রাষ্টের আইন মানার অভ্যাসটা কবে আমাদের মজ্জাগত হবে?
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২০, ১৬:১৮
রাষ্টের আইন মানার অভ্যাসটা কবে আমাদের মজ্জাগত হবে?
মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম
প্রিন্ট অ-অ+

দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। দেশের আইন মানা দেশপ্রেমের অংশ এবং সুনাগরিকের উত্তম গুণাবলীর অন্যতম। বিখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ বার্নার্ড শ ব্যাপারটিকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন এভাবে:


‘দেশপ্রেম হলো এমন একটা বিশ্বাস বা ধারণা যে, তোমার দেশ পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কারণ, তুমি সেখানে জন্মেছ।’


এখানে ‘দেশপ্রেম’ বলতে তিনি জাতীয়তাবোধ কেই বুঝিয়েছেন। কথাটির যথার্থতা সহজেই বোঝা যায়। জাতির স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, সম্মিলিত হয়ে কাজ করাকে বুঝিয়েছেন। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত এমনভাবে লেখা হয়, যেন সে দেশটিই জগতের সেরা। আমরা যেমন আমাদের দেশকে ‘সকল দেশের রাণী’ ভাবতে শিখি।


বহুল উদ্ধৃত একটি আরবী প্রবাদ ‘হুব্বুল ওয়াতানি মিনাল ঈমান’ কথাটির অর্থ হলো দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। পৃথিবীর মুসলিম সমাজ যুগে যুগে দেশ ও জাতির প্রতি গভীর ভালবাসা ও অকৃত্রিম প্রীতির যে অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, উপরের উক্ত প্রবাদটি হচ্ছে তার বাস্তব প্রতিফলন। এই গুরুত্ববহ প্রবাদটি ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়মন জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তেমনি ভাবে নিজ দেশের প্রতি ভালবাসা দেখাতে বলেছেন পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মগুলোও। ধর্ম কখনো অকল্যাণের কথা, ক্ষতির কথা বলেনা। ধর্ম সব সময়ই মানব কল্যাণের ডাক দিয়ে যায়। আর এজন্যইতো ধর্মকে জীবনের শ্বাশত অনুশাসন বলা হয়।


রাষ্ট্রের আইন মানা যেমন আমাদের নাগরিক দায়িত্ব, তেমনি আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। আর আমরা অবলীলায় প্রতিদিন আইন ভাঙছি এবং আইনের লঙ্ঘন করছি যা অমার্জনীয় অপরাধ। এর চেয়ে বড় বিষয় এই আইন না মেনে বর্তমান এই ক্রান্তিকালে রাষ্ট্রের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছি আমরা নির্বোধ সাধারণ মানুষেরা। আমাদের অলক্ষ্যেই আমরা দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে দিচ্ছি ইনভিসিবল নোভেল করোনা ভাইরাসটিকে শুধু লকডাউন ভেঙে যত্রতত্র অবাধে ঘোরাফেরা করে।


সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যখন কভিড-১৯ হানা দিল, তখন সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা দিল সরকার। সরকারের এ পদেক্ষেপ নিঃসন্দেহে অতিশয় অপরিহার্য ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ছিল। সে সময় লকডাউনের ঘোষণা না দিলে হয়তো এতদিনে আরো ভয়াবহ চিত্র দেখতে হতো। কিন্তু আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের আইন না মানার চিরাচরিত ও ঐতিহ্যগত অভ্যাসটা রয়েই গেল এবং দৃশ্যমান আকারে চোখে পড়ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কল্যাণে।


করোনা সংক্রামণ এড়াতে সারাদেশে গত ২৬ মার্চ থেকে ধরে লকডাউন চললেও কোনোভাবেই ঘরে থাকছে না মানুষ। বরং দিন দিন রাস্তাঘাট-বাজার এবং ব্যাংকে বাড়ছে মানুষ। সেই প্রথম থেকেই বলা যায় যে, বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে হাট বাজার, নদী ঘাট, রাস্তা এবং ব্যাংকে। রিক্সা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, অটোরিক্সা, ইজিবাইক, সিএনজি এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। বাস্তব চোখে এবং টেলিভিশনের নিউজে যা দেখেছি, বাজার, রোডঘাট, পোর্ট, কাঁচাবাজার, গির্জা, মসজিদ, পাড়া মহল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় স্বাভাবিক সময়ের মতো চিত্র দেখা যাচ্ছে এখনো।


অফিসের যাওয়ার প্রাক্বালে কৌতুহল বশতঃ রাস্তায় দু একজনের সাথে জিজ্ঞাসাবাদ করলে উল্টো কথাও শুনতে হয়, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের কথা বলে। রাস্তায় বের হওয়া মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কেউ পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে, কেউ ওষুধ কিনতে, কেউ ব্যাংকিং করতে, কেউ অফিসের চাপে কাজে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তবে কিছু সংখ্যক মানুষ রাস্তায় বের হয়েছেন বিনা কারণে নানা অজুহাতে এবং সে অজুহাতগুলো অত্যন্ত ঠুনকো।


রমজান মাস যেন ব্যস্ততার মাস। কিন্তু ইবাদত, বন্দেগী, তিলাওয়াত, যিকির ও সিয়াম সাধনায় ব্যস্ত হওয়ার চেয়ে মানুষ অধিক ব্যস্ত খাদ্যদ্রব্য কেনাকাটায়। মানুষের অহেতুক ভিড় জমানো এবং এই অস্বাভাবিক ঠেলাঠেলি দেখে মনে হচ্ছে যেন রমজান মাসে সর্বত্র গ্যাদারিং করার ব্যস্ততা বেড়েছে সবার এবং অস্বাভাবিক রকম মাত্রায় সবাই ব্যস্ত। ভীষণ ব্যস্ত, খাদ্যদ্রব্য কেনাকাটায়। মনে হচ্ছে দেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য সব শেষ হয়ে যাবে। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ক্রেতা সাধারণ ভিড় করছে যেসব দোকানে সেই দোকানদারদেরও শ্বাস ফেলার সময় নেই। এমন দৃশ্য দেখে মনে হয় দেশে প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) এর মতো মহামারি জনমনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি, দেখলে মনে হয় ঈদের আমেজ। মাঝে মাঝে পুলিশি টহল দেখে লোকজন ছিটকে বা সড়ে পড়লেও পুলিশ চলে গেলে আবার পূর্বের চিত্র, এ যেন চোর পুলিশের খেলা। পুলিশ আসলে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় পুলিশ চলে গেলে পূর্বের চিত্রই দেখা যায়। কোনোভাবেই সচেতন হচ্ছে না মানুষ, মানছে না লকডাউন।


বিশ্বময় আঘাত হানা করোনার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ঘোষিত লকডাউন বেশির ভাগ মানুষই মানছে না। ঘরে থাকার সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সাধারণ মানুষ রাস্তাঘাট, বাজার ও পাড়া মহল্লার চায়ের দোকানে ভিড় করছে। আইনের প্রতি মানুষের এ নির্লিপ্ততা হয়তো বয়ে আনবে ভয়াবহ পরিণতি। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও ইস্পাত কঠোর দায়িত্বের কঠোরতার পরও পাড়া-মহল্লায় অলি গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিশোর যুবক থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ। রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশের গ্রাম গ্রামাঞ্চলের পাড়া মহল্লা পর্যন্ত এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে করে দেশে করোনা ঝুঁকি আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে যা ঘটাতে পারে কঠিন ক্যাটাসট্রফি। প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। এক্সপোনেশিয়াল গ্রোথ ঠেকাবার আর কোনো রাস্তা থাকবেনা যদি এইভাবে মানুষ আইন ভঙ্গ করে, রাষ্ট্রাদেশ না মানে এবং এইভাবে অপ্রয়োজনে অবাধে ঘোড়াফেরা করে। দেশজুড়ে মানুষের এই অবাধ ঘোরাফেরা বন্ধ করতে না পারলে, তাদের ঘরে রাখতে না পারলে করোনা পরিস্থিতি ইতালি-আমেরিকার মতো ভয়াবহ রূপ নেবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।


রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে লকডাউন দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মাঠপ্রশাসন সোস্যাল ডিসটেন্সিং বজায় রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করলেও বেশিরভাগ এলাকাতেই তা মানছেন না সাধারণ মানুষ। নির্লিপ্ত মানুষের এ কান্ডজ্ঞানহীনতা ও দায়িত্বহীনতা দেশটাকে দিনদিন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য স্বাভাবিক সময়ের মতোই তারা ঘর থেকে বের হচ্ছেন। বর্তমান ক্রান্তি কালে নিযুক্ত বাংলাদোশের যৌথবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহলে গেলে এক দেখা যায় একরকম দৃশ্য, আবার তারা সরে গেলে ওই এলাকা আগের অবস্থায় ফিরে যায়।


বাংলাদেশের মোটামুটিভাবে সবগুলো হাইওয়েসহ সকল প্রবেশ পথেই রয়েছে পুলিশি তৎপরতা। চলার পথে একটা বাধা আসছেই যা গণহারে চলাফেরায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনছে। প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রায় সবাইকে। পণ্যবাহী পরিবহন থেকে ছদ্মবেশী যাত্রীদেরকে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে সকলকে। যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে না পারলে, ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষদের।


রাজধানীতে করোনা ঝুঁকির প্রধান স্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে টিসিবি পণ্যের ট্রাক এবং কাঁচা বাজারগুলো। এই ট্রাকের সামনে জমে অস্বাভিবিক ভিড়। ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে টিসিবির ট্রাকের সামনে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কোনো সামাজিক দূরত্ব মেইনটেইন করা হয়না। করোনা ঝুঁকির সতর্কতা অমান্য করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ঝুঁকি বেড়েই চলছে। এতে করে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বাড়ছে। বাজারগুলোতে অধিক মাত্রায় দোকানিরা দোকান খোলার কারণে সেখানেও মানুষের ভিড় বেড়েছে।


করোনা সংক্রমণের অন্যতম ঝুঁকিপূ্র্ণ স্থান নগরীর কাঁচাবাজারগুলো। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজার, নিউমার্কেট কাঁচাবাজার, মালিবাগ বাজার, খিলগাঁও রেলগেইট, খিলগাও বাজার, সিপাহীবাগ বাজার, রামপুরা বাজার, তেজগাঁও বাজারসহ সব বাজারেই একই অবস্থা। মাছের দোকান, সবজির দোকান, মুদির দোকানের সামনে গায়ে গায়ে গাঁদাগাদি করে লেগে লোকজনকে বাজার করতে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরের কথা, অনেকেই মুখে মাস্ক পর্যন্ত পরেননি। আর প্রচণ্ড ভিড়ে সজোরে হাঁচি দেওয়াতো রয়েছেই। একটা হাঁচি কতজনকে যে একসাথে আক্রান্ত করছে কে জানে। এত ভিড়ের মধ্যে থেকে অবধারিত ভাবে বায়ুমন্ডল থেকে মানুষের স্নিজিং এর কারণে অসংখ্য ভাইরাস সমেত বায়ুকণা ইনহেইল করছে সাধারণ মানুষ।


বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ক্রমবর্ধমান হারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা। ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিলও। প্রায় সব জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে এই বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯।


আমরা যদি চীনের ঘটনা দেখি তাহলে চীন সফল ভাবে তাদের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল শুধু লকডাউন মেনে, রাষ্ট্রীয় আইন মেনে। তেমনি ভাবে সিঙ্গাপুর, হংকংও।


এই ভাবে বিশ্বজুড়ে সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব যখন তীব্র, যখন কমিউনিটি ডিস্টেন্সিং এর কথা জোড় গলায় বলা হচ্ছে ঠিক তখনো বাংলাদেশের মানুষ কেয়ারলেস। আরামে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে অলিতে গলিতে। কে শোনে কার কথা?


বাংলাদেশের মানুষের ছলচাতুরীর শেষ নেই। তারাতো আইনকে ফাঁকি দিচ্ছেনা। ফাঁকি দিচ্ছে মূলত নিজেদেরকেই। সারাদেশের গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও পণ্য পরিবহনের গাড়িতে নানা কায়দায় যাত্রী বহন করা হচ্ছে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও থেমে নেই মানুষের চলাফেরা। পণ্যের গাড়িতে ছদ্মবেশে চলছে মানুষ। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ ছোট ছোট যানবাহন চলাচল করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই। মানুষের এই চলাফেরায় কোনো কারণ খুঁজে পায়না সাংবাদিকেরা, প্রতিটা জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসছে লেইম এক্সিকিউস। বিভিন্ন ফেরি সার্ভিস চালু থাকায় মালবাহি ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে চড়ে এখনো অনেকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা চলে যাচ্ছে। শহর ছেড়ে অনেকে চলে যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে। আইনশৃংখলা বাহিনী কিংবা সরকারের মানবিকতা, উদারতাকে কিছু মানুষ অবহেলা করছে যার ফলশ্রুতিতে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন আরো মারাত্মক ভাবে ঘটছে। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে।


বিশেষজ্ঞদের অভিমত, করোনার সর্বোত্তম চিকিৎসা হলো প্রতিরোধ। আক্রান্ত হওয়ার আগেই এর প্রতিকার করা উত্তম। প্রাণান্ত চেষ্টা সত্ত্বেও এখনো অবধি করোনা রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। যদি আক্রান্তের সংখ্যা এভাবে লাফিয়ে বাড়তে থাকে তাহলে আগামী দিনগুলোতে তখন আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ার আগেই মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে কঠোর হতে হবে। চীন, সিঙ্গাপুরসহ যেসেব দেশ করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে, ঐ সব দেশে লকডাউন সবাই মেনেছে। ওদের দেশে লকডাউনে কেউ বাইরে বের হতে পারেনি, বা বের হতে দেয়া হয়নি। ওরা নিজেরাও আইন মেনেছে। এমনটা যদি মানতো আমার দেশের সুধী জনেরা, তাহলেতো কোনো কথাই ছিলনা। বাংলাদেশ নিয়ে আর এত টেনশন পোহাতে হতোনা। এবার আসি প্রসংগ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এর বিষয়ে। ভাইরাসের এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রামনের স্হানান্তর।সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব না থাকলে তা অবধারিত। As per Web Med definition, Community transmission is when there is no clear source of origin of the infection in a new community. It happens when you can no longer identify who became infected after being exposed to someone who interacted with people from the originally infected communities.( তথ্যসূত্রঃ www.webmd.com) যেহেতু এ ভাইরাসটি দেখা যায় না এবং আক্রান্ত ব্যক্তি বা ভাইরাস বহনকারী ব্যক্তি কে বুঝা বাইরে থেকে বোঝা যায়না, তাই তো কন্টাজিয়ন বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এর ঝুঁকি প্রবল যদি এইভাবে মানুষ অবাধে বাইরে যায় এবং ভিড় জমায়।


সরকার যা বলছে, যা করছে সবই জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণকে এ মরণফাঁদ থেকে বাঁচাতে। সরকারের সাথে একাত্মতা করে, সরকারকে সাহায্য করা এ মুহূর্তে প্রতিটা নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। নতুন এই ভাইরাস থেকে ‘নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে রক্ষা করতে’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষকে ঘরে থাকতে কঠোর আদেশ জারি করেছে সরকার। জনকল্যাণ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ গুলো মেনে চলা অবশ্য কর্তব্য দেশের প্রতিটা নাগরিকের। রাজধানীসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেনা সদস্যদের জোর তৎপরতা দেখা চোখে পড়ছে। সেনা সদস্য, পুলিশ, আইনশৃংখলা রক্ষায় অন্যান্য বাহিনী ও মাঠ পর্যায়ে অকাতরে নিবেদিতপ্রাণ নিয়োজিত মাঠ প্রশাসন আমাদের হিতার্থে যা করছে, আমাদের উচিৎ তাদেরকে সহযোগিতা করা। তারপরও মানুষ মানছে না ঘরে থাকার নির্দেশ। মানছে না লকডাউনও। শহর বা মফস্বলের মূল সড়কগুলো ফাঁকা থাকলেও অলিগলিতে দেখা যাচ্ছে মানুষের জটলা। নিজের বা পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে অত্যন্ত, নিছক ও সামান্য প্রয়োজনেই প্রতিদিন ঘর থেকে বের হচ্ছেন অনেকে। ফলে বাংলাদেশেও আসছে ভয়াবহ করোনা বিস্ফোরণ এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই মরণব্যাধিটির পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।


দেশে ঘোষিত লকডাউন ও সরকারের নির্দেশ অমান্য করে অনেকেই ফিরে গেছেন নিজ এলাকায়। অনেকেই ফিরেছেন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়েই যা সে নিজেও জানেনা। আবার অনেকে ফিরেছেন উপসর্গ নিয়ে, কখনো জ্ঞাতসারে, কখনো অজ্ঞাতসারে, মানুষ বাড়ি ফিরছেন এখনো। কিছু কিছু মানুষ লুকিয়ে বাড়ি ফিরছেন পণ্যবাহী গাড়িতে, কখনো ত্রিপাল টাঙ্গিয়ে। এতে সারা দেশে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।


এখন বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধ চলছে তা অদৃশ্যমান শক্তির বিরুদ্ধে। অতএব এই যুদ্ধের ভয়াবহতা অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার ভয়াবহতা আমরা ইতোমধ্যে উন্নত বিশ্বে দেখতে পাচ্ছি।


আমাদের চিরায়ত অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গ করা। আইন না মানার এ অভ্যাসটা আমাদের পরমপরায় গেঁথে গেছে। এই বদ অভ্যাসটা এবং আমি বলব এই গর্হিত অপরাধটা একটা জাতিকে কোথায় নিয়ে যাবে, কতটা অতল গহ্বরে প্রক্ষেপন করবে, তা শুধু তখনই টের পাব আমরা। আমরা সরকারের সাথে রশিটানা খেলা খেলছি যে দেখি কে কারে ফেলতে পারে। এটা রাজনৈতিক কোনো ইস্যু নয়। এটা লাখো মানুষের বাঁচা মরার ইস্যূ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হলো সরকার। এই ভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধ করতে না পারলে প্রতিকার করা খুবই কঠিন হয়ে যাবে আমাদের মত মধ্যম আয়ের এই দেশে। তাই আসুন, আমরা রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলি। কভিড-১৯ নামক মহাযুদ্ধ মোকাবেলায় সরকারের পাশে থেকে সরকারকে সহায়তা করি। এই দেশটা আমাদেরই। বড় কোনো ক্ষতি হলে, পোহাতে হবে আমাদেরই। মাশুল গুনতে হবে আমাদেরই। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি- রাষ্ট্রীয় আইন মানার অভ্যাসটা কবে আমাদের মজ্জাগত হবে।


লেখকঃ ব্যাংকার ও কলামিস্ট।


বিবার্তা/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com