বকশিস বাণিজ্যে জিম্মি মিটফোর্ডের রোগীরা!
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০:৩২
বকশিস বাণিজ্যে জিম্মি মিটফোর্ডের রোগীরা!
সৌখিন আদনান
প্রিন্ট অ-অ+

`উনাদের তো বখশিসের শেষ নাই। ৩ দিন ধরে আমাদের কাছে কোনো আয়া আসেন না। অথচ ৬ দিন ধরে আমার স্বামী হাসপাতালে ভর্তি। কারণ একটাই বখশিসের টাকা। এ টাকা দিতে দিতে ওষুধ বা খাবার কেনার টাকাই হাতে নেই আমাদের।’


আক্ষেপ নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফরিদপুর থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা সোলাইমান তালুকদারের স্ত্রী জাবেদা আক্তার।


স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল গুরুত্বের দিক দিয়ে ঢাকা মেডিকেলের পরই এর অবস্থান। পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের মানুষের জন্য চিকিৎসার ভরসার জায়গা এ মিটফোর্ড। তবে এ ভরসার জায়গা আর রোগীদের সেবা পাওয়ার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি বিশেষ সিন্ডিকেট। এদের মধ্যে রয়েছে আয়া, ওয়ার্ডবয়সহ দালাল শ্রেণির একদল মানুষ। তাদের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনরা।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ হাসপাতালে প্রতি শিফটে ডিউটিতে আসা আয়া বা ওয়ার্ডবয় রোগীদের কাছ অর্থ দাবি করছেন, যা বখশিস নামে পরিচিত। চাহিদামতো অর্থ না দিলেই রোগী ও স্বজনদের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়।


কেরানীগঞ্জ থেকে আসা তারেক পা ভাঙার কারণে তার ভাইসহ হাসপাতালে ১৭ দিন ধরে ভর্তি।


তারেকের ভাই রফিকুল জানান, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বলেছেন ৫ দিন পর পর ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করে পুনরায় ব্যান্ডেজ করতে। কিন্তু কোনো আয়া বা ওয়ার্ডবয় সেটা করছেন না। প্রথমবার ৬ দিনের মাথায় ড্রেসিং করা হয়। কিন্তু পরেরবার দুজন ওয়ার্ডবয় এসে ১ হাজার টাকা দাবি করে ব্যান্ডেজ কেনার জন্য। কিন্তু আমার জানা মতে, এসব তো হাসপাতাল থেকেই দেয়। আমি ৫০০ টাকা দিতে চাইলেও তারা সেটা না নিয়ে ড্রেসিং না করে চলে যান। এরপর তাদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু ডাক্তারকে ঈদের পর আর পাইনি।


এদিকে বকশিস বাণিজ্যের কারণ অনুসন্ধানে উঠে আসে নতুন তথ্য। আর তা হলো- আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ করা কোম্পানি প্রতি মাসে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেয় ২ হাজার টাকা করে। এ টাকা রোগীদের কাছ থেকে আদায় করতে তারা বকশিস নেন বলে জানিয়েছেন।



নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয় ও আয়া বিবার্তাকে বলেন, তাদের নিয়োগ করা কোম্পানি ধলেশ্বরী সিকিউরিটি প্রতিমাসে বেতন থেকে ২ হাজার টাকা করে কেটে নেয়। তারা বেতন বইয়ে রেভিনিউ স্ট্যাম্পের ওপর সাড়ে ১৫ হাজার টাকার স্বাক্ষর নিয়ে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা ক্যাশ দেন। তাছাড়া ওয়ার্ড মাস্টারদের ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। এজন্য রোগীর কাছ থেকে দুই চারশ টাকা বকশিস নেন বলে জানান তারা।


সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়া, ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্নকর্মী সংকট দেখা দেয়ায় ২০১৮ সালে সরকার আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে ২০০ জন নতুন কর্মী ওইসব পদে নিয়োগ দিতে ধলেশ্বরী সিকিউরিটি নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়।


শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ ও হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে একটি সিন্ডিকেট গঠন করে অর্থের বিনিময়ে লোকবল নিয়োগ দিতে শুরু করে। প্রতি নিয়োগপ্রত্যাশীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে চক্রটি।


পরিচয় না দেয়া এবং ছবি না তোলার শর্তে এক আয়া বিবার্তাকে জানান, এ প্রক্রিয়াটি পুরো সমন্বয় করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির নেতারা। প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন নিজ রুমে ডেকে নিয়ে কর্মচারীদের বেতন বইয়ে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। কোনো কর্মচারী প্রতিবাদ করলেই তাকে ছাঁটাইসহ মাসিক বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি নানাভাবে হুমকিও দেন কর্মচারী কিছু নেতা ও তার লোকজন।



লোকবল সরবরাহকারী আউট সোর্সিং প্রতিষ্ঠান ধলেশ্বরী সিকিউরিটির মালিক আতিকুল ইসলামের ফোন নম্বর চাইলে কারো কাছেই তার ফোন নম্বর নেই বলে এড়িয়ে যান বেশিরভাগ কর্মচারী।


চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির হুমায়ন নামের এক নেতা বিবার্তাকে বলেন, কোম্পানি কাজটি নিতে অনেক টাকা খরচ করেছে। তাছাড়া প্রতি মাসে ঊর্ধ্বতন মহলকে খুশি করতে হয়। তাই কর্মচারীদের কাছ থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ করে খরচ পুষিয়ে নেয়া হয়। সমিতিতে তার পদবি জানতে চাইলে তিনি তা বলেননি।


হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন বিবার্তাকে বলেন, আমার সামনে প্রতিজন কর্মচারী বেতন বইয়ে স্বাক্ষর করে নিজ বেতন বুঝে নিচ্ছেন। এখানে দুই হাজার টাকা করে কেটে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কর্মচারীরা দেখেশুনেই স্বাক্ষর করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।


মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান বঙ্কিম হালদারের কাছে এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আমরা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব অভিযোগ এর আগে আমি কোনোদিন পাইনি। তবে বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।


বিবার্তা/আদনান/উজ্জ্বল/রবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com