ইফতার!
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২০, ১৬:০৯
ইফতার!
সোহানী পূষণ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় মা বলতো যা দৌড় দিয়ে আম বাগান থেকে লেবু পাতা ছিড়ে নিয়ে আয়। সন্ধ্যা নামার আগে আগে অন্ধকার ভাবের আলো ছায়ার মধ্যে দিয়ে একটু দুরুদুরু বুক নিয়ে যেতাম আমি লেবু পাতা ছিড়তে। মা তা দিয়ে গুড়ের শরবত বানাতো। গুড়ের শরবতের প্রতি কোন আকর্ষণ আমার ছিলনা।


লেবু পাতার বদলে আশা করে থাকতাম বাজার থেকে কিনে আনা লাল কটকটি পেয়াজু ভাজার। দাদা দাদী চাচা চাচীদের মাঝে হাত বাড়ালে মা চেচানি দিয়ে বলতো, ওরে দেবেন না। ও তো রোজা নাই।


ছোটকালে বিয়ে হয়ে যাওয়া আমাদের বাড়ির চল ছিল। ১৭ বছরে পড়তেই বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি চলে এলাম। শুরু হলো ইফতারের নতুন নিয়ম। বাড়ির বউ, শশুর শাশুড়ি স্বামীর সামনে ইফতার বানিয়ে তুলে দেবে। সবার পাতে ইফতার বেশি করে পড়লেও কম ভাগ শুধু আমার পাতেই পড়তো। রান্নাঘরে একা পিঁড়িতে বসে ইফতার করা আমাকে কোন এক ছলে শাশুড়ি দেখে যেতো প্রতিদিন। আমার পাতে ইফতার বেশি পড়েছে কিনা, আমি আলাদা করে কোন কিছু সরিয়ে রেখেছি কি না।


বিয়ের এক বছর নাই যেতে প্রথম সন্তানের মা হলাম। ও বাড়ির নিয়ম তাই ছিল। ঘর সংসার মানে কি! যত তাড়াতাড়ি পারো সন্তান জন্ম দাও।


বিয়ের দ্বিতীয় বছরে ইফতার শুরু হলো নতুন নিয়মে। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার বানিয়ে, রাতের রান্না করে, প্লেটে সাজিয়ে গুছিয়ে সবার সামনে দেয়ার পর ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে থাকতাম। সবার ইফতার শেষ হওয়ার পর কেউ বাচ্চাকে একটু ধরবে তারপর আমি কিছু মুখে দিতে পারবো। ইফতার যে সবাইকে একই সময়ে করতে হয়! তাই বাচ্চা কে ধরবে! ওহ্ , ঐ নিয়ম অবশ্য আমার বেলায় ছিল না।


কয়েক বছর ধরে নিয়মিত এই নিয়ম চললো। একে একে তিন সন্তানের মা হলাম। ইফতারের নিয়ম আমার সাথে পাল্টানো না।
সবাই ইফতার করে আমি বাচ্চাদেরকে নিয়ে এক পাশে সরে বসে থাকি। তারা যখন একটু বড় হলো, তখন শুরু হলো আর এক অভিযোগ। ইফতার সাজানো প্লেট তারা হাউমাউ চিৎকার-চেঁচামেচি করে নষ্ট করে ফেলে। কাউকে না কাউকে তো তাদেরকে সরিয়ে রাখতেই হবে।


গরমের সময়ের ইফতার! খেজুর মুখে দিয়ে সবাই পানি খায়, সুখের শরবত খায়। আমি ছেলেপুলে নিয়ে চেয়ে দেখি। যারা সাজানো প্লেট থেকে ইফতার খায় তাদের একবারও মনে হয় না তাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার গলা দিয়ে পানি নামবে না।


ইফতার! আমার বানানো ইফতার! সাজানো প্লেট! শরবতের গ্লাস!!!


লেখক: যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মাগুরা


বিবার্তা/এনকে

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com