লালমনিরহাটে জুয়েল হত্যা : মানবতার কফিনে শেষ পেরেক (২য় পর্ব)
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ১৯:০৮
লালমনিরহাটে জুয়েল হত্যা : মানবতার কফিনে শেষ পেরেক (২য় পর্ব)
প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

জুয়েলের প্রিয়তমা স্ত্রী, আদরের দুটি সন্তান এবং পরিবারের সদস্যারা কি করে ভুলবে এ নৃশংসতা? এখান থেকেই যদি ওদের মাথায় নেতিবাচক প্যারাসাইট দানা বাঁধে আর সেখান থেকে যদি জন্ম নেয় মানসিক ভারসাম্যহীনতার, তাহলে কে নিবে এর দ্বায়ভার? দুবেলা দু’মুঠো খাবার আর ভরণ-পোষনের কথা না হয় রাষ্ট্র-কাঠামোর বিবেকের ওপর ছেড়ে দিলাম। বেঁচে থাকার মতো ওদের আর কি অবলম্বন আছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখানেও হয়তো শেষ পর্যন্ত আপনার হস্তক্ষেপ জরুরি হবে। নিস্পাপ সন্তানদের সদ্য বাবা হারানোর এই নির্মম যন্ত্রণা আপনার স্নেহের পরশে নিমিষেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাবে। বিপদ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।


মিথ্যে অপবাদে যাকে নির্মম ভাবে পিটিয়ে আগুনে পুড়ে ছাই করে দেয়া হলো সেই ব্যক্তিটির পরিচয় কি? ব্যক্তি জীবনে তিনি কেমন ছিলেন? পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে তার চরিত্র কিরুপ? এখন আর এসব ব্যাখ্যা করে কি হবে? পত্র-পত্রিকা মারফত দেশবাসী জেনেছেন। তার পুরো নাম আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুন নবী জুয়েল। জন্ম ও বেড়ে ওঠা রংপুর জেলাতেই। রংপুর জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সায়েন্সে স্নাতক সম্মানে ভর্তি হন।


প্রিয় লালমনিরহাটবাসী, আপনারা কি পরিসংখ্যানটা মনে করতে পারেন, ৯০ এর দশকে পাটগ্রাম, লালমনিরহাট কিংবা বৃহত্তর রংপুরের কজনের বাবা-মা তাদের সন্তানকে উচ্চ-শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে উত্তরবঙ্গের বাহিরের বিভাগে পাঠাতেন? আর কজনার ভাগ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তির সুযোগ মিলতো? সংখ্যাটা খুব কম। কিন্তু জুয়েল ছিল ব্যতিক্রম। সে তার মেধার সাক্ষর রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সে ছিল চতুর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করে রংপুরের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের লাইব্রেরি সায়েন্সের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে জুয়েল। সে মূলত সেখানকার লাইব্রেরির ইনচার্জ হিসেবে কাজ করতো। টানা ২৪ বছর সেই চাকরি করে জুয়েল। গত বছর অবসরে যাওয়ার পর সে নিজস্ব ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলো। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে কোন দিকেই কোন গতি করতে পারছিলো না। এমন অবস্থায় জুয়েল কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল তবে তা গুরুতর কিছু ছিল না।


ব্যক্তি জীবনে সহজ, সরল, অমায়িক ও ধর্মভীরু মানুষ হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলো জুয়েল। তাই তার এমন নৃশংস মৃত্যুর ঘটনা কেউই যেন স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না। এলাকায় জুয়েল এক কথায় সহজ আর সাদা মনের মানুষ ছিলেন। ধর্মগ্রন্থের পাশাপাশি সে নানা ধরণের বই পড়তো। ইংরেজি ভাষায় তার ভালো দখল ছিল। তার মৃত্যুতে স্থানীয় জনগন বিভিন্ন প্রতিবাদ, সমাবেশের পাশাপাশি খুনীদের গ্রেপ্তারের দাবীতে মানববন্ধন ও প্রশাসনিক অফিস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে জুয়েল হত্যার মূল আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেলার ডিসি, এসপি সহ জনপ্রতিনিধিরা তৎপর রয়েছেন। মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন জুয়েলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহপাঠীসহ গ্রন্থাগার ও তথ্য পেশাজীবীগণ।


অকালে স্বামীর এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন জুয়েলের স্ত্রী এবং তার দুই সন্তান। জুয়েলের ছোট ছেলে অরণ্য সবে মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে। মেয়ে অনন্যা এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বাবার শখ ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন। হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত! কি হবে ওর স্বপ্নের এখন? স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে জুয়েলের স্ত্রী মুক্তা দুটি সন্তানের আগামীর কথা ভেবে শোক ভুলে এখন রাজপথে সোচ্ছার। ডিগ্রি পাস মায়ের একটা চাকরি চাই। কারো করুণা বা দয়া কাম্য নয়। আর্থিক সহায়তা নয়। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তত সে। রাষ্ট্র, তুমি মানবিক হও। সমাজ, তুমি তাকে পথ চলার শক্তি দাও। মানুষ, তুমি এগিয়ে এসো।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম আমরা। ৮০’র দশকের শেষের দিকে বিভাগটিতে সদ্য অনার্স প্রোগ্রাম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থী ভর্তির আসন ছিল খুব সীমিত। তিন ব্যাচে মিলিয়ে মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিলাম আমরা। কাজেই নিজেদের মধ্যে জানাশোনা ছিল দারুণ। জুয়েল ছিল দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী আর আমি তৃতীয় ব্যাচের। তাকে আমি ‘জুয়েল ভাই’বলেই ডাকতাম। লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগটি কলা ভবনের নীচতলায় অপরাজেয় বাংলার সন্নিকটে হওয়ায় এখানেই জুয়েল ভাইর পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। দেখতে বেশ স্মার্ট ছিলেন তিনি। বুক টান করে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাঁটতেন জুয়েল। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ব্রজেশ্বরের মত যেন বিধাতার দেয়া এই নোংরা পৃথিবীটাকে এড়িয়ে চললে তার জাত বাঁচে। বেজায় নষ্টালজিয়া ছিল তার। তাইতো অন্যত্র বড় চাকুরি না করে চলে গিয়েছিলেন নিজ এলাকায়। শিকড়ের টানেই থাকতেন রংপুরে।


গায়ের রং ফর্সা আর লম্বা সুঠাম শরীরে জিন্সের প্যান্ট আর লাল টি-শার্ট পড়লে জুয়েল ভাইকে মানাতো বেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ জীবনে দুঃখ দেখিনি কখনও তার চোখে। হাসি জড়ানো ঠোঁটে সারাক্ষণ গুনগুন করে গান গাইতেন। দেখা হলেই জুড়ে দিতেন উপদেশ। নামাজের কথা বলতেন। ভালো কথা শোনাতেন। এমন অজস্র স্মৃতি এখন আমাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। ছাত্রজীবন থেকেই জুয়েল ভাইকে দেখেছি তিনি ধার্মিক ও সদালাপী একজন মার্জিত, রুচিশীল মানুষ। অথচ গুজব ছড়িয়ে মিথ্যে অপবাদের কলঙ্ক লেপে দিয়ে তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারলো দুর্বৃত্তরা। এমন পরিনতি কি করে মেনে নিই?


শুধু অনুন্নত দেশ নয়, উন্নত বিশ্বেও গুজব, গনপিটুনি এসব সমাজ ও রাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, লেখাটি যখন লিখছি তখন মার্কিন নির্বাচন চলছে। সকল পত্রিকায় ফলাও করে হেডলাইন দেয়া হয়েছে, ‘ট্রাম্পের জয় দাবি, ফেসবুকের বাগড়া’। এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, হেরে যাওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় একটার পর একটা মিথ্যা তথ্য ও গুজব রটিয়ে যাচ্ছেন এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। খোদ টুইটার, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এক পর্যায়ে সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষ তার ওয়ালে প্রচারিত সব খবরাখবর সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।


এই হচ্ছে উন্নত বিশ্বের অবস্থা। আমাদের দেশে গুজব, গণপিটুনির বিষয়ে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সেই ইতালিয়ান মুভি ‘বাইসাইকেল থিভস’ এর সার কথাই মনে করিয়ে দেয়। যার শানে-নুযুল দাঁড়ায়-পুলিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থাহীনতা। আর এই আস্থাহীনতা সমাজ ও রাষ্ট্রকে উসকে দেয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য নির্মমতার পথ বেছে নিতে। ফলে সমাজে হরহামেশাই চুরি-ডাকাতি ও গণপিটুনির পর পুড়িয়ে মারার মতো জঘন্য অপরাধ করার পথ ত্বরান্বিত হয়।


লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামবাসীর কেন এমন নৃশংসতা? সহসাই কোনো কারণগুলো লালমনিরহাটের পাটগ্রামবাসীকে মানসিক বিকারগ্রস্ত করে তুলেছে? সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, ও অর্থনীতিবিদ সকলেরই বিষয়টি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। অবস্থাদৃষ্টে অনুমেয়, তাহলে কি পাটগ্রামবাসীর অশিক্ষা, কুশিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অভাব অনটন ভয়, গুম-আতঙ্ক সেখানকার জনজীবনকে বিষিয়ে তুলেছে? নাকি উগ্রবাদী কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে এবং অর্থায়নে ‘বর্ডার ইস্যু’কে কাজে লাগিয়ে ঐ এলাকার জনসাধারণকে আইনের প্রতি আস্থাহীন করে তোলা হচ্ছে? যেখান থেকে জন্ম নিয়েছে সাইকোপ্যাথি বা মানসিক বিকারগ্রস্ততা। যা মানবতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার সামিল। যদি এক্ষুনি পদক্ষেপ নেয়া না হয় তাহলে এই আস্থাহীনতা থেকে গণমনোবিকার দেখা দিবে সমাজে। যা পরবর্তীতে নানা ধরনের ভয়াবহ সব অপরাধ সংঘঠিত করতে সহায়তা করবে। উন্নত বিশ্বের ইতিহাস থেকে এমন ধারণাই পাওয়া যায়।


মেট্রোপলিটন এরিয়ায় যেমন মানুষের জ্বিন-ভূতের ভয় থাকে না, তেমনি ধর্মীয় গোঁড়ারা মেট্রোপলিটন, কসমোপলিটন এরিয়ায় বসবাসরত ব্যস্ত-শিক্ষিত মানুষের ওপর খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাই এসব জায়গায় ধর্মীয় উম্মাদনা নামক জুজুর ভয় অনেকটা কমে গেছে। ফলে এসব জায়গা থেকে বহুদূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে অশিক্ষিত-অর্ধ-শিক্ষিত এলাকা, দরিদ্র পল্লী, ছিটমহল, করিডোর কিংবা বর্ডার এলাকায় গিয়ে এখন এসব ধর্মীয় উম্মাদরা কাজ করছে। তারা মানুষের সহজ সরল আবেগকে পুঁজি করে গুজব রটাচ্ছে, ফতোয়া দিচ্ছে এবং ধর্মপ্রান মানুষকে ব্যবহার করছে। ‘লাল সালু’র ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৯৪৮ সালে বিষয়টি নিদারুনভাবে বর্ণনা করে গেছেন।


আমার ১২ বছরের মেয়েটা কোরান-শরীফ খতম করেছে এবং মোটামুটি অর্থসহ পড়তে শিখেছে। ওর প্রশ্ন আমাকে শুধু বিব্রত করেনি করেছে অপরাধী। ধর্ম কি এত নিষ্ঠুরতা শিখায় বাবা? একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে আগুনে পুড়ে ফেলা কোনো ধর্মের শিক্ষা হতে পারে বাবা? আমি নিরুত্তর। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। কিছুক্ষণ আনমনে পিছনের বারান্দা দিয়ে আমি পশ্চিমাকাশে তাকিয়ে থাকি। সন্ধ্যার আকাশে আজ অন্যরকম লালাভ রং। যেন রক্তের ছোপ-ছোপ দাগের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে জুয়েল। উপহাস করছে। বলছে, ‘তোরা আমাকে নয়, পিটিয়ে মেরেছিস একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতাকে। পুড়িয়ে ছারখার করেছিস জাতির বিবেককে’। সত্যি কি তাই নয়? এর থেকে পরিত্রাণ পাবো কবে তাহলে?


জুয়েলের পেট্রোলে পোড়া লাশের গন্ধ আজ উত্তরবঙ্গ হয়ে গোটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। নাড়া দিয়েছে লাখো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে। এইমাত্র দেখলাম বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ‘দৈনিকশিক্ষা’ পত্রিকায় জুয়েলকে নিয়ে একটি পূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি নিহত জুয়েলের পরিবারের দায়িত্ব সরকারকে নিতে অনুরোধ করেছেন। আমরাও এ দাবীর প্রতি একমত। পাশাপাশি সকলের প্রতি আহ্বান, আর দেরি নয়। আসুন, এদেশ থেকে সমূলে উচ্ছেদ করি ধর্মীয় উগ্রবাদ। রুখে দাঁড়াই গুজব ও সন্ত্রাস। ধর্মের নামে বন্ধ করি সকল সন্ত্রাস-অরাজকতা।


লেখক : ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com