈশাখের এই কাঠফাটা রোদ আর গুমোট গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত।
আর এক পরীক্ষার্থী মেহেদী হাসান মুন্না জানায়, ‘ফ্যান ছাড়া পাঁচ মিনিটও ঘরে বসে থাকা যাচ্ছে না। ঘেমে জামাকাপড় ভিজে যায়, মাথা ধরে থাকে। লোডশেডিংয়ের কারণে রাতেও ঠিকমতো ঘুমানো যাচ্ছে না, যার ফলে পড়াশোনায় মন বসানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
দলগ্রাম এলাকার শিক্ষার্থী হাদিউজ্জামান বলেন, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়তে খুব সমস্যা হচ্ছে। ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না কয়েকদিন থেকে। স্কুলের পড়া মেকাপ দিতে পারছি না। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান না হলে পড়াশোনার বড় ধরনের ব্যঘাত ঘটবে।
কালীগঞ্জ কেইউপি পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদুজ্জামান আহমেদ বলেন, ‘২০২৬ সালের এই ব্যাচটি অনেক পরিশ্রম করেছে। কিন্তু পরীক্ষার মাত্র দুই-তিন দিন আগে এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের মানসিক মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা যারা আইপিএস বা জেনারেটরের সুবিধা পায় না, তারা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
শহরের মিশন মোড় এলাকার এক অভিভাবক তহমিনা খাতুন বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কথা আমরা জানি, কিন্তু বাচ্চাদের পরীক্ষার সময়টা অন্তত বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। গরমে ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়লে পরীক্ষার হলে গিয়ে কী লিখবে?’
বিদ্যুৎ বিভাগ (নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ) সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট জেলাজুড়ে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ বরাদ্দ অনেক কম। নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের তথ্যমতে, লালমনিরহাট সদরে ১৩ মেগাওয়াট, আদিতমারীতে ১৫, কালীগঞ্জে ১৬, বড়বাড়িতে ১২, হাতীবান্ধায় ৯ এবং পাটগ্রামে ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় গ্রিড ইনচার্জ মো. নাহিদ বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। বরাদ্দ অনুযায়ী আমরা বিতরণ করছি। তবে গরমের তীব্রতা যদি এভাবে বাড়তে থাকে এবং সরবরাহ না বাড়ে, তবে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘পরীক্ষার্থীদের কোনো রকম সমস্যা যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা সজাগ রয়েছি। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কোনো পরীক্ষার্থী গরমে অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]