শহুরে কৃষক কাকলি খানের স্বপ্নযাত্রা
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৬:০০
শহুরে কৃষক কাকলি খানের স্বপ্নযাত্রা
শহুরে কৃষক কাকলি খান।
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

প্রত্যেকজন মানুষের জীবনেই আলাদা করে লড়াই থাকে। কারো ভাল রেজাল্ট করার, কারো ভাল ক্যারিয়ার গড়ার, কারো উদ্যোক্তা হওয়ার। আবার কারো ভাল চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।


গৃহিণী কাকলি খানের লাড়াইটা ছিল রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে। এ লড়াইয়ে তিনি আজ জয়ী হয়েছেন। ‘শুদ্ধ কৃষি’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তাকে এখন বলা হয় শহুরে কৃষক। অনেকে আবার ডাকেন ‘শুদ্ধ আপা’ বলে। কেন তার নাম দেয়া হলো ‘শহুরে কৃষক’ বা ‘শুদ্ধ আপা’? গল্পটা জানতে হলে যেতে হবে আরো অনেক পেছনে।


প্রায় আটবছর আগের কথা। কিডনির রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যান কাকলির ফুপু। চিকিৎসকের কাছে জানতে পারেন বিভিন্ন শাক-সবজি ফল-মূলে ক্ষতিকর কীটনাশক, সার, পাকানো বা সংরক্ষণের জন্য দেয়া কেমিক্যালের প্রভাবে আমরা প্রতিনিয়ত যেন বিষ খাচ্ছি। আর এই বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান মেশানো ভেজাল খাবার খাওয়ার ফলে ফুফুর শরীরে কিডনি রোগসহ নানান জটিলতা দেখা দেয়ার কারণে তিনি মারা যান। বিষয়টা কাকলিকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে।


ভেজাল খাবারের এই দুরবস্থা থেকে মানুষকে কী করে রক্ষা করা যায়? মাথায় নতুন একটা আইডিয়া আসে তার। রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ভেজাল খাবারের ভিড়ে নিরাপদ খাদ্যের যোগান দেয়ার পরিকল্পনা করেন কাকলি। কিন্তু উদ্যোগের শুরুটা করবেন কীভাবে? কোথায় পাবেন প্রাকৃতিক জৈব সার দিয়ে উৎপাদন করা নির্ভেজাল খাদ্য পণ্য?


কুষ্টিয়ার গ্রামের পরিবেশে বেড়ে উঠা কাকলির ছোটবেলা থেকেই কৃষকের শাক-সবজি, ফল-মূল, শস্য উৎপাদন করা দেখে দেখে বড় হয়েছেন। এখন বাবা-মা, ভাই, স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন রাজধানীতে। তিনি ভাল করেই জানতেন ঢাকায় থেকে তার এই পাগলামিতে কেউ সাপোর্ট করবেন না। পরিবারের সদস্যরা এতে বিরক্ত হবেন। লড়াইটা তার একাই করতে হবে। তাই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রচণ্ড আগ্রহ, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে কাজটা শুরু করেন।



নিজের খামারে কাজ করছেন কাকলি।


শুদ্ধ কৃষি উদ্যোগের একেবারে শুরুতে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজেই অর্গানিক কৃষিপণ্য উৎপাদন করবেন এবং ভোক্তাদের কাছে তা সরবরাহ করবেন। যেই কথা সেই কাজ। প্রথমে নিজ এলাকা কুষ্টিয়ার পরিচিত কৃষক যারা জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করেন তাদের কাছ থেকে নিজ পরিবারের জন্য খাদ্য পণ্য সংগ্রহ করেন।


এক সময় ওখানকার এক আত্মীয়ের খামারও করেছিলেন কাকলি। তবে বছরখানেকের মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে চুয়াডাঙ্গায় তার মামার বাড়িতে আরো একটা খামার করেন। ঢাকা থেকে খামার মেইনটেন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সুতরাং সেটাও একসময় বন্ধ হয়ে যায়।


বার বার বাধার মুখে পড়লেও থেমে যাননি। যেখানেই নিরাপদ খাদ্যের সন্ধান পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন অদম্য এই উদ্যোক্তা। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছেন বেশ কয়েকবার। আবার ছুটে গেছেন বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন জেলায়। এভাবে এসব জেলার সাথে একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। সেসব জেলার খামারিদের কাছ থেকে নিয়মিত কৃষিপণ্য এখন চলে আসে ঢাকায়।


বার বার বাধার মুখোমুখি হয়েও লড়াইটা যখন কোনোভাবেই না থেমে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন আস্তে আস্তে স্বামী, ভাই, বাবাসহ যুক্ত হন তার উদ্যোগের সঙ্গে। চলার পথে সহযোগী হিসেবে নানানভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তার বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও।


নিয়মিত এভাবেই চলতে থাকলে উদ্যোগটা আত্মীয় ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে প্রশংসা পায়। একপর্যায়ে পরিচিতজনরা তাদের জন্যেও অর্গানিক খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করে দেয়ার আবদার করতে থাকেন। সেই আবদারের ফলাফলই কাকলির আজকের ‘শুদ্ধ কৃষি’।



‘শুদ্ধ কৃষি’র আউটলেটে কাকলি।


কাকলি একটা সময়ে গ্রাম-গঞ্জে, মাঠে-ঘাটে ঘুরে নিরাপদ সবজি-মাছ-ডিম সংগ্রহ করেছেন। মানুষ তাকে সবজিওয়ালি বলেও মন্তব্য করেছেন। সবাই বলেছেন এই যুদ্ধে তার জয়ী হওয়া সম্ভব না। কিন্তু তার এই শুদ্ধ কৃষির আজ ঢাকার বুকে গ্রিন রোড, ধানমন্ডি ইউনিমার্ট ও গুলশানে তিনটি আউটলেট গড়ে উঠেছে। এই নিরাপদ খাদ্যের লড়াইয়ের সঙ্গে শরিক হয়ে ইউনিমার্ট শুদ্ধ কৃষির আউটলেটের জন্য কোনো ভাড়াই নিচ্ছে না।


রাজধানীর গ্রিন রোডে অবস্থিত কমফোর্ট হাসপাতালের অপোজিটে এবং ধানমন্ডি ক্লিনিকের নিচতলায় শুদ্ধ কৃষির বিপণনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এখানেই বিক্রি করা হয়। শুদ্ধ কৃষির বিক্রয়কেন্দ্রটি খোলা থাকে সপ্তাহের সাতদিনই। শুক্র ও মঙ্গলবার হচ্ছে শুদ্ধ কৃষির হাটবার। এই দুই দিন গ্রামের হাটের মতোই এখানে মাছ, মাংস, সবজি, চাল, ডাল থেকে শুরু করে নানারকম কৃষিপণ্য থাকে। গ্রিন রোডের আউটলেটে কিডনি এবং ক্যান্সার রোগীর পরিবারের জন্য ২০ শতাংশ কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে।


বিভিন্ন কোম্পানির সারের ডিলারশিপের ব্যবসা করতেন কাকলির বাবা। সেই বাবা তার নিজের ব্যবসা বন্ধ করে এখন বসেন শুদ্ধ কৃষির বিপণনকেন্দ্রে।


আজ প্রায় ১১ বছর ধরে কাকলির বাসায় বাজারের রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ভেজাল খাবার আর কেনা হয় না। ভেজাল খাবারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো সম্ভব হয়েছে তার উদ্যোগ ‘শুদ্ধ কৃষি’র জন্য।


মানুষকে নিরাপদ খাদ্য খাইয়ে সুস্থ রাখার এই অভিনব প্রচেষ্টা কাকলিকে দিয়েছে ‘শুদ্ধ আপা’র তকমা। তাই এখন অনেকেই কাকলিকে ডাকেন ‘শুদ্ধ আপা’ বলে। আবার কেউ কেউ ডাকেন ‘শহুরে কৃষক’।



‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেবো’ গ্রুপের পক্ষ থেকে দেয়া ‘উদ্যোক্তা স্মারক-২০১৮’ নিচ্ছেন কাকলি।


কাকলির এই ব্যবসার শুরুতে প্রচুর লোকসানের শিকার হতে হয়। পরিবহন খরচসহ নানাবিধ কারণে পড়তে হয়েছে এই লোকসানে। ভর্তুকি অবশ্য এখনো দিতে হয় তবে অনেকটাই কমে এসেছে। আস্তে আস্তে ‘শুদ্ধ কৃষি’ তথা নিরাপদ খাদ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এসব পণ্য বিভিন্ন জায়গা সংগ্রহ করে আনতে খরচ হয়ে যায় অনেক। এগুলো বিক্রিও করতে হয় অধিক দামে।


নিরাপদ সবজিচাষের জন্য ঢাকার খুব কাছেই কেরানীগঞ্জে রোহিতপুরে নিজে ১২ বিঘা জমির ওপর একটা খামার গড়ে তুলেছেন কাকলি। আলমডাঙ্গার একটি নির্দিষ্ট বাড়ি রয়েছে যেখানে গ্রামের সবাই নিরাপদ খাবার নিয়ে আসেন। নিরাপদ সবজি উৎপাদনের জন্য ‘শুদ্ধ কৃষি’র রয়েছে নিজস্ব কৃষক। ‘শুদ্ধ কৃষি’তে নিরাপদ সবজি ছাড়াও পাওয়া যায় দুধ, ডিম, মাছ, দেশীয় হাঁস-মুরগিসহ অনেক কিছু। কোরবানির গরু ও গরুর দুধ সংগ্রহ করা হয় যমুনার চর, কুষ্টিয়া থেকে। ‘শুদ্ধ কৃষি’র মাছ সংগ্রহ করা হয় যমুনা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, গলাচিপার নদী, লেবুখালী নদী, রাঙ্গামাটির লেক থেকে।


আমাকে পারতেই হবে। এই আত্মবিশ্বাসে ভর করে ‘শুদ্ধ কৃষি’র পণ্য সংগ্রহের জন্য দেশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত দাপিয়ে বেড়িয়েছেন-এখনো বেড়ান, খুঁজে বের করেছেন জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা কৃষকদের, এমনকি বাড়ির উঠানে সবজি চাষ করা গ্রামীণ নারীদেরও। উঠোনে চাষ করা সবজির মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকিটা ‘শুদ্ধ কৃষি’ আউটলেটে সরবরাহ করে প্রচুর নারী নিজেদের হাতখরচের টাকা জোগার করতে সমর্থ হয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি জেলার কৃষকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তার ‘শুদ্ধ কৃষি’ উদ্যোগের নেটওয়ার্ক।


শহুরে এই কৃষকের ভাষ্য, উদ্যোগ হিসেবে কৃষিকে বেছে নেয়া নারীর সংখ্যা আমাদের দেশে হাতে গোনা। আবার সেটা যদি হয় অর্গানিক পণ্য তাহলে তো চ্যালেঞ্জ আরো বেশি। আমি ঠিক সেই জায়গায় নিজেকে সফল হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছি।


শহরের ভোক্তারা বেশি দাম দিয়ে রেস্টুরেন্টে খাচ্ছেন, দামি জামা কিনছেন, কিন্তু খাবার কিনতে গিয়ে দাম একটু বেশি দেখলেই আর কিনছেন না। তাই এখন ভোক্তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসা জরুরি। বললেন কাকলি।



গ্রামীণ নারীদের কাছে থেকে নিরাপদ সবজি সংগ্রহ করছেন শহুরে কৃষক।


এই অসাধারণ ও সাহসী উদ্যোগের জন্য ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেবো’ গ্রুপের পক্ষ থেকে গত জুন মাসে কাকলিকে দেয়া হয় ‘উদ্যোক্তা স্মারক-২০১৮’।


নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাকলির ভাবনার শেষ নেই। স্বপ্ন দেখেন নিরাপদ খাদ্যের জন্য এক দিন পাগল হয়ে উঠবেন সারাদেশের মানুষ। প্রত্যেকটি মানুষ নিজের তাগিদেই খেতে চাইবেন নিরাপদ খাদ্য। ঢাকা শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে থাকবে নিরাপদ খাবারের দোকান। সব জায়গায় গড়ে উঠবে নিরাপদ খাদ্যের বিক্রয়কেন্দ্র। সারাদেশেই থাকবে নিরাপদ খাদ্য বিক্রির জন্য আলাদা বিক্রয়কেন্দ্র। এছাড়াও গ্রামীণ মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এই ‘শুদ্ধ কৃষি’।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com