স্টেশনারি পণ্যকে নতুন উচ্চতায় নিতে চান তনিমা আফরোজ
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৯, ১৯:৩০
স্টেশনারি পণ্যকে নতুন উচ্চতায় নিতে চান তনিমা আফরোজ
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

তিনি পড়ালেখা করেছেন একাউন্টিংয়ে। উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্য পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। কয়েক বছর সেই দেশে মোটা অংকের বেতনে চাকরিও করেছেন। দেশে এসে চাইলেই ভালো কোনো চাকরিতে ঢুকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি প্রথাগত পথে হাঁটতে চাননি। নিজের থেকে কিছু একটা করতে চেয়েছেন। চেয়েছেন নিজের স্বপ্নকে একটু একটু সাজাতে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃঢ় মনোবল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে। আজ তিনি দেশের নতুন উদ্যোক্তাদের একজন অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন। তার নাম তনিমা আফরোজ।



স্বপ্নের ব্যবসার পুরো পরিকল্পনাটা অস্ট্রেলিয়াতে বসেই করেছিলেন তনিমা। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু করে সেটি বাস্তবায়নের রূপরেখা আঁকতেন। দোকানের নাম কী হবে, কোথা থেকে কী কিনবেন, ব্যবসার কৌশল কি হবে, কাগজে-কলমে সব সাজিয়েছিলেন তিনি।


তাই দেশে ফিরে সেই পরিকল্পনা অনুসারে শুরু করলেন তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। গতানুগতিক ব্যবসাধারার বাইরে গিয়ে তিনি স্টেশনারি আইটেমের একটা ব্র্যান্ড তৈরি শুরু করেন। নানা ধরণের স্টেশনারি আইটেম নিয়ে ‘গার্নার থিউরি লিমিটেড’ নামে তিনি শুরু করেন নিজের উদ্যোগ।


তখনো কিন্তু পৃথিবীতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি এতটা জোর দেয়া হয়নি। কিন্তু তনিমা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন যত পড়ালেখাই করেন না কেন, তিনি চাকরি করবেন না। হবেন ব্যবসায়ী।



আত্মপ্রত্যয়ী তনিমা লক্ষ্যে ছিলেন অটুট। তাই ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) থেকে স্নাতক শেষ করে ২০১২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফিন্যান্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে একটি পেশাগত কোর্স করেছেন তিনি।


অস্ট্রেলিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান টেকনিক্যাল অ্যান্ড ফারদার এডুকেশনে (টেফ) চাকরি করেছেন দুই বছর। কিন্তু ব্যবসার ‘ভূত’ তার মাথা থেকে নামেনি। গত বছর দেশে ফিরে তিনি একটি স্টেশনারির দোকান দিয়েছেন।



দোকানটি রাজধানীর লালমাটিয়া মহিলা কলেজের কাছেই অবস্থিত। পেনসিল, কলম, নানা ধরন ও রঙের কাগজ, বাচ্চাদের টুকিটাকি খেলনা থেকে স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যায় এই দোকানে!


মাগুরা গভ. গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন তনিমা। বাবা ইস্কান্দার মির্জা ও মা শামীম আফরোজ দুজনই পেশায় ব্যবসায়ী।


বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই নিজেকে ব্যবসার জন্য সেভাবে প্রস্তুত করেছেন তনিমা। ক্লাসে বিভিন্ন গ্রুপওয়ার্কের জন্য যখন দল গঠন করতে হতো, তখন থেকেই একটি দলের সঙ্গে কীভাবে মিলেমিশে কাজ করতে হয়, সেই চর্চা করতেন তিনি। মাথায় থাকত-ব্যবসা করতে হলে তো আমাকে একদল মানুষের সঙ্গে কাজ করতেই হবে।


তনিমার ভাষ্য, ইউনিভার্সিটির গ্রুপওয়ার্কগুলোতে দেখা যায়, দলের সবাই কাজ করে না। দু-একজন পুরো দায়িত্ব নিয়ে নেয়। আমি চেষ্টা করতাম, সবার কাছ থেকে তার কাজটা আদায় করে নিতে। এখন ছোটখাটো একটা দলের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করতে হচ্ছে তাকে। গার্নার থিওরি লিমিটেডের পরিচালনার টিমে কাজ করছেন ছয়জন কর্মী।


হাজারো ব্যবসা থাকতে স্টেশনারির দোকান করার আইডিয়া মাথায় এলো কিভাবে জানতে চাইলে তনিমা জানালেন, ব্যবসার মধ্যে স্বচ্ছন্দ আছে, স্বাধীনতা আছে, নতুন কিছু করার সুযোগ আছে। সেই ধারণা থেকেই মাথায় এসেছে এই ভিন্নধর্মী ব্যবসার বুদ্ধি।



তনিমা মনে করেন, প্রত্যেকটা ব্যবসার শুরুতে পদে পদে নানান ঝুঁকি রয়েছে। তবে ব্যবসার এই ঝুঁকির মধ্যে আছে একটা অন্যরকম আনন্দ। চাকরি করলে অন্যের অধীনে থেকে কাজ করতে হয়। কিন্তু উদ্যোক্তারা নিজের ব্যবসায় ইচ্ছা মতো কাজ করতে পারেন। ব্যবসার মধ্যে আছে অবাধ স্বাধীনতা। আর তিনি চেয়েছেন স্টেশনারি আইটেমের দোকানকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে।


খেয়াল করে দেখবেন, দোকানে গিয়ে আমরা বলি, একটা পেনসিল দিন তো। খুব কম মানুষই বলেন, আমাকে অমুক পেনসিলটা দিন। কিংবা তমুক কলমটা দিন। আমি কলম-পেনসিল কেনার ক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে ‘ব্র্যান্ড’–এর ধারণা তৈরি করতে চাই। মানুষ যেন তার শখের জিনিসটা খুঁজে নেয়। বললেন তনিমা।


তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে স্টেশনারির একটা বড় বাজার আছে। কিন্তু এর তেমন ব্র্যান্ড নেই। সেই জায়গাটায় কাজ করতে চান উদ্যোমী এই উদ্যোক্তা। এইসব পণ্যের মধ্যে একটা ব্র্যান্ড ভ্যালু অ্যাড করতে এবং কাস্টমারদের হাতে মান-সম্পন্ন উপকরণ তুলে দিতে চান।


অনেকেই শখ করে একটু অন্য রকম খাতা-কলম-পেনসিল কিনতে চান। শখের জিনিসগুলো এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন তনিমা। স্থাপত্যের শিক্ষার্থী বা যারা কারুশিল্পে আগ্রহী, তাদের হাতেও মানসম্পন্ন উপকরণ তুলে দিতে চান তিনি।


একজন ক্রেতা যেন শুধু পণ্য নয়, সেবাও পান-সেটি নিশ্চিত করতে চান তনিমা। একদিনের ঘটনা বললেন তিনি, পাশের একটি স্কুল থেকে কয়েকজন শিক্ষক এসেছিলেন কিছুদিন আগে। শুরুতে দোকানে পা রেখে তারা একটু বিরক্ত ছিলেন। বলছিলেন, এত দাম কেন, এটা কেন, সেটা কেন? আমি গিয়ে তাদের সাথে কথা বললাম। বললাম আপা, আপনারা কফি খাবেন? কথা বলতে বলতে সম্পর্কটা সহজ হয়ে গেল। চলে যাওয়ার সময় তারা খুব খুশি ছিলেন। বললেন, আবার আসবেন। ক্রেতাদের এই আনন্দই তনিমাকে প্রেরণা দেয়।


শুধু যে প্রেরণা আর আনন্দই পাওয়া হচ্ছে, তা নয়, ব্যবসা করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের ঝুঁকির মুখোমুখিও হতে হচ্ছে তাকে। কি ছিল সেই ঝুঁকি?


একজন উদ্যোক্তার বিজনেস প্ল্যানের পরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার আর্থিক বিনিয়োগ। তনিমার ব্যবসায় একমাত্র বিনিয়োগকারী ছিলেন তার মা-বাবা। কেমন করে পুরো বিজনেসের আইডিয়াটা তাদের বোঝালেন?



তনিমা বলেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে ফোন করে আমার আইডিয়ার কথা তাদের বলেছিলাম। বলেছিলাম, দেখো, তোমাদের এই বিনিয়োগ কোনো দিন নষ্ট হবে না। তোমরা যাকে টাকাটা দিচ্ছ, সে একদিন কোটিপতি হবে।


নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি তার ভাষ্য, অনেক তরুণ-তরুণী বলেন, উদ্যোক্তা হতে চাই। কিন্তু মা-বাবা রাজি নন। আমি মনে করি মা-বাবাকে রাজি করানোই একজন উদ্যোক্তার প্রথম ঝুঁকি। আমি যদি ঘরের মানুষকে বোঝাতে না পারি, তাহলে বড় বড় বিনিয়োগকারীকে বোঝাব কি করে?


ব্যবসায়ী মা-বাবাকে তার উদ্যোগ সম্পর্কে বোঝাতে অবশ্য তনিমাকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। তাকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনেরা মা-বাবাকে নানা কিছু বলেছেন। মেয়েকে একা একা বিদেশে পাঠালে কেন? বিদেশে গেলই যখন, ফিরে এল কেন? বিয়ে দিচ্ছ না কেন? কি সব ব্যবসা করছে, কিছু বলছ না কেন? মানুষের নানা কথার তোয়াক্কা না করে তনিমার মা-বাবা মেয়ের উপর আস্থা রেখেছেন।


মা-বাবার পাশাপাশি একদিন ব্যবসার মধ্য দিয়ে সারা দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে চান তনিমা। তিনি চান মানসম্পন্ন স্টেশনারি পণ্যের জন্য লোকে গার্নারের ঠিকানা খুঁজে নিক। শিগগিরই অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। অবশ্য শুরু থেকেই ফেসবুকে দোকানের আইটেমগুলো নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেটওয়ার্ক বড় করছেন, নতুন নতুন পণ্য যোগ করছেন।


তনিমা আফরোজ এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য ‘চাকরি খুঁজবো না, চাকরি দেব’ গ্রুপের পক্ষ থেকে গত ২৮ জুন ‘নবীন উদ্যোক্তা স্মারক ২০১৮’ দেয়া হয়।


স্টেশনারি দোকানের ভেতর যতরকম নতুনত্ব আনা দরকার তা আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তনিমা। দোকানের ভেতর চমৎকার রুচি এবং পরিমিতিবোধের ছোঁয়া লক্ষ্য করা যায়। পণ্যতেও আনতে চাইছেন বৈচিত্র্য। ব্যানারে চমৎকার একটি ট্যাগলাইনও রেখেছেন- ‘Think stationary, think us!’


তিনি দোকানে মূলত শিক্ষামূলক পণ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তার প্রত্যাশা, শিক্ষামূলক সকল পণ্যের সূতিকাগার হয়ে উঠবে তার স্বপ্নের দোকানটি।


গার্নার থিওরি নিয়ে তনিমার স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া। তনিমা বলেন, আমি চাই আগামী ১০ বছরে সারা দেশে গার্নারের প্রায় ২০০ শাখা গড়ে উঠুক। ভালো মানের পণ্যের জন্য মানুষ যেন খোঁজে গার্নারকে।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com