মানুষের রোগ, রোগের ওষুধ, রোগীর খাদ্য এবং জনতার উপদেশ
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২০, ১৯:২৮
মানুষের রোগ, রোগের ওষুধ, রোগীর খাদ্য এবং জনতার উপদেশ
অধ্যাপক তোরাব রহিম
প্রিন্ট অ-অ+

করোনা একটি ভয়ংকর ছোঁয়াচে মহামারী যা এখন বিশ্ববিস্তারিত (pandemic)। মৃত্যুহার ৩-৪ শতাংশের বেশি না কিন্তু আক্রান্ত করার ক্ষমতা খুবই বেশি (high attack rate) । এই রোগের ওষুধ বা টিকা এখনো বাজারে আসেনি। আসবে আসবে করছে। ইতোমধ্যে জনতা নেমে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে ওষুধ বাৎলে দিতে। ওষুধ তালিকার একটি বিশাল অংশ খাদ্য যেমন কালোজিরা, পুদিনা পাতা, থানকুনি পাতা, আদার কোয়া, ইত্যাদি আর বাকি সব অখাদ্য যেমন গরুর গোবর, মূত্র, স্পিরিট, ইত্যাদি ।


রোগীর খাদ্য নির্বাচন একটি প্রায়োগিক বিজ্ঞান (applied science) যাকে আমরা পথ্যবিদ্যা (Dietetics) নামে জানি। পথ্যবিজ্ঞান একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিষয়। রোগীর খাদ্য নির্বাচনে বহুমাত্রিক জ্ঞান ও বিবেচনা প্রয়োগ করা হয় যা এই বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণকারীর পক্ষেই সুচারু ভাবে করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রোগীর খাদ্য বাৎলানোকে এদেশে চিকিৎসকদের এক্তিয়ার ভাবা হয়, উন্নত দেশে যা হয়না। কারণ ঐসব দেশ বিজ্ঞানের ডিসিপ্লিনারি বিভাজনকে মর্যাদা দিয়ে স্ব স্ব ডিসিপ্লিনের চর্চা করে। কেউ কারো ব্যাপারে নাক গলায় না। কিন্তু এদেশ হচ্ছে জ্ঞান জাহিরের দেশ, অন্যের ডিসিপ্লিনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার দেশ। রোগ নিরাময়ে চিকিৎসক, নার্স, পথ্যবিদ, শুশ্রুষাকারী সবার জ্ঞান কাজ করে নেতৃত্বে হয়তো চিকিৎসক থাকেন।


সুস্থ বা অসুস্থ মানুষকে খাদ্য উপদেশ দেবার কতগুলি বৈজ্ঞানিক বিবেচনা আছে। সুস্থ মানুষ সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে চায়। সুতরাং তাদের দেয়া খাদ্য উপদেশ হতে হবে রোগ প্রতিরোধমূলক এবং বলবর্ধক। এক্ষেত্রে খাদ্যের পুষ্টিকণা বাদে অন্য যে উপকারি বা ক্ষতিকর জৈব বা অজৈব উপাদান আছে তা বিশেষ বিবেচনায় আনা হয়। যেমন উপদেশ দেয়া খাবারগুলোতে ক্ষতিকর জৈব অণু ফাইটেট বা অজৈব অণু আর্সেনিক যেন সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি না হয়ে যায়। অন্যদিকে উপকারি খাদ্য উপাদান যেমন এন্টিঅক্সিডেন্ট বা ফাইটোকেমিক্যালস যেন পর্যাপ্ত মাত্রায় পাওয়া যায়। সবকিছুই আবার করা হয় পুষ্টি উপাদানের সুষম ও বৈচিত্রপূর্ণ অবস্থা বজায় রেখে। খাদ্যে পুষ্টিকণা বাদে উপকারি বা অপকারি উপাদানের তালিকা অনেক দীর্ঘ। একজন পথ্যবিদকে (Dietician) এই তালিকার প্রতিটি উপাদানের ফিজিওলজিক্যাল বৈশিষ্ঠ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং বিপাক ভালোভাবে জানতে হয়। নতুবা সঠিক পথ্য নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।


সংক্রামক রোগ (Communicable disease) বাদে মানুষ হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েনা। অন্যদিকে অসংক্রামক রোগ (Non-communicable disease) প্রকাশ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। অসংক্রামক রোগ ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত রোগের এই সুপ্ত অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে রোগশয্যা-পূর্ব অবস্থা (Subclinical condition) এবং মহামারী-সংক্রান্ত বিদ্যায় (Epidemiology) এই অবস্থাকে বলা হয় অস্বাস্থ্য/রোগ (morbidity)। অস্বাস্থ্যের বা রোগের পথে যে মানুষ রয়েছে তা ধরা পড়ে বিভিন্ন ডাক্তারি ও প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষায়। আর অসুখ ধরা পড়লে রোগীর অবস্থাকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় রোগশয্যা অবস্থা (Clinical condition)। ক্লিনিক্যাল এবং সাবক্লিনিক্যাল উভয় অবস্থায় খাদ্য রোগীর জন্য সহায়ক এবং পরিপূরক হতে পারে যদি যথার্থভাবে চয়ন/বাছাই করা হয়। এখানে খাদ্যের ঔষধি গুণের কথা অনেকে বলেন বটে তবে তা কবিরাজরা যে গাছগাছড়া ব্যবহার করেন তার কথা। কবিরাজদের ব্যবহার করা অধিকাংশ গাছগাছড়াই ভেষজ প্রকৃতির এবং খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। আর আমরা দৈনন্দিন যে খাদ্যসামগ্রী খাবার হিসেবে গ্রহণ করি তার প্রধান উদ্দেশ্য পুষ্টিকণা সরবরাহ করা। সন্দেহ নেই যে এই খাদ্যগুলোতে বিভিন্ন ভেষজ গুণসম্পন্ন উপাদান রয়েছে। কিন্তু রোগ নিরাময়ে এরা ওষুধ হিসেবে কাজ করবে এই ধারণা ভুল। বরং রোগ নিরাময়ের পথে এই ভেষজ উপাদানগুলো ওষুধের সহায়ক এবং পরিপূরক হতে পারে মাত্র। এজন্যই “ঔষধপথ্য” কথাটির চলন হয়েছে। তবে খাদ্যের এই ঔষুধি উপাদানের উপকার চোখে পড়বে কেবল সাবক্লিনিক্যাল অবস্থায় অর্থাৎ রোগ হওয়ার পথে যখন খাদ্যের ঔষধি উপাদান রোগের অগ্রগতিকে (progression) বাধাগ্রস্ত। রোগ হয়ে গেলে লাগবে ওষুধ অথবা শল্যচিকিৎসা। খাদ্য এক্ষেত্রে পথ্য হিসেবেই কাজ করে রোগ নিরাময়ে পুষ্টি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে যাতে দেহের শক্তি ও পুষ্টির ঘাটতি যেন না দেখা দেয়। এখানে পথ্যের ভেষজ উপাদান যদি কিছু যোগ করা হয় তবে তা করা হয় দেহের ইম্যিউন সিস্টেমকে চাংগা করার জন্য যাতে রোগ নিরাময় দ্রুত হয়।


এটা প্রায় সবারই অভিজ্ঞতা যে অসুখে পড়লে ওষুধপথ্যের দু’চারটা নয় দশবিশটা উপদেশ পাওয়া যায় সমাজ ও পরিবারের সবার কাছ থেকে। জনতার এই ওষুধ বাৎলানো ভেষজ গাছগাছড়া পর্যন্ত দোষনীয় নয় কিন্তু মুশকিল বাধে খাদ্যের নাম বাৎলালে। দেখা যায় এর অধিকাংশই মসলা ও লতাগুল্ম জাতীয় যা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করা যায় না। আর বেশি বেশি গ্রহণ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।


ফেসবুকে করোনার ওষুধ বাৎলানোর প্রতিযোগিতা চলছে। কান দেবেন না।


লেখক পরিচিতি: অধ্যাপক তোরাব রহিম, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com