সমাজসেবা করতে চান ফ্রিল্যান্সার আমেনা আক্তার
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৯, ১২:৩৩
সমাজসেবা করতে চান ফ্রিল্যান্সার আমেনা আক্তার
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরপরই পড়াশোনার পাশাপাশি নিজে কিছু একটা করার বিষয়ে আগ্রহী হই। মনে প্রবল ইচ্ছা নিয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেই। ২০১১ সালের দিকে ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করে অনলাইনে ঘরে বসে আয় করার সম্পর্কে জানতে পারি।


বাইরে চাকরি করার চেয়ে ঘরে বসে আয় করা বিষয়টা আমার কাছে ভালো লাগে। পেশাটা নারীদের জন্য সবচেয়ে উত্তম, কেননা বাসায় বসে স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে ফ্রিল্যান্সিং করা যায়। বাইরে চাকরি করতে গিয়ে নানারকম হয়রানির শিকার হওয়ার চেয়ে বাসায় বসে আয় করাই ভাল। মূলত এ বিষয়টি আমাকে ফ্রিল্যান্সিং করার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে।


কথাগুলো বলেন সফল ফ্রিল্যান্সার আমেনা আক্তার।


বর্তমানে তিনি সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং ও অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করছেন। পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠিত ফ্রিল্যান্সিং আইটি প্রতিষ্ঠান টেরিস্ট্রিয়াল আইটিতে অনলাইন মার্কেটারের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বের সেরা অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফ্রিল্যান্সারডটকমে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে গত সাত বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টকে সেবা দিয়ে আসছেন।


সম্প্রতি বিবার্তার মুখোমুখি হয়ে আমেনা আক্তার জানালেন ফ্রিল্যান্সার হওয়ার পথে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার করে কীভাবে ফ্রিল্যান্সার হয়ে উঠা যায়।


চাঁদপুরের উত্তর মতলব থানার বদরপুর গ্রামে শৈশব ও কৈশোর কাটে আমেনার। বাবা সিদ্দিকুর রহমান পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক আর মা গৃহিণী। গ্রামের আর পাঁচজন মেয়ের মতোই বাবা-মায়ের আদরে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠা তার। ফ্রিল্যান্সার স্বামী মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম একজন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার। আর ছোট এই পরিবারে রয়েছে দুই বছরের মেয়ে আফনান ইসলাম আদিব।



ফ্রিল্যান্সার হওয়ার শুরুটা কীভাবে? জানতে চাইলে আমেনা বলেন, অনার্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু একটা কারার ভাবনা থেকেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরু। এসইও এর কাজ করার খুব আগ্রহ থাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি একটি স্বল্পমেয়াদি কোর্স করে নিলাম। হাসান সুমন, ফকরুল ইসলাম ভাইদের কাছে থেকেই আমার হাতে কলমে শিক্ষা, বিশেষ করে ফখরুল ভাই (যিনি বর্তমানে জার্মানিতে)। তারপর শিক্ষক/গুরু হলেন আমার জীবনসঙ্গী, অভিভাবক, পরম বন্ধু নাজমুল ইসলাম। উনারা সবাই তখন সফল ফ্রিল্যান্সার। তারপরে যখনি সমস্যায় পরতাম প্রশ্ন করে গুগলে সার্চ দিয়ে বের করার চেষ্টা করতাম পাশাপাশি ইউটিউব, এসইও সম্পর্কিত ব্লগ, ফোরাম সাইটের সাহায্য নিতাম।


তিনি বলেন, ২০১১ সালে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেস ওডেক্সে একাউন্ট খুলি। এসইও ও এসএমএসের মাধ্যমে এই জগতে পদার্পণ হয়। আসলে এসইও কাজ করতে গিয়ে গ্রাফিক্স ডিজাইনের (ফটোশপ) কাজ করতে হতো। বিশেষ করে ইমেজ এডিটিংয়ের কাজ। তাই গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স করি এবং পরবর্তিতে কাজের পাশাপাশি ঘরে বসেই অনলাইনে ও স্বামীর সহযোগিতায় ওয়ার্ডপ্রেসের কাজ শিখি যা আমাকে একজন সফল মার্কেটার হয়ে উঠায় দারুণভাবে সহযোগিতা করে। পরে এটিই মহিলা শাখায় সেরা ফ্রিল্যান্সার হওয়ার গৌরব এনে দেয়।


শুরুর দিকে আপনাকে কি ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল? জানতে চাইলে এমন প্রশ্নের জবাবে আমেনা জানালেন, যে কোনো কাজ শুরুর দিকে নানান প্রতিবন্ধকতা আসে। আর আমার জন্য যেহেতু ফ্রিল্যান্সিংটা ছিল সম্পূর্ণ নতুন বিষয়, তাই আমিও অসংখ্যবার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। ওই সময় আমাদের দেশের ইন্টারনেট স্পিড ছিল অনেক কম। ইন্টারনেট একজন ফ্রিল্যান্সারের প্রাণস্বরূপ। স্পিড কম থাকায় অনেক সময়ই ক্লায়েন্টদের কাজগুলো সঠিক সময়ে করে দেয়া সম্ভব হতো না।


ফ্রিল্যান্সিং করতে ইংরেজি জানাটা অত্যান্ত জরুরি। এই জগতে যোগাযোগের একমাত্র ভাষা ইংরেজি আর একজন এসইও এক্সপার্টের জন্যতো প্রধান হাতিয়ার। সেই সাথে রাত জেগে কাজ করা, মাঝরাতে স্কাইপে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অযাচিত লোকের মেসেজ, কল তো ছিল অত্যান্ত বিরক্তিকর। সময়ের সাথে সাথে এসব কিছুকে উপেক্ষা করে কাজ করে যাওয়া ও অভিজ্ঞতা অর্জন করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।



ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিমাসে আয়ের বিষয়ে আমেনা জানান, ফ্রিল্যান্সিং করে যে পরিমাণ আয় করছি আমার বর্তমান অবস্থায় থেকে স্থানীয় কোনো চাকরি করেও হয় তো এতো টাকা আয় করা সম্ভব হতো না। আমার দৃষ্টিতে ফ্রিল্যান্সিং একটা স্বাধীন পেশা। এখানে নিজের পছন্দ মতো বিষয় নিয়ে কাজ করার অবারিত সুযোগ রয়েছে। আমি ইতোমধ্যেই বেশ কিছু বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছি এবং নিজেকে আরো দক্ষভাবে তৈরি করার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় আয়ত্ব করছি যেটা সারা জীবনের পথ চলায় সাহায্য করবে।


গ্রামের অন্য পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই বেড়ে উঠা আমেনার। ছোটাছুটি, দুষ্টুমি, ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি এগুলো কিছুই পছন্দ করতেন না। চুপচাপ, নম্রভদ্র শান্ত স্বভাবের একজন লক্ষী মেয়ে ছিলেন। বন্ধুবান্ধব ছিল কম। তাই খেলার মাঠ, আড্ডা, ঘোরাফেরা এগুলো কম ছিল। বাড়ি থেকে স্কুল আর পড়াশোনা ছিল তার শৈশবের পৃথিবী। শৈশবে মা-বাবা তাকে কোনো দিন কোনো কিছু হওয়ার জন্য চাপ দেননি। একজন স্ব-শিক্ষিত ও সুশিক্ষিত মানুষ হতেই উৎসাহ দিতেন তারা। বাবা যেহেতু শিক্ষক হিসেবে সমাজ সেবার কাজ করতেন, উনাকে দেখেই সমাজ সেবা করার আগ্রহটা মনে বেশি ছিল। তাই এইচএসসি পাস করার পর ঢাকায় এসে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।


আমেনা ফ্রিল্যান্সিংয়ের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে চান বহুদূর। ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি তিনি ইতোমধ্যেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়ের টাকা দিয়ে তিনি টেরিস্ট্রিয়াল আইটি নামে একটা আইটি প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। এটাকে তিনি বিশ্বমানের একটি আইটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়তে চান। টেরিস্ট্রিয়াল আইটিকে বিশ্বের সব প্রান্তে পৌঁছে দিতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।


সমাজসেবা করার ইচ্ছাটা ভীষণভাবে লালন করেন আমেনা। এই লক্ষ্যে এটুআই, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ওম্যান ইন আইটির (বিডব্লিউআইটি) সহযোগিতায় ‘নারী আইসিটি ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির’ আওতায় ময়মনসিংহের ভালুকায় এবং কুড়িগ্রামে প্রশিক্ষক হিসেবে বেশ কিছু দিন ধরে কাজ করেছেন এবং অন্যান্য জেলাতেও এই প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। এসব প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনারগুলো থেকে তিনি উপলব্ধি করেন দেশের নারীদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।


তাই বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার নারীদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহী ও সচেতন করে তুলতে নিজ উদ্যোগে একটি অনলাইন প্রশিক্ষণ স্কুল চালু করছেন। স্কুলটির প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব অল্পদিনের মধ্যেই এর কার্যক্রম শুরু হবে জানালেন আমেনা।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com