জিনোম সিকোয়েন্সিং: শিশু রোগ নির্ণয়ে ‘বিপ্লব’ আসছে
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৯, ১৪:৪৬
জিনোম সিকোয়েন্সিং: শিশু রোগ নির্ণয়ে ‘বিপ্লব’ আসছে
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

জিনোম সিকোয়েন্সিং বা ডিএনএ-এর ক্রমবিন্যাসের মাধ্যমে বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের রোগ নির্ণয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যাবে বলে জানিয়েছেন ক্যামব্রিজের একদল গবেষক।


সামনের বছর থেকে গুরুতর অসুস্থ ব্রিটিশ শিশু যারা কোন অজানা-রোগে আক্রান্ত, তাদের জিনোম বিশ্লেষণ করা যাবে বলে জানা গেছে।


কিভাবে কাজ করবে?


জিনোম সিকোয়েন্সিং বা ডিএনএ-এর ক্রমবিন্যাস হচ্ছে একজন মানুষের দেহে থাকা তার সকল জেনেটিক কোডকে একের পর এক বিন্যস্ত করা এবং অনুসন্ধান করা যে সেখানে কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য ঘটেছে কিনা।


এডেনব্রুক হাসপাতাল ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রকল্পের আওতায় এই কাজটি করা হচ্ছে।


এই প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় যে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা প্রতি চারজন শিশুর একজন জেনেটিক ডিজ-অর্ডার বা জিনগত-বৈকল্যের শিকার।


এ প্রকল্পে কাজ করার সময় গবেষকেরা দুই তিন সপ্তাহের মধ্যেই জিনোম ক্রমবিন্যাস করে দিতে পেরেছেন এবং তার ভিত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে পরে শিশুর চিকিৎসায় পরিবর্তনও আনা হয়েছে।


জিনোম ক্রমবিন্যাসের ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিশু এবং তাদের বাবা-মা উভয়েরই জিনোম ক্রমবিন্যাস করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই দেখা হয়েছে যে, শিশুর জিনোমে কোথাও কোন ত্রুটি ঘটে গেছে কিনা।


‘দ্রুত অর্থপূর্ণ ফল’


নেক্সট জেনারেশান চিলড্রেন বা পরবর্তী প্রজন্মের শিশু নামের একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় এডনব্রোক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা প্রায় ৩৫০ জন শিশুর জিনোম ক্রমবিন্যাস করা হয়েছে।


প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শিশু মায়ের গর্ভে আসার সময়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জিনগত ত্রুটির বিষয়টি ঘটে গেছে। অর্থাৎ বাবা বা মায়ের এই ত্রুটি থাকার কারণে উত্তরাধিকারসূত্রে শিশুরা জিনগত ত্রুটিটি পায়নি বরং সেটি ছিল একটি স্বয়ংক্রিয় ঘটনা।


কোন ধরণের রোগ নির্ণয় করা যাবে?


যে শিশুদের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে তাদের মধ্যে জন্মগত অস্বাভাবিকতা, স্নায়বিক অসুস্থতা যেমন মৃগীরোগ, হজম সংক্রান্ত সমস্যা ও শরীরের বৃদ্ধি কম হওয়ার মতন রোগী ছিল। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল জেনেটিক্স ও নিউরো ডেভেলপমেন্টের অধ্যাপক লুসি রেমন্ড।


মিজ রেমন্ড বলেছেন, এটি খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো জিনোম ক্রমবিন্যাস করে এখন একটা অর্থপূর্ণ ফল জানিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু আমার চিকিৎসক-জীবনের শুরুতে আমরা একটা সামান্য জিন খুঁজে পেতে বছরের পর বছর লেগে যেতো।


অধ্যাপক রেমন্ড বলেছেন, ২০২০ সাল থেকে পুরো ইংল্যান্ডে জেনোমিক মেডিসিন সার্ভিস চালু হবে। অর্থাৎ কোন শিশুর রোগ ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না এমন কোন রোগ নিয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি হলে তার জন্যে জিনোম ক্রমবিন্যাস সেবা পাওয়া যাবে।


এটি চালু হলে ইংল্যান্ডই হবে পৃথিবীর প্রথম কোন দেশ যেখানে এমন সেবা পাওয়া যাবে।


পরিবারগুলোর জন্য এর মানে কী?


প্রথমত, খুব দ্রুত রোগ নির্ণয়। এটি ঘটেছিল মৃগী রোগে আক্রান্ত দুই বছর বয়সী শিশু মিলি-মেই এর বাবা-মা ক্লেইরি কোল ও ক্রিস ডেলির ক্ষেত্রে।


গত বছর, গুরুতর অবস্থায় মিলি-মেইকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার বাবা-মাকে জিনোম ক্রমবিন্যাসের সুযোগ দেয়া হয়েছিল।


মিলি-মেই এর মা ক্লেইরি বলেছেন, আমার মেয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকতে থাকতেই আমাদেরকে জিনোম ক্রমবিন্যাসের ফলাফল জানানো হয়েছিল। পরে এর ভিত্তিতেই একটি ওষুধে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কারণ সেই ওষুধটি ছিল তার মেয়ের যে ধরণের মৃগীরোগ সেটির জন্য ক্ষতিকর।


ক্লেইরি বলেছেন, ওষুধটা বদলানোর সাথে সাথেই বিরাট একটা পার্থক্য দেখ গেলো।


মিলি-মেই এর বাবা ক্রিস বলেছিলেন, তার মেয়ের যে জিনগত সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়েছে। বাবা-মায়ের থেকে মিলি-মেই'র কাছে এটি পরিবাহিত হয়নি।


অধ্যাপক রেমন্ড বলেন, এখন থেকে বাবা-মায়েদেরকে আর রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরণের বিশেষজ্ঞের কাছে ছোটাছুটি করে একই কাহিনী বারংবার বলতে হবে না। বরং এখন সেই সময়টা তারা শিশুর পরিচর্যায় কাজে লাগাতে পারবেন।


এখন এক হাজার পাউন্ডের চেয়ে কম অর্থে জিনোম ক্রমবিন্যাস করা যায়। এর ফলে রোগ নির্ণয়ের জন্য বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে যে খরচ হয় তা কমে আসবে বলে মনে করছেন অধ্যাপক রেমন্ড।


জিনোম ক্রমবিন্যাসের ফলে পরিবারগুলো আর কী সুবিধা পাবে?


কেটি ও পিকেনের মেয়ে সেরেন কেন মারা গিয়েছিল, তা জানা গিয়েছিল এই জিনোম ক্রমবিন্যাস থেকে। আর এর মাধ্যমেই তারা জানতে পেরেছিলেন যে, তাদের ছেলে রেইস রোগাক্রান্ত হয়নি।


সেরেনের জন্ম ২০১৭ সালে। আপাতদৃষ্টিতে সে সুস্থ-সবলই ছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে মাত্র ১৩ সপ্তাহের মাথায় সে মারা যায়।


সেরেন ও তার বাবা-মায়ের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা ছিল। সেটাই পরে জিনোম ক্রমবিন্যাসের জন্য পাঠানো হয়। পরে, সেখানেই তার জিনগত একটি গুরুতর অসংগতির কথা জানা যায়।


পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কেটি আবারো গর্ভবতী হলে এই দম্পতি এডেনব্রুক হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করে এবং গর্ভজাত সন্তান কোনো ঝুঁকিতে আছে কিনা জানতে চায়। সেরেনের ক্ষেত্রে মা-বাবা দুজনের থেকেই ত্রুটিযুক্ত জিন পরিবাহিত হয়েছিল। কিন্তু জানা যায় যে, কেটির গর্ভজাত সন্তানের কোনো সমস্যা হয়নি। সূত্র: বিবিসি


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

বি-৮, ইউরেকা হোমস, ২/এফ/১, 

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com