প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মাঝে কাজ করতে চায় ‘ইয়োডা’
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:৩৬
প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মাঝে কাজ করতে চায় ‘ইয়োডা’
ইয়োডা উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালমান
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ইউনিলিভার ও ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিতে চাকরি পান মোহাম্মদ সালমান। দীর্ঘদিন চাকরিও করেন সেখানে। প্রতিষ্ঠানে বসের অধীনে চাকরি করে মনের দিক থেকে সন্তোষ্ট ছিলেন না। তাই স্বাধীনভাবে কিছু করার উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেন চাকরি। মাথায় আসে রেস্তোরাঁ ব্যবসার পরিকল্পনা। যেই ভাবা সেই কাজ। ছোট পরিসরে রাজধানীর বনানীতে চালু করেন ‘ট্রি হাউজ রেস্টুরেন্ট’।


গুণগতমানসম্পন্ন খাবার পরিবেশনা এবং দক্ষ নেতৃত্বে অল্পদিনের মধ্যেই সফলতার মুখ দেখে সালমানের ‘ট্রি হাউজ রেস্টুরেন্ট’ এর উদ্যোগ। বেশ ভালই চলছিল তার রেস্তোরাঁ ব্যবসা। হাতে টাকা-পয়সা হলে নতুন আরেকটা উদ্যোগ নেয়ার কথা ভাবতে থাকেন। কী সেই উদ্যোগ? এর পেছরে রয়েছে ছোট একটা গল্প।


বিবিএতে পড়ার সময় একটা এজেন্সির মাধ্যমে এক ছাত্রকে বাসায় গিয়ে পড়ানো টিউশনি ফেয়েছিলেন সালমান। ওই এজেন্সিকে তার প্রথম মাসের পুরো বেতনটাই দিয়ে দিতে হয়। সারা মাস কষ্ট করে রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে ছাত্রকে পড়িয়ে মাস শেষে পুরো মাসের বেতন দিয়ে দিতে হলো বিষয়টা ভাবতেই তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তখন মাথায় একটা আইডিয়া আসে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে এমন একটা কিছু করার যাতে কাউকে কোনো কমিশন না দিয়ে সবাই টিউশনি পেতে পারেন।


শুরু করেন অনলাইনভিত্তিক শিক্ষক খোঁজার প্ল্যাটফর্ম আইডিয়া পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। চলতে থাকে বিষয়টির উপরে পড়াশোনা ও গবেষণা। দীর্ঘ তিন বছরের বেশি দিন ধরে আইডিয়াটির পেছনে লেগেছিলেন তরুণ এই উদ্যোক্তা। অফিস-চাকরি সব সামলিয়ে রাতের পর রাত জেগে অক্লান্ত পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলে আইডিয়ার ডেভেলপের কাজ করেন তিনি।


তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সব কিছুই এখন পাওয়া যায় অনলাইনে। প্রযুক্তির এ অগ্রসরতায় ঘরে বসেই নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসহ সবকিছুই মেলে সহজে। রাজধানীতে বসবাসরত সকল অভিভাবকদের সহজ উপায়ে গৃহশিক্ষকের সন্ধান দিতে অনলাইনে শিক্ষক খোঁজার মার্কেট প্লেসটি তৈরি করেন তরুণ উদ্যোক্তা। নাম দেন ‘ইয়োডা’।


ইয়োডা হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধনের প্লাটফর্ম। গৃহশিক্ষকের সন্ধান দিয়ে থাকে ‘ইয়োডা’। অ্যাপটিতে নিবন্ধন করে সন্তানদের জন্য মনমতো গৃহশিক্ষক বেছে নিতে পারবেন অভিভাবকরা। আর ইয়োডায় নিবন্ধিত হলে শিক্ষকরা পাচ্ছেন নিজের চাহিদামতো শিক্ষার্থী।


কেন এই ইয়োডা প্ল্যাটফর্ম? উদ্যোগটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সালমান বলেন, অবুঝ শিশু অবুঝ প্রাণীর মতো অরক্ষিত, নির্ভরশীল। তাদের চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজন করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা ও উপযুক্ত শিক্ষক। সাধারণত আমরা যখন বাসায় শিক্ষক ঠিক করি তখন তার মুখের কথায় সব কিছু বিশ্বাস করি। এটাই চিরাচরিত নিয়ম হয়ে গেছে। তবে এক্ষেত্রে ইয়োডা শিক্ষকের সব তথ্য আপনার সামনে উপস্থাপন করছে। এরপর আপনি তথ্য দেখে শিক্ষক পছন্দ করতে পারছেন সহজেই এবং এখানে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা একদম নেই। ধরুন, আপনার বাসায় বুয়েটে পড়াশোনা করে এমন একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার সন্তানকে পড়াতে আসেন। হঠাৎ করেই আপনি জানতে পারলেন তিনি আসলে বুয়েটে পড়াশোনা করেন না এবং পড়ানোর মানও ভাল না। তখন আবার নতুন করে সন্তানের জন্য শিক্ষক খুঁজতে হবে আপনাকে। এক্ষেত্রে ইয়োডা থেকে সহজেই আপনার সন্তানের জন্য পছন্দের শিক্ষক খুঁজে পাবেন।


সালমানসহ ইয়োডা টিম


সবার আগে দুই তরফেই নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজটি করা হয়ে থাকে ইয়োডাতে। কারণ, প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কেউ যেন কোনো ধরনের জালিয়াতি, প্রতারণা বা হয়রানির শিকার না হন। এ জন্য ইয়োডায় যখন কোনো শিক্ষার্থী গৃহশিক্ষক হিসেবে আবেদন করেন, তখন তার পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে নিবন্ধন করে চূড়ান্ত করা হয়।


অন্যদিকে কোনো মা-বাবা তাদের সন্তানদের জন্য গৃহশিক্ষক চাইলে প্রথমে ফোনে সেটি কনফার্ম করা হয়। এরপর তাদের বাসার ঠিকানা থেকে শুরু করে অন্যান্য তথ্য যাচাই করতে যা যা প্রয়োজন সেসব করা হয়। পরে টিউটরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়।


ইয়োডার শিক্ষক নিবন্ধ প্রক্রিয়ায় অনেকগুলো ধাপ পার করতে হয়। প্রথম শিক্ষক নিজে সব তথ্য প্রমাণ দিয়ে নিবন্ধন করবেন এর পর ইয়োডা কর্তৃপক্ষ সব তথ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে যাচাই-বাছাই করে ইয়োডা প্লাটফর্মে অভিভাবকদের জন্য উন্মুক্ত করবে। এর ফলে অভিভাবকদের কোনোভাবে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অনলাইনে ইয়োডায় নিবন্ধন করলে যে কোনো বাবা-মা তাদের সন্তানদের জন্য সেখান থেকে বেছে নিতে পারবেন গৃহশিক্ষক। আর ইয়োডায় শিক্ষকরা নিবন্ধিত হলে পাচ্ছেন নিজের চাহিদামতো শিক্ষার্থী।


নতুন কোনো গৃহশিক্ষক খুঁজতে চাইলে ইয়োডার ওয়েবসাইট (https://yodabd.com/) এবং (https://urlzs.com/gckbS) অ্যাকাউন্ট করতে হবে। অ্যাকাউন্ট তৈরি করলে সহজেই পছন্দের শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যাবে। আর ইয়োডায় নিবন্ধন করা যায় বিনামূল্যে।


গুগলের প্লে স্টোরে রয়েছে ইয়োডার অ্যানড্রয়েড অ্যাপ। এ ছাড়া আইওএস সংস্করণে অ্যাপটি খুব শিগগির অ্যাপ স্টোরে উন্মোচন করবে প্রতিষ্ঠানটি।


সালমান জানান, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপটিও হালনাগাদ করা হচ্ছে। অ্যাপের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটও রয়েছে। মোবাইলে যেন খুব সহজেই ওয়েবসাইট ব্রাউজ করা যায়, সে জন্য কাস্টমাইজ সংস্করণও রয়েছে তাদের।


জাকার্তায় ‘টেক ইন এশিয়া’ প্রদর্শনীতে ইয়োডা


সব মিলিয়ে এখন ১৭ জনের একটি দল কাজ করছে ইয়োডায়। আমরা পুরো সেবাই ফ্রি দিচ্ছি। শিক্ষক খোঁজার ক্ষেত্রে সেবাটি সবসময়ই ফ্রি থাকবে। তবে ইয়োডার প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্য আমরা WAVE (Whiteboard Audio Visual Environment) প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেব। যার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি নেব। ইয়োডাতে শিক্ষক খোঁজার পাশাপাশি একটি হোয়াইট বোর্ড ফিচার যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অডিও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসহ পুরো সেশন রেকর্ড করে রাখা যাবে। ওয়েভ প্রযুক্তির আওতায় শিক্ষক কখনো দুর্যোগের কারণে বাসায় আসতে না পারলেও অনলাইনে হোয়াইট বোর্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। এই প্রযুক্তিটি বাংলাদেশে শুধু আমরাই নিয়ে এসেছি। এর মাধ্যমে অভিভাবকরা শিক্ষক কী পড়িয়েছেন তার পুরো সেশনটি যে কোনো সময় দেখতে পারবেন। প্রক্রিয়াটিকে আরো সহজ করতে নিজস্ব অ্যাপও তৈরি করেছি। বললেন সালমান।


সব উদ্যোগের সফলতার পেছনেই থাকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। সালমানের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। নিজে ব্যবসা অনুষদের ছাত্র ছিলেন। তাই প্রযুক্তির প্লাটফর্ম ব্যবহার করে উদ্যোগ বাস্তবায়নে কারিগরি কিছু ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কাজটিকে সহজ করেছেন ইয়োডার প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা রিফাত বিন রেজা। তার তত্ত্বাবধানে ইয়োডায় শিক্ষক খোঁজার পাশাপাশি একটি হোয়াইট বোর্ড ফিচারও যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অডিও ভিজুয়্যাল ইফেক্টসহ পুরো সেশন রেকর্ড করে রাখা যাবে। এটি মূলত দেশের ই-লার্নিংয়ে নতুন সংযোজন।


গত মাসে একটা পুরুস্কারও উঠেছে ইয়োডা উদ্যোগটির ঝুলিতে। শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখার জন্য গত ১৩ অক্টোবর এডুকেশন ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ‘বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’ পেয়েছে উদ্যোগটি। সেই সাথে উদ্যোগটি গত মাসে জাকার্তায় ‘টেক ইন এশিয়া’ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে। এবার অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ এর জন্যও ভিয়েতনামে যাচ্ছে ইয়োডা।


তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন সালমানসহ ইয়োডা টিম


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে সালমানের ভাষ্য, ইয়োডাকে আমি এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই যেন এর ওপর সবাই আস্থা রাখে। যাদের শিক্ষক প্রয়োজন তারা যেন নির্দ্বিধায় ইয়োডার ওপর ভরসা রাখতে পারেন। আমরা ভেরিফায়েড করে মানসম্মত শিক্ষক রেখেছি। তাছাড়া আমাদের এখানে কমপক্ষে ২০০ জনের স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি।


আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর মাত্র এক বছর পূর্ণ হয়েছে ইয়োডার। এখন শুধু ঢাকায় কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভবিষ্যতে সমগ্র বাংলাদেশে শিক্ষা বিস্তারে পরিকল্পনা রয়েছে ইয়োডার। এই সেবার মাধ্যমে আগামী দিনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নিয়েও কাজ করতে চায় ইয়োডা।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com