মানসিকতা পরিবর্তন করতে না পারলে শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন অসম্ভব
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২০, ১২:৪২
মানসিকতা পরিবর্তন করতে না পারলে শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন অসম্ভব
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

মার্চের শুরুর কথা। মাত্রই করোনার ভয়াবহতা সারা বিশ্ব দেখতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত হলো যেন শিক্ষার্থীরা দ্রুত নিজ নিজ এলাকায় নিরাপদে পৌঁছে যেতে পারে। ততদিনে প্রায় ৫০ ভাগ ক্লাস নিতে পেরেছি। সর্বনিম্ন তিনটি ক্লাস নিতে পারলেও পরীক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের তৈরি করা যাবে। তো যেমন ভাবা সেভাবেই ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভ কে জানালাম অনলাইনে ক্লাস নিতে চাই। আমরা মাঝে মাঝে অনলাইনে সেমিনার করি। সেই জায়গা থেকেই তখন প্রস্তাব দিয়েছিলাম। দেখলাম শিক্ষার্থীদের মাঝে কোন সাড়া নেই।


আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না সারাদিন ফেসবুক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কিভাবে কোন কারণ ছাড়াই অনলাইন ক্লাসের কথায় একদমই রাজি হলো না। পরে বুঝেছি ওরা আসলে ফ্রি ইন্টারনেট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইফাই প্রাঙ্গণেই নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের জন্যই ইন্টারনেট চার্জ অনেক বড় বিলাসদ্রব্য।


সে সময়ই ভাবতে শুরু করেছিলাম, সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ কি? শিক্ষার্থী অবস্থায় যখন আমরা ক্লাসে ই গভর্ন্যান্স কোর্সটি পড়তাম বাংলাদেশ তখন চারটি ফেইস এর প্রথম ধাপে ছিল। যে কারণে ডিজিটাল বাংলাদেশের চেহারা ভবিষ্যতে কেমন হবে তা বুঝতে কিছুটা কঠিন হতো। আজ প্রায় আট বছর পর আমরা ই-গভর্ন্যান্স এর তৃতীয় ধাপ অতিক্রম করছি। যেখানে ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যবহারিক রূপ আমরা সম্মুখে দেখতে পাই। আর অল্প কিছুদিনের মাঝে আমরা যখন চতুর্থ ধাপে পৌঁছে যাবো সেটা হবে এক্সট্রিম ডিজিটালাইজেশন। যেখানে কেউ চাইলেও এনালগ হতে পারবে না তা সে কোন ফাইল সংরক্ষণ হোক, সেবা গ্রহণ হোক বা শিক্ষাদান হোক। এটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।


আমরা অনলাইন সার্ভিসের সুফল ভোগ করতে শুরু করেছি অনেক আগেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারবো না যতক্ষণ নিজেদের মেন্টাল সেটাপ পরিবর্তন করতে না পারি। বাহ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের নিজেদেরও পরিবর্তন হতে হবে। করোনা আমাদের সেই সুযোগটাই করে দিয়েছে।


তবে এটাও সত্য, ঠিক এই মুহূর্তে আমরা এক্সট্রিম ডিজিটালাইজেশন এর জন্য কতটা প্রস্তুত বা নতুন প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে কি না!


আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সেশন জট কমানো থেকে শুরু করে সকলের মানসম্মত শিক্ষাগ্রহণ সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণ করেছে সবসময়। কিন্তু এর সাথে এটাও সত্য ক্লাস পর্যবেক্ষণ বলে আমাদের বর্তমান শিক্ষার্থীদের শতকরা ২০ ভাগ অনলাইন ক্লাসের জন্য পরিপূর্ণভাবে তৈরি নয়। পুরো দেশে ফ্রি ইন্টারনেটের আওতায় না আনলে এটা আশা করা কঠিন হবে যে প্রান্তিক একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত চেষ্টায় অনলাইন পাঠে আগ্রহী হবে বা সক্ষম হবে।সকলের কাছেই হয়তো ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে কিন্তু আমরা সবাই জানি তা ব্যবহারের জন্য অর্থের বড় একটি অংশ মোবাইল কোম্পানিগুলোকে প্রদান করে সেবা গ্রহণ করতে হয়।যেটা পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর জন্যই বাড়তি চাপ হয়ে যাবে।


এর সাথে আছে বাংলাদেশে বিক্রিতব্য প্রযুক্তি পণ্যের গুণগত মানের সমস্যা।যদি নিজের কথাই বলি,আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোন নিয়ে একটি সার্টিফায়েড শপ থেকে ল্যাপটপ কিনেছি। সেই লোন দুই বছর মেয়াদে পরিশোধযোগ্য। আমার লোন এখনো চলছে এবং এর মাঝে ল্যাপটপকে অসংখ্যবার সারাইঘরে নিতে হয়েছে। সুতরাং সকলকে প্রযুক্তি পণ্য প্রদানের ব্যবস্থা করার সাথে সাথে মেইন্টেনেন্স এর খাত প্রস্তুত রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে।


বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতে এক ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় পাঠদান শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হতে পারে।


শিক্ষার্থীদের মাঝে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে সেমিস্টার শেষ হওয়ায় তাদের কর্মজীবনে সমস্যা হয়ে দাড়াতে পারে বলেও ভীতি কাজ করছে। করোনাকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও কর্মবাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। নীতিনির্ধারকগণের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে যেন কর্মবাজারে দ্রুতই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়।


আর সবচেয়ে বড় ভয় যেটা আমরা যেকোনো সরকারি বাজেট খরচে দেখতে পাই, আমাদের প্রশাসনযন্ত্র, ইক্যুইপমেন্ট ডিলার যাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় ও সেবা গ্রহণ করা হবে তাদের কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতি ঠিক কতটা উপযোগি হবে ক্লাসে ফেরার এই প্রচেষ্টায়! শিক্ষাবান্ধব সরকার হয়তো অনলাইন ক্লাসে ফিরতে সকল ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে,কিন্তু তা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে মাঝ পথে কতটা বিপথ পাড়ি দেবে আর কতটা দুর্নীতির চাপে পিষ্ট হবে তা ভাবলেই সব আশা মিইয়ে যায়।


তবে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। অনলাইন শিক্ষাদানেও সফলতা আনা সম্ভব। বাংলাদেশের সবচেয়ে পোটেনশিয়াল জোন উপজেলা কেন্দ্রিক ডিজিটালাইজেশন এ সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে। প্রযুক্তি পণ্যের ক্রয় বিক্রয়ে রেগুলেটরি ও মনিটরিং আরও কঠোর ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।পাইলট ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্ট মানসিক দ্বন্দ্ব দূর করা যেতে পারে। শিক্ষার মান ও পরবর্তী কর্মজীবন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে মনোনিবেশ করতে হবে।


জানি দুর্নীতি হবে চিন্তা করে সামনে অগ্রসর হওয়াকে বন্ধ করা যায় না। সকল চ্যালেঞ্জকে সাথে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন নতুন সমস্যা আসতে পারে।সমস্যা আসলেও আমরা আর বেশিদিন এভাবে বসে থাকতে পারবো না।


ক্ষার্থীদের বসিয়ে রাখতে পারবো না।সময় কারও জন্যই থেমে থাকে না। আজ না হোক কাল আমাদের সাবধানতা ও নিরাপত্তা বজায় রেখেই ক্লাসে ফিরতে হবে। এমন নয় যে করোনা আর পাঁচ দিন বা পাঁচ মাস পরেই বিলীন হয়ে যাবে! আমাদের করোনার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়া শিখতে হবে।সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিকল্প আমাদের হাতে নেই। যা সমস্যা আছে তা সমাধান করেই আমাদের পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উপায়ে অগ্রসর হতে হবে।কারণ করোনা পরবর্তীকালীন দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের এই শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।


তাই অনলাইন শিক্ষাদানে আমাদের অগ্রসর হতেই হবে তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধাকে এবং একই সাথে দেশীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও যত্ন নিশ্চিত করতে হবে।তাহলেই এ উদ্যোগ সফল হবে।


লেখক: রিতু কুন্ডু
সহকারি অধ্যাপক
লোক প্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com