ডায়াবেটিক রোগীদের রোজায় পরামর্শ
প্রকাশ : ০৬ মে ২০১৯, ১২:৫৯
ডায়াবেটিক রোগীদের রোজায় পরামর্শ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

যদি চলার পথে ৫ জনকে জিজ্ঞেস করেন যে, ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো কি - সম্ভবত ৩ জনই তার সদুত্তর দিতে পারবেন না। দুঃখজনক হলেও সত্যি চোখের সমস্যা, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা কিডনির সমস্যার মূলে যে ডায়াবেটিস থাকতে পারে এই ধারণাও বেশিরভাগ মানুষের নেই। আর এই অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়েই আরো দ্রুত থাবা বাড়াচ্ছে ডায়াবেটিস। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই রোগটি।


এদিকে, সোমবার চাঁদ দেখা গেলে মঙ্গলবার থেকেই বাংলাদেশে রমজান মাস শুরু হতে যাচ্ছে। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের কাছে অবশ্য পালনীয় রোজা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ডায়াবেটিসের মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও জরুরি।


কারণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ম মেনে ও সময় মতো খাবার খেতে হয়। সেই সঙ্গে দিনের বিভিন্ন সময় তাদের ওষুধ নেয়ার দরকার হতে পারে। ফলে সেহরি এবং ইফতারের মধ্যে দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার প্রভাব পড়তে পারে তাদের শরীরে।


বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লক্ষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী রয়েছে।


রমজান মাসে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির রোজা রাখার ক্ষেত্রে কী করণীয়? এ নিয়ে কিছু পরামর্শ রইলো ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য।


১. রোজার আগেই ডায়াবেটিক পরীক্ষা


অধ্যাপক এ কে আজাদ বলছেন, যাদের ডায়াবেটিক রয়েছে, তাদের রোজার আগেই আরেকবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত যে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিনা।


স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী তাদের রোজা পালন করা উচিত হবে কিনা বা কিভাবে করতে পারবেন, তা নিয়ে চিকিৎসক পরামর্শ দেবেন।


চিকিৎসক ওষুধের ডোজ পরিবর্তন বা সমন্বয় করে দিতে পারেন। সেটা অনুসরণ করে তারা সুস্থভাবে রোজা রাখতে পারেন।


তিনি বলছেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিয়মকানুন মেনে রোজা রাখা যেতে পারে।


২. হাইপোর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি।


দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার ফলে ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের সুগার অতিরিক্ত কমে গিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। তখন প্রচুর ঘাম হয়, বুক ধরফর করে।


চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এরকম পরিস্থিতি দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে শরবত বা মিষ্টি জাতীয় কিছু মুখে দিতে হবে। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য তখনি রোজা ভেঙ্গে ফেলার জন্য তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, না হলে মৃত্যু ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।


এজন্য সবসময়ে সঙ্গে মিষ্টি চকলেট বহন করার পরার্মশ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।


৩. ইনসুলিন ও রক্ত পরীক্ষা


বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলছেন, বাংলাদেশে একটা ভুল ধারণা আছে যে ইনসুলিন নিলে বা রক্ত পরীক্ষা করালে রোজা ভেঙ্গে যায়।


তিনি বলছেন, ‘কয়েক বছর আগে আমরা দাখিল মাদ্রাসার বেশ কয়েকজন আলেমের কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম যে, একজন ডায়াবেটিক রোগী ইনসুলিন নিলে বা শর্করা মাপার জন্য রক্ত পরীক্ষা করলে সেটা রোজা ভঙ্গ হবে কিনা।
‘তারা আমাদের লিখিতভাবে জানিয়েছেন, রোজাদার ব্যক্তি ইনসুলিন নিলে বা ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে সেটা রোজা ভঙ্গ হবে না।’


তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, নিয়ম অনুযায়ী একজন রোজাদার যেমন ইনসুলিন নেবেন, তেমনি শারীরিক কোন দুর্বলতা অনুভব করলে নিজেই রক্ত পরীক্ষা করে তার ডায়াবেটিস মেপে দেখবেন।


সে অনুযায়ী রোজার বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কোনভাবেই যেন হাইপো না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।


রোজা থাকার সময় সকালে এবং বিকালে নিয়মিতভাবে রক্ত পরীক্ষা করে শরীরের সুগারের অবস্থা দেখে নিতে হবে।


রোজার সময় ইনসুলিন কিভাবে সমন্বয় করতে হবে, সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সে অনুযায়ী তিনি সকাল বা বিকালের ইনসুলিনের সময় ও মাত্রা বদলে দিতে পারেন।


৪. সকালের খাবার ইফতারে আর রাতের খাবার সেহরিতে


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. শারমিন রুমি আলীম বলছেন, রোজায় ডায়াবেটিক রোগীদের খাবারের ক্ষেত্রে সহজ পরামর্শ হলো, আপনি সকালে যে খাবারটি খেতেন, সেটা খাবেন সন্ধ্যায় আর রাতে যে খাবারটি খেতেন, সেটা খাবেন সেহরিতে। দুপুরের খাবার রাতে খেতে পারেন।


তিনি বলছেন, আমাদের দেশে ইফতারিতে যে ভাজাপোড়া খাওয়ার চল রয়েছে সেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য একেবারেই ভালো নয়।


সুতরাং সেগুলো না খেয়ে দই চিড়া, রুটি বা সবজি, ১/২ টা খেজুর, ফলমূল খেলে শরীরের জন্য ভালো। সেহরিতে পোলাও-বিরিয়ানির মতো ভারী খাবারের পরিবর্তে জটিল শর্করা জাতীয় স্বাস্থ্যকর ও আশযুক্ত খাবার খাওয়া ভালো।


ভাতের বদলে আটার তৈরি খাবার বা রুটি খেতে পারলে তা শরীরের জন্য ভালো, যেহেতু এটি দীর্ঘসময় নিয়ে হজম হয়ে থাকে। খাবার খেতে হবে সেহরির সময় শেষ হওয়ার কিছু আগে।


৫. চিনির শরবত বাদ দিয়ে ফলের শরবত বা ডাবের পানি


চিনি বা বাজারের বিভিন্ন ধরণের শরবত বাদ দিয়ে বরং ডাবের পানি বা ফলের শরবত ইফতারিতে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা।


সেহরিতে ভারী খাবারের পরিবর্তে যতটা বেশি সম্ভব তরল পান করতে হবে। ইফতারির পর থেকে সেহরি পর্যন্ত যতটা বেশি সম্ভব পানি পান করতে হবে।


যেহেতু এবার গরমের সময় রোজা হচ্ছে, তাই সেহরি ও ইফতারের পর বেশি করে পানি পান করতে হবে। রোজা রাখলে ডায়াবেটিক রোগীদের ব্যায়ামের রুটিনে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।


৬. ব্যায়াম


যেসকল ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত ব্যায়াম করে থাকেন, রোজার রাখার সময় তাদের নিয়মের কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে।


যেহেতু অন্যান্য সময় ব্যায়ামের পরে তারা খাবার বা পানি খেয়ে থাকেন, কিন্তু রোজার সময় সেটি সম্ভব হয় না, ফলে শরীরে শর্করার মাত্রা অনেক কমে যেতে পারে।


চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, সন্ধ্যার পর অথবা সেহরির আগে হাটাহাটি বা ব্যায়াম করতে পারেন রোজাদার ডায়াবেটিক রোগীরা।


গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে বর্তমানে ৪২ কোটিরও বেশি মানুষের ডায়াবেটিস আছে আর ২০৪০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে হবে ৬৪ কোটিরও বেশি। আর বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (২০১১) অনুসারে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের হার মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ১১ ভাগেরও বেশি। এছাড়া এই জরিপে আরও দেখা গেছে যে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মাত্র ৪১ শতাংশ তাদের এই রোগের ব্যাপারে জানতেন। বাকিরা হয় জানেন না বা এই নিয়ে কোনও ধারণাই রাখেন না।


শতকরা ৬০ ভাগ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের হাত থেকে বাঁচা যায়। এর মূলমন্ত্র হলো হিসেব করে খাওয়া আর নিজেকে ফিট রাখা। প্রতিদিন ৩০ মিনিটের বেশি হাঁটুন, আপনার ঝুঁকি কমে যাবে অনেকাংশেই। জেনে অবাক হবেন যে শুধুমাত্র নিজেকে ফিট রাখতে পারলেই আপনার পরিবারের কারও ডায়াবেটিস থাকলেও আপনার নাও হতে পারে। স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন আপনাকে রাখতে পারে ডায়াবেটিস মুক্ত। সূত্র: বিবিসি


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

বি-৮, ইউরেকা হোমস, ২/এফ/১, 

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com