লালমনিরহাটে জুয়েল হত্যা: মানবতার কফিনে শেষ পেরেক (১ম পর্ব)
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ১৩:২১
লালমনিরহাটে জুয়েল হত্যা: মানবতার কফিনে শেষ পেরেক (১ম পর্ব)
ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে নির্মম গনপিটুনী দিয়ে আধামরা করে জুয়েলের নিথর দেহ ছুঁড়ে ফেলা হয় আগুনে। চতুরপাশে রক্ত পিপাসু হায়েনাদের প্রমত্ত উল্লাস। যেন ওর লাশের ছাই উড়িয়ে নরপিশাচরা বাতাসে তার গন্ধ না শুঁকলে রাতে ঘুম হবে না। মনে পড়ে যায় কবি শামসুর রহমান সংকলিত ‘তুমি বলেছিলে’ কবিতাটির ক’টি লাইনের কথা, ‘...দাউ দাউ করে পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার ...আমাকে বাঁচাও এই বর্বর আগুন থেকে, আমাকে বাঁচাও, আমাকে লুকিয়ে ফেলো চোখের পাতায়, বুকের অতলে কিংবা একান্ত পাঁজরে…’।


কেমন করেছিল জুয়েল? পেট্রোলের আগুনে দাউ দাউ পুড়ছে জুয়েলের মটর সাইকেল। পুড়ে অঙ্গার ওর সুঠাম দেহ। ধূলায় মিশে গেছে দু’সন্তানের প্রিয় বাবার শরীর। পুড়ে অঙ্গার ওদের আগামীর স্বপ্ন। কথা ছিল বাবা ঔষধ নিয়ে ফিরার পথে ছোট্ট মেয়েটার অন-লাইন ক্লাসের সুবিধার জন্য একটা ট্রাইপট কিনে আনবে। অপেক্ষা করে-করে তাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। কথা ছিল ফিরে এসে একসাথে রাতের খাবার খাবে। খেতে-খেতে ছোট্ট ছেলেটা মটর সাইকেল চালানোর কষ্টটা ভুলিয়ে দিতে তার নরম হাতের পরশ দিয়ে বাবার শরীরটা আদরে ভরে দিবে। কথা ছিল বর্ডার থেকে ঔষধ নিয়ে এসে রাতে প্রিয়তমা স্ত্রীকে পাটগ্রাম অ্যাডভেঞ্চার এর গল্প শোনাবে। কিন্তু হায় সন্তানের ঘুম যেন আর ভাঙে না। ট্রাইপটের ওপর আর তার ক্যামেরা রাখা হয়ে উঠে না। কত শত স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।


জুয়েলের ফিরে আসার নাম নেই। বারান্দায় মটর সাইকেলের শব্দ নেই। চারিদিকে গুঞ্জন। বাতাসে ভাসছে লাশের গন্ধ। দুঃস্বপ্ন নয়! এটা সত্যি। মানুষ পোড়া গন্ধ। সাথে পেট্টোল এর তীব্র ঝাঁজ। পাটগ্রামের বুড়িমারী থেকে ভেসে আসা এ গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে মাস্ক ভেদ করে নাকে লাগছে। গন্ধ চলে এসেছে রংপুরে জুয়েলের নিজ জেলায় তার নিজ গৃহে। এ গন্ধ মস্তিষ্কে আঘাত করে তার অতি আদরের দুটি সন্তানের আগামীটাকে অঙ্গার করে দিয়েছে। প্রিয়তমা স্ত্রীর লালিত স্বপ্নকে চুরমার করে দিয়েছে। কপাল পুড়েছে ওদের। জুয়েলের নিষ্পাপ সন্তানদের চোখে এখন বাবার আগুনে পোড়া লাশের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। আর তার প্রিয়তমা স্ত্রীর বিধবা হয়ে যাবার কাহিনীতো এখান থেকেই শুরু।


ওরা বিশ্বাস করতে শেখে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো ভালো মানুষ নেই। আছে হায়েনা। আছে নরপিশাচ। যারা প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মেরেছে ওদের আদরের বাবাকে। পুড়িয়ে মেরেছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ থেকে ডিগ্রি নেয়া উচ্চ-শিক্ষিত একজন গ্র্যাজুয়েটকে। ওদের মাথা কাজ করে না। কল্পনায় ওরা বারবার মনে করার চেষ্টা করে, কি নৃশংসভাবে সকলে ওদের বাবাকে মেরেছে! কত কাকুতি -মিনতি করেছিল ওদের বাবা। প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল সবার কাছে। এক-একটি লাথি যেন আর নিতে পারছিল না জুয়েল।


শত পশুর হিংস্র থাবায় আক্রান্ত ক্ষত-বিক্ষত জুয়েল বাঁচার জন্য কতবার উঠে দাঁড়িয়ে আবার দৌড়োতে চেষ্টা করেছে। কতবার চীৎকার করে বলেছে, ‘আমি কোরআন অবমাননা করিনি। আপনারা বিশ্বাস করুণ, আমি মুসলমান। আমি নামাজী। আমি নামাজ পড়তে মসজিদে এসেছি। সারাটা জীবন আমি আল্লাহকে ডেকেছি। এই দেখুন, আমি সবসময় নিজের মোবাইলে কোরআনের আয়াত নিয়ে ঘুরি। সুযোগ পেলেই তা পাঠ করি। দয়া করুণ। আমাকে আর মারবেন না। আমার দুটি সন্তান আছে। ওদের পিতৃহারা করবেন না। আল্লাহর দোহাই লাগে এতটা নির্দয়-নিষ্ঠুর হবেন না’।


এক একটি বাক্য সম্পূর্ণ বলা হয়ে উঠে না জুয়েলের। রক্ত-চোষার দল যেনো আরো মরিয়া হয়ে উঠে। জুয়েল বলতেই থাকে, ‘ভাই বিশ্বাস করুণ আমি রংপুর থেকে এখানে ঔষধ নিতে এসেছি। আসরের ওয়াক্ত পড়ার সময় হয়েছে তাই মসজিদে ঢুকেছি। নামাজ পড়ে কোরআন পাঠ করবো বলে কার্নিশে হাত দিতেই ওপরে আলগাভাবে রাখা কোরআন শরীফটি নীচে পড়ে যায়। ভাই, আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, নীচে পড়ে যাওয়া কোরআন তুলে চুমু খেয়ে আবার আমি তা যথাস্থানে রেখে দিই। আমাকে বিশ্বাস করুণ। আমি কাফের বা মুশরিক নই। আমি মুসলমান। তাহলে কেনো আমি কোরআন অবমাননা করবো? কেন আমি এমন দৃষ্টতা দেখাবো? বলতে বলতে ক্লান্ত জুয়েল। ওর আর্তনাদ কেউ শোনেনি।


সমস্ত শরীরে আঘাতের দাগ। ওর থুতনি, চোয়াল ফেটে রক্ত ঝরছে। মাথা সোজা করতে পারছিল না জুয়েল। আর পারছে না সে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র জুয়েলের শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায় সে। তার নিথর দেহ নিয়ে রাজপথে রক্ত-পিপাসু হায়েনার দল উল্লাসে ফেটে পড়ে।


প্রাণহীন দেহটির প্রতি বিন্দুমাত্র সহমর্মিতা প্রদর্শন করেনি উগ্র মানসিক বিকারগ্রস্ত হুজুগে এসব অমানুষের দল। বরং কাফের-মুশরিক মেরে সস্তায় বেহেশতে প্রবেশের টিকিট পেতে রক্তের হলি খেলায় মত্ত্ব হয়ে পড়ে। নিজের তথাকথিত আমলনামাটাকে আরো পোক্ত করতে নির্মমতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। পেট্রোল ও কাঠ দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা তৈরি করে সেখানে তারা জুয়েলকে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দেয় মুহূর্তেই।


প্রসঙ্গত, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে গুজবের ব্যাপকতা ছাড়িয়ে গেছে সবকিছু। ডিজিটাল প্রযুক্তির আগে নির্দিষ্ট একটি এলাকায় হয়তো গুজব সীমাবদ্ধ ছিল। আর এখন পুরো দেশ এমনকি গোটা বিশ্ব গুজবের শিকার হচ্ছে। খুব অবাক হতে হয় যখন দেখি কোনো গুজবের সত্য মিথ্যা যাচাই না করে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় মত্ত হয়ে ধ্বংস করছে এলাকা। হত্যা করছে নীরিহ মানুষ। অস্থিতিশীল করে তুলছে বাজার। অশান্ত করে দিচ্ছে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র। পরক্ষণেই যখন বুঝতে পারে যে পুরো বিষয়টি ছিল নিছক গুজব, তখন যে আর কিছুই করার থাকে না। ইতোমধ্যে ঘটে গেছে প্রাণহানির মতো ঘটনা। জুয়েলের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।


মানুষ বাস্তবতার চেয়ে তার আবেগ দ্বারা বেশী প্রভাবিত হচ্ছে। সে যৌক্তিক ধারণা থেকে সরে গিয়ে তার গোষ্ঠী, দল, দর্শন, নীতি ও আদর্শ এর বলয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। ফলে ঘটনাটি গুজব জানলেও কায়েমী স্বার্থের কারণে মানুষ তা সত্য বলে প্রচার করছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর অনেক গুজব রটেছে। কয়েক মাস আগে কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাত্র কিছুদিন আগে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে কুমিল্লার মুরাদনগরে সাতটি ঘরে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মসজিদ থেকে হুজুগ এবং গুজব সৃষ্টির ঘটনা কখনো ঘটেনি। আর পিটিয়ে মারার পর মৃতদেহের শরীরে প্রকাশ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়া, এমন নৃশংসতার ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। তাই এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অন্যখাতে প্রবাহিত করার কোনো সুযোগ নেই।


জুয়েলের নিষ্পাপ দুটি সন্তানের চোখে এখন ভয়ংকর সেই ২৯শে অক্টোবর রাতের ঘটে যাওয়া কাহিনী কি আপনার ও শেখ রেহানার জীবনের ঘটে যাওয়া ৭৫ এর ১৫ই আগস্টের ভয়াল রাতের পুনরাবৃত্তি নয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? সেদিনের ঘটনা কি আজো আপনি মন থেকে মুছতে পেরেছেন? নাকি কোনোদিন পারবেন তা মুছতে? যদি তাই হতো, তাহলে কেন এত শূন্যতা নিয়ে আপনি কান্না আড়াল করেন? আজো যখন টেলিভিশনের পর্দায়, জনসমাবেশে কিংবা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ৭৫ এর ১৫ই আগস্টের কথা উঠে, আপনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরখ করি আপনার অশ্রুসজল কন্ঠ।


মমতার সংসার থেকে সেদিন দেশী বিদেশী চক্র নীলনক্সা এঁকে পরিকল্পিতভাবে কেড়ে নেয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আপনার পরিবারের ২২ জন সদস্যের জীবন। সেদিনও ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টিকারী গুজব রটনাকারী দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের দোসর হয়ে ঐসব দেশি বিদেশী খুনীচক্রের সাথে হাত মিলিয়ে ৭৫ এর ১৫ ই আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করেছিল। আজো তারা নিভৃত হয়নি। সমস্যাটা এখানেই। সুযোগ পেলেই ধর্মের নামে ধোঁয়া তোলে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। এটি কোনো ছোটখাটো ঘটনা নয়। মোটেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই এটিকে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে।


প্রশ্ন জাগে, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামবাসীর কেন এমন নৃশংসতা? যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শত বছরের উদাহরণ বিদ্যমান। যে শহরে শত বছর ধরে কালীবাড়ি পুরান বাজার জামে মসজিদ ও কালীবাড়ি কেন্দ্রীয় মন্দির একই উঠানে বিদ্যমান। যেখানে ভারতের মতো উদার গণতান্ত্রিক দেশে যেখানে বাবরী মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চীনের উইগুর মুসলমানদের ওপর দিনের পর দিন চীন সরকার নির্যাতন চালায়। সেখানে লালমনিরহাটের একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির! সময়মতো মসজিদে নামাজ হচ্ছে এবং নিয়মমাফিক চলছে পূজার আয়োজন। এর চেয়ে মধুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর কি হতে পারে? এ রকম একটি জায়গায় মসজিদে কোরআন পোড়ানোর গুজব ছড়িয়ে জুয়েলের মতো মেধাবী যুবককে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলার পৈশাচিক ঘটনা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। এমন নিষ্ঠুরতা কি করে মেনে নিই?


লেখক:
প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com