বাংলাদেশে কোকো গাছ আবাদের বিশাল সম্ভাবনা
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:৫৪
বাংলাদেশে কোকো গাছ আবাদের বিশাল সম্ভাবনা
বেণুবর্ণা অধিকারী
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশে কোকো গাছ আবাদের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিয়ে এখনো কেউ ভাবছে না।


কোকো বাংলাদেশে অপ্রচলিত অথচ সারাবিশ্বে অর্থকরী ফসল হিসেবে সমাদৃত। প্রতিবছর একটি পূর্ণবয়স্ক কোকো গাছ থেকে ৩৫ কেজি কোকোসিড পাওয়া যায়। প্রক্রিয়াজাত করার পর তা থেকে ৩০ কেজি চকোলেট পাওয়া যায়। প্রতিকেজি বিশুদ্ধ চকোলেট পাউডারের মূল্য ৪০ ডলার। সে হিসেবে প্রতিটি গাছ থেকে প্রতি বছর ১,২০০ ডলার অর্থাৎ ৮৪ হাজার টাকা আয় করা যাবে।


কোকো গাছের চাষ করলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে অনায়াসেই একটা স্থান করে নিতে পারবো। কারণ বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু নিরক্ষীয় ও উপ নিরক্ষীয় ফলচাষের জন্য উপযোগী।


কোকোগাছের জন্য রেইনফরেস্ট সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। চকলেট তৈরির মূল উপাদান কোকো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সারীতে একটা গাছ আছে, ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও জার্মপ্লাজম সেন্টারে আছে আরও ১১টি গাছ। ঢাকার গাছটি বেশ পুরোনো। প্রতিবছর নিভৃতে ফল উপহার দিচ্ছে। তবে ফলটি নিয়ে আমাদের দেশে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি।


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সফিউল্লাহ উপজেলার মধ্য বেতছড়ি এলাকায় নিখিল নিরক্ষীয় ফল উদ্যান নামে ফলদ ও ভেষজ বাগান সৃজন করেছেন। ওই উদ্যানে ১০০ টি কোকো গাছ লাগানো হয়েছে।



প্রফেসর ড. সফিউল্লাহ বলেন, ”সাধারণভাবে বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু নিরক্ষীয় ও উপ নিরক্ষীয় ফলচাষের জন্য উপযোগী। প্রতি বছর ভারত ও পাকিস্তান থেকে দুই লাখ টন কোকো ফল আমদানি করা হয়, যার মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। পাকিস্তানে বছরে উৎপাদিত হয় ১৫ লাখ টন নিরক্ষীয় ও উপনিরক্ষীয় ফল। অথচ পাকিস্তানের মাটি ও জলবায়ু বাংলাদেশের চাইতে নিম্নমানের। আমরা এই ফল চাষ করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে সারাবিশ্বে রপ্তানি করতে পারি অনায়াসেই।”


কোকো্র বৈজ্ঞানিক নাম Theobroma cacao. কোকো চিরসবুজ গাছ, দেখতে ঝোপালো, সাত থেকে আট মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড ও ডালপালার গায়ে গুচ্ছবদ্ধ গোলাপি হলুদ রঙের ফুল ধরে। গাছের বয়স সাধারণত চার বছর হলে ফল ধরতে শুরু করে। ফুল থেকে পরিণত ফল হতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস। ফলের রং বাদামি, ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১০ সেন্টিমিটার পুরু, বাইরের আবরণ চামড়ার মতো শক্ত। প্রতিটি ফলে ২০ থেকে ৪০টিরও বেশি বীজ থাকে। বীজগুলো প্রথমে কলাপাতায় মুড়িয়ে গাঁজানো হয়। পরে রোদে শুকিয়ে সেদ্ধ করে খোসা ছাড়ালেই পরিষ্কার একটি শাঁস পাওয়া যায়। এই শাঁসকে বলা হয় কোকোবিন। কোকোবিনের গুঁড়োই কোকো পণ্য তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। উৎকৃষ্ট মানের চকোলেট, মাখন, আইসক্রিম, রুটি, পুডিং, প্রসাধনসামগ্রী ও পানীয় তৈরিতে কোকো ফল ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হয়।


দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন উপত্যকার এক বিশেষ উদ্ভিদ কোকো, যার বীজ থেকে তৈরি হয় চকলেট। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মধ্য আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশে প্রথম এর চাষ শুরু হয়। এরপর এই বীজ আসে আফ্রিকায়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোকো উৎপাদিত হয় পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয়।


আফ্রিকায় কোকো কীভাবে এল—এর ছোট্ট একটা গল্প আছে। তেতেহ কোয়ারশি নামের এক কামার প্রথম কোকো বীজ নিয়ে আসেন ঘানায়। ১৮৪২ সালে এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন তেতেহ। কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও কৈশোর থেকেই কামারের কাজে আগ্রহ তাঁর। ওই বয়সেই একটা ওয়ার্কশপে কাজ নেন। সেই থেকে কামারের কাজ ছিল তাঁর পেশা আর কৃষিকাজ ছিল তাঁর শখ। ১৮৭০ সালে স্প্যানিশ উপনিবেশ ফার্নান্দো পো (বর্তমানে গিনির বায়োকো) ভ্রমণের জন্য সমুদ্রপথে যাত্রা করেন তেতেহ। প্রায় ছয় বছর পর ১৮৭৬ সালে ঝোলাতে লুকিয়ে বেশ কয়েকটি কোকোর বীজ নিয়ে ঘানায় ফিরে আসেন তিনি। ওই বীজ বাড়িতে এনে রোপণ করেন তেতেহ এবং নতুন ইতিহাসের জন্ম দেন। ব্যাগে করে আনা ওই বীজ গোটা জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিয়েছে। জাতীয় বীর হিসেবে তাঁকে স্মরণ করে আফ্রিকাবাসী।


বিবার্তা/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com