এদেশে কেউ অন্যায় স্বীকার করে না, ক্ষমাও চায় না
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০১৮, ১৩:১৫
এদেশে কেউ অন্যায় স্বীকার করে না, ক্ষমাও চায় না
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

তখন নেদারল্যান্ডসে থাকি।


এক ভদ্রলোক রাস্তা পার হচ্ছিলো, হঠাৎ একটা গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কাটা খুব জোরে লাগেনি। ভদ্রলোক রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাতে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। আমি দৌড়ে যাবো, এই মুহূর্তে দেখি গাড়ি যে চালাচ্ছিল, সে গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা ভদ্রলোককে উঠানোর চেষ্টা করছে এবং আশপাশের মানুষজনদের ডাকছেন সাহায্যের জন্য।


আমি দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করলাম। দেখি ওরা ওদের ভাষায় কথা বলছে। যতটুকু বুঝতে পারলাম তাতে মনে হলো গাড়ির চালক পড়ে থাকা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করছে


-তুমি ঠিক আছো তো?
-হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।
-একদম চিন্তা করো না, আমি ইমারজেন্সিতে ফোন করেছি। ওরা এক্ষুনি চলে আসবে। আমি খুবই দুঃখিত এভাবে এক্সিডেন্টটা ঘটে যাবার জন্য।


অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, যে ভদ্রলোক রাস্তায় পড়ে আছেন, তিনি অতি চমৎকারভাবে বলছেন


-না না, আমি ঠিক আছি। আমারও উচিত ছিল আরেকটু দেখে পার হওয়া।


কারণ ওই ভদ্রলোক নিজেই জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছিলেন না। দোষ তার নিজেরও ছিল। চালক ভদ্রলোক চাইলেই তাকে রাস্তায় ফেলে চলে যেতে পারতেন কিংবা তার হাসপাতালে যাবার দরকার ছিল না।


এর কিছুক্ষণ পর ইমারজেন্সির লোকজন এসে ভদ্রলোককে নিয়ে গিয়েছে। গাড়ির চালকও সঙ্গে গিয়েছিল নিজের গাড়ি অন্য এক জায়গায় পার্ক করে।


নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র চট্রগ্রাম থেকে ঢাকা ফেরার পথে বাথরুমে যাবে বলে যানজটে আটকে থাকা বাস থেকে নেমেছিলো। বাস তাকে ছেড়ে এগুতে থাকলে ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠার সময় নাকে মুখে আঘাত পায়।


তার রক্তাক্ত চেহারা দেখে হানিফ পরিবহনের বাসের চালক, সহকারী ও সুপারভাইজার তাকে চিকিৎসা বা কোন রকম সেবা না দিয়ে উল্টো তাকে সেতু থেকে নদীতে ফেলে দেয়! অথচ ছেলেটা তখনো বেঁচে ছিল। তাকে চিকিৎসা সেবা দিলে সে হয়ত বেঁচেই যেত।


এখন দেখছি সবাই এই নিয়ে চালক আর সুপারভাইজারের ইচ্ছেমতো সমালোচনা করছে। সমালোচনা করাই উচিত। তবে এই সমালোচনা কি কেবল এই চালক আর সুপারভাইজারেরই প্রাপ্য?


এই চালক আর সুপারভাইজার কেন তাকে কোন রকম সেবা না দিয়ে উল্টো নদীতে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলল?


কারণ তারা এই ছেলের দুর্ঘটনার দায় নিতে চাইছিল না! এই দেশে কেউ কোন কিছুর দায় দিতে চায় না। উল্টো সাফাই গায়! কেউ কোন অন্যায় করে ক্ষমা চায় না। উল্টো অন্যায়ের সাফাই গায়।


আর কেউ যদি ক্ষমা চেয়েও বসে, অন্যরা সেটা নিয়েও হাসাহাসি করে।


এই দেশে হরতাল দিয়ে বোমা মেরে কিংবা গ্রেনেড হামলা করে মানুষ মেরে ফেলে বলা হয় - এটা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কেউ বলে না- এটা অন্যায় হয়ে গিয়েছে, এটা করা উচিত হয়নি!


এই দেশে কয়লা খনি থেকে কয়লা গায়েব হয়ে যাবার পর কিংবা ব্যাংক থেকে টাকা গায়েব হয়ে যাবার পর লোকজন বলে বসে- এইসব তেমন কিছু না! এই নিয়ে এতো মাতামাতির কি আছে! কেউ বলে না- এটা অন্যায় হয়েছে। আমরা এই জন্য ক্ষমা চাইছি!


তো, ওই বাস চালক আর সুপারভাইজার তাদের বাসের ধাক্কায় যে ছেলেটা আহত হয়েছিল, তাকে যে চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো ফেলে দিয়েছে, এর কারণও আসলে অনেকটা তাই! কারণ তারাও তাদের অন্যায়ের দায় নিতে চায়নি!


অথচ তাদের উচিত ছিল ছেলেটাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা। এরপর ছেলেটা আর তার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। জগতের অন্য যে কেন দেশে হলে এমনটাই হতো।


তবে দেশটা বাংলাদেশ বলে কথা। এই দেশে কেউ অন্যায় করে স্বীকার করে না, ক্ষমা চায় না। উল্টো সাফাই গায়। আর সেই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়ার জন্য দলে দলে লোকও জুটে যায়।


তো ওই বাস চালক আর সুপারভাইজারকে দোষ দিয়ে আর লাভ কি! আমরা অতি শিক্ষিত, সভ্য মানুষজন দেশে যেই সংস্কৃতি চালু করে রেখেছি, যা প্র্যাকটিস করছি; বাস চালক আর সুপারভাইজাররা তো সেটাই ফলো করছে!


গাছের গোড়াই যদি ঠিক না থাকে, আগাছা পরিস্কার করে কি কোন ফায়দা হবে? গাছ তো একটা সময় ধপাস করে পড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক!


আমিনুল ইসলামের ফেসবুক থেকে...


বিবার্তা/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com