৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্বর্ণের দাম
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২০, ১২:৫৬
৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্বর্ণের দাম
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা স্বর্ণের দামেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়ে সোমবার (২০ জুলাই) ইতিহাসে দ্বিতীয়বার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৮২০ ডলার স্পর্শ করে। এর মাধ্যমে ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বর্ণের দাম।


করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে কয়েক মাস ধরেই বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ কিনে মজুত করছেন। এর মধ্যেই করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা নিয়ে চীনের কঠোর সমালোচনা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে স্বর্ণের দাম।


সোমবার লেনদেনের এক পর্যায়ে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৮২০ ডলারে উঠে যায়। এর মাধ্যমে প্রায় নয় বছর বা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৮২০ ডলার স্পর্শ করল। যদিও দিনের লেনদেন শেষে তা ১৮১৮ ডলারে থিতু হয়।


করোনা মহামারির কারণে চলতি বছরের শুরু থেকেই স্বর্ণের দাম বাড়তে শুরু করে। গত বছরের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ১৪৫৪ ডলার। এরপর করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬০ ডলারে উঠে যায়। তবে মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন হয়। এক ধাক্কায় দাম কমে প্রতি আউন্স ১৪৬৯ ডলারে নেমে আসে।


মার্চে দরপতন হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় নেয়নি। হু হু করে দাম বেড়ে মে মাসে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৭৪৮ ডলারে উঠে যায়। জুন মাসজুড়ে স্বর্ণের দাম ১৮শ ডলারের আশপাশে ঘুরপাক খায়। চলতি মাসের প্রথম অর্ধেকেও প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৭৯০ থেকে ১৮১০ ডলারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে সম্প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা স্বর্ণের দামের পালে নতুন করে হাওয়া লাগিয়েছে।


কিছুদিন আগে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের একটা অংশ বন্ধ করে দেয় প্যারাসেল দ্বীপের চারপাশের সমুদ্রে নৌবাহিনীর মহড়া চালানোর জন্য। এতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলে, চীন বিতর্কিত ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়াতে পারে এমন কর্মকাণ্ড না চালানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় তার নৌশক্তির প্রদর্শন আরও জোরদার করে আরও রণতরী সেখানে মোতায়েন করে, যা চীনকে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ করে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল খুবই স্পষ্ট।


মার্কিন নৌবাহিনী ওই এলাকায় তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করায় দক্ষিণ চীন সাগরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে বৈরিতা দ্রুত বেড়েছে এবং একটা কিছু ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


চীন ও ভারতের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্তে সম্প্রতি যে প্রাণঘাতী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, হংকংয়ে যেভাবে চীন জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করেছে, তাতে অনেকেই মনে করছেন দক্ষিণ চীন সাগরে কোনোরকম হুমকি দেখা দিলে তা মোকাবিলায় চীন হয়তো সংযত আচরণ না-ও দেখাতে পারে।


দক্ষিণ চীন সাগর গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল পথ। তবে বহু বছর ধরে এই সাগরের ছোট ছোট অসংখ্য দ্বীপ, যার অনেকগুলোই প্রবাল দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর এবং দ্বীপগুলোর সম্পদের মালিকানা দাবি করে আসছে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ এবং অনেকদিন ধরেই এই সাগর ওই অঞ্চলে একটা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এই এলাকায় তাদের মালিকানার দাবি নিয়ে ক্রমশ আরও বেশি সোচ্চার হয়ে উঠেছে। দেশটি দাবি করছে, বিতর্কিত এই এলাকাটি কয়েক শতাব্দী ধরে চীনের অংশ এবং চীন তাদের দাবির সমর্থনে সেখানে সামরিক উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে আরও জোরদার করেছে।


যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যাডমিরাল হ্যারি হ্যারিস একসময় এটাকে উল্লেখ করেছিলেন ‘বালুর সুবিশাল প্রাচীর’ হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, চীনের ঐতিহাসিক প্রাচীর- গ্রেট ওয়াল যেমন চীনা ভূখণ্ডকে সুরিক্ষত রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, তেমনি সাগরে ওই এলাকাকে সুরক্ষিত করতে চীন জায়গাটি ঘিরে তৈরি করেছে ‘বালুর প্রাচীর’।


দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীক্ষ্ম বাদানুবাদ হলেও দুই দেশ এই বিরোধপূর্ণ এলাকা নিয়ে তাদের মতভেদ এতদিন পর্যন্ত এক অর্থে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংঘাতের মধ্যেও ওই এলাকার মালিকানা নিয়ে আঞ্চলিক বিবাদে কোনো পক্ষ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তারা শুধু ওই অঞ্চলে তাদের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা দাবি করে এসেছে। তবে করোনা প্রাদুর্ভাব চীন প্রথমদিকে কীভাবে মোকাবিলা করেছে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে। সবমিলিয়ে দুই শক্তিধর দেশের মধ্যকার উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ চীন সাগরেও।


এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ জুন বাংলাদেশে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। সাধারণত ভরিতে এক-দেড় হাজার টাকা করে বাড়ানো হলেও এবার এক লাফে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার ৭১৫ টাকা বাড়ানো হয়। অবশ্য দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে ২০ ডলারের ওপরে বেড়েছে।


গত ২৩ জুন থেকে দেশের বাজারে কার্যকর হওয়া নতুন দাম অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার ৭১৫ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯ হাজার ৮৬৭ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম চার হাজার ৯০০ টাকা বাড়িয়ে ৬৬ হাজার ৭১৮ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এক হাজার ১৬৭ টাকা বাড়িয়ে ৫৭ হাজার ৯৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে স্বর্ণের দাম তিন হাজার ৬১৬ টাকা বাড়িয়ে ৪৭ হাজার ৬৪৭ টাকা।


স্বর্ণের এই দাম বাড়ানো সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান ও সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বরাত দিয়ে বলা হয়, কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে স্বর্ণের মূল্য সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ফলে দেশীয় বুলিয়ন মার্কেটে স্বর্ণের মূল্য অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে বাজুস কার্যনির্বাহী কমিটি আজ সন্ধ্যায় (২২ জুন) টেলি-কনফারেন্সে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৩ জুন থেকে দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।


এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, যখন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তখন মেটালের দাম বাড়ে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ স্বর্ণ কিনে মজুত করে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাসের প্রেক্ষিতেও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ কয়েক মাস ধরে স্বর্ণ কিনে মজুত করছেন। যার ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে চীনা ও আমেরিকার মধ্যে একপ্রকার বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এটিও স্বর্ণের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।


তিনি বলেন, যতটুকু শোনা যাচ্ছে এখন বেশিরভাগ স্বর্ণের খনি চীনের দখলে। স্বর্ণের বাজার এখন একচেটিয়া চীনের দখলে। ধারণা করা হচ্ছিল প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৮শ ডলারের আশপাশে থাকবে। কিন্তু ইতোমধ্যে স্বর্ণের দাম ১৮শ ডলারের বেঞ্চ মার্ক পার হয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম এবার কোথায় গিয়ে ঠেকবে বলা মুশকিল।


ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, বিশ্ববাজারে যেভাবে স্বর্ণের দাম বাড়ছে তাতে শিগগির দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। স্বর্ণের দামের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, ব্যবসায়ীদেরও নিয়ন্ত্রণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজার যেভাবে চলবে, সেইভাবে চলতে হবে। আপনি ইচ্ছা করলেই এটা দাম কমিয়ে বিক্রি করতে পারবেন না। দাম কমিয়ে বিক্রি করলে একদিনে সব শেষ হয়ে যাবে। কীভাবে, কে, কোথায় নিয়ে যাবে আপনি টেরও পাবেন না।


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com