জীবন যুদ্ধে জয়ী ফ্রিল্যান্সার জয়িতা ব্যানার্জি
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:০২
জীবন যুদ্ধে জয়ী ফ্রিল্যান্সার জয়িতা ব্যানার্জি
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ছোটবেলায় আরজে হতে চেয়েছিলেন। আবার কখনো বা সাংবাদিক। সাংবাদিকতা পেশার প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল তার। কিন্তু যখন আস্তে আস্তে বড় হন, তখন শুধু ভাবতেন কিভাবে ভালোভাবে খেয়ে-পরে দিন কাটাবেন। কখনো কারো মতো হতে চাননি। নিজের মতোই হতে চেয়েছেন। তাই সময়ের পালা বদলে তিনি এখন সফল ফ্রিল্যান্সার। জীবন যুদ্ধে জয়ী এক নারী।


তবে যাত্রাটা সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল বিভিন্ন বাধা। সব বাধা অতিক্রম করে আত্মপ্রত্যয়ের সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন সফল এই ফ্রিল্যান্সার।



বলছিলাম চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী জয়িতা ব্যানার্জির কথা।


অন্য পাঁচটা মেয়ের মতো ছোটবেলাটা কাটেনি জয়িতার। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়াতে নানান টানাপোড়েন ও নিয়মের মধ্য দিয়ে কাটে তার শৈশবের দিনগুলো। বাবা বিশ্বনাথ ব্যানার্জি চট্টগ্রামে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের হিসাবরক্ষকের চাকরি করেন। মা গৃহিনী। ছোটবেলার একটা অংশ মামাবাড়ি বরিশালে কাটে তার। পরে বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে যান চট্টগ্রামের বোয়ালখালিতে। সেখান কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন স্কুল ও কলেজ থেকেই এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন।


বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রথম সেমিস্টারের ফি দিতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন জয়িতা। বাবার অনেক চেষ্টার পর টাকা জোগাড় হয়। তত দিনে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। গুনতে হয়েছে জরিমানা। পরের সেমিস্টার আসার আগে নিজেকেই কিছু একটা করতে হবে এমন ভাবনা থেকেই আয়ের পথ খোঁজা শুরু করেন তিনি।



বাবার আয়ে সংসার চালানোই কঠিন। বাবার ওপর চাপ যেন একটু কমে, সেই আশায় প্রথমে টিউশনি শুরু করেন জয়িতা। প্রথম মাসের আয় দেড় হাজার টাকা, কিন্তু যাতায়াতের পেছনেই চলে যায় একটা বড় অংশ। সেই টাকায় অবস্থার তেমন পরিবর্তন হলো না।


জয়িতার কয়েকজন ভাল বন্ধু ছিলেন। ওই বন্ধুদের সহযোগিতায় আউটসোর্সিংয়ের ব্যাপারে ধারণা পান তিনি। কিন্তু আউটসোর্সিংয়ের কিছুই তো জানেন না। শেখার জন্য খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন, আউটসোর্সিংয়ের কোর্স ফি ১১ হাজার টাকা। হাতে তো এক টাকাও নেই। তাই বলে দমে যাননি। বন্ধুদের সহযোগিতায় নিজে থেকে শেখার উদ্যোগ নেন।


কিন্তু বিপত্তি বাধে ইন্টারনেট নিয়ে। তখন তার কাছে ইন্টারনেটের কানেকশন নেয়া অনেক কঠিন ছিল।


ব্রডব্যান্ডের সংযোগ ছিল না। বাসায় মুঠোফোন কোম্পানির একটি মডেম ছিল। তাতে এক দিনে ১০০ টাকায় এক জিবি ইন্টারনেট পাওয়া যেত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস থাকলে বাসা থেকে ১০০ টাকা দেয়া হতো আসা-যাওয়া ও টিফিনের জন্য।


চট্টগ্রাম নগরের মুন্সিপুকুর পাড়ের বাসা থেকে হেঁটে দুই কিলোমিটার দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবর্তক ক্যাম্পাসে আসতেন। কিছু না খেয়ে সেই টাকায় ইন্টারনেটের ডাটা কিনেছেন। আর ইউটিউবে আউটসোর্সিংয়ের কলাকৌশল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখেন। ইউটিউবে টিউটোরিয়ালগুলো দেখে কিছু কাজ প্র্যাক্টিজ করেন। এভাবে প্র্যাক্টিজ করতে করতে একটা সময়ে নিজের উপরে অনেকটা আত্মবিশ্বাস চলে আসে।


২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুতে আউটসোর্সিংয়ের কাজ খোঁজা শুরু হয় জয়িতার। মনোযোগ দেন ইংরেজিতে প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনি (কনটেন্ট রাইটিংয়ে) লেখায়। প্রথমে আউটসোর্সিংয়ের বড় ক্ষেত্র (অনলাইন মার্কেটপ্লেস) আপওয়ার্কে ১৮টি প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য চেষ্টা করেন। কেউ কাজ দেয়নি।



এ বিষয়ে জয়িতার ভাষ্য, কাজ না পেয়ে হতাশ হলাম। বুঝতে পারছিলাম না কোথায় আমার কমতি। সেই দুঃখ ভাগাভাগি করে আপওয়ার্ক কমিউনিটিতে একটি পোস্ট করলাম। সেখানে নানান ধরনের মন্তব্য আসা শুরু হলো। অনেকে বলল, ভালো ইংরেজিই তো লিখতে পারো না, কাজ পাবে কীভাবে। তখন জয়িতার মনে জেদ চাপে। সংকল্প করেন যেভাবেই হোক ভালো ইংরেজি শিখে কাজ করে নিজেকে প্রমাণ করার।


তখন ইন্টারনেটের কানেকশন নিয়ে আউটসোর্সিংয়ের কারিগরি বিষয়ে আরো ভালো প্রশিক্ষণ নেন জয়িতা। শিক্ষক ইউটিউব। ভিডিও দেখে সেগুলো চর্চা করে ইংরেজিতে ভ্রমণকাহিনি লেখা শুরু করলেন। ভালো ইংরেজি জানা বন্ধুদের দেখিয়ে ভুল শুধরে নিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার পাশাপাশি দুই সপ্তাহ টানা পরিশ্রমের পর আবার নেট দুনিয়ায় ঢুঁ। এর মধ্যে আপওয়ার্কে নিজের প্রোফাইলেও পরিবর্তন এনে লিখলেন, আমি একদম নতুন, আমি কাজ করতে চাই।


নতুন প্রোফাইলে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ চাইলে তারা জয়িতার সাক্ষাৎকার নিয়ে সন্তুষ্ট হয়। জুটে যায় কাজ। একটি কনটেন্ট লেখার জন্য এক ডলার মজুরি। জয়িতা শুরু করেন। এসব ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। দিনে একটি করে কনটেন্ট লিখতেন। এক সপ্তাহ যাওয়ার পর মজুরি বেড়ে হয় তিন ডলার। এভাবে এপ্রিল মাসে এসে আয় দাঁড়ায় ১০৫ ডলার। নিজের নামে প্রথম ব্যাংক হিসাব খোলেন। জমা হয় ৯ হাজার ২৩২ টাকা। সেখান থেকে ৯ হাজার টাকা জয়িতা তুলে দেন মায়ের হাতে।


কনটেন্ট রাইটিংয়ের পাশাপাশি ডাটা এন্ট্রির কাজও রপ্ত করেন জয়িতা। একসময় ছেড়ে দেন কনটেন্ট রাইটিংয়ের কাজ। মাসে ৬০০ ডলারের চুক্তিতে যুক্ত হন ‘কিউএস আর’ নামের সংগীত প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজও শেখেন। টুকটাক ডিজাইন করে আরো ২০০ ডলার করে আয় শুরু করেন। তবে গ্রাফিক্সের কাজ নিয়মিত ছিল না। ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এভাবে চলল।


ওই বছরের জুন মাসে যুক্ত হন নিউইয়র্কের একটি স্টার্টআপ রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ‘ট্যাক্সি ল্যান্ড ব্রোকারেজ’-এ। মাসে ৭৫০ ডলারের চুক্তিতে তাদের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজটি তিনি করতেন। এ ছাড়া ‘ফাইভার’-এ অ্যাকাউন্ট করে গ্রাফিক্স ডিজাইনও নিয়মিত করতে থাকেন। আরো পোক্ত হয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে যুক্ত হন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আনাস্তসিয়া বেভারলি হিলস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। পদ ছিল-বিপণন সহকারী। তবে খুব বেশি দিন ছিলেন না সেখানে। এখন আছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিউটি ব্র্যান্ড ‘বেলে বার আর্গানিক’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে। মজুরি ঘণ্টায় ১৬ ডলার। সপ্তাহের পাঁচ দিনে পাঁচ ঘণ্টা করে কাজ করেন।গত বছরের জুলাই থেকে খণ্ডকলীন নির্বাহী হিসেবে যোগ দিয়েছেন হসপ্যালস্ নামের হেলথ ট্যুরিজমের প্রতিষ্ঠানেও। এতে তিনি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করছেন।



বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, আউটসোর্সিং ও চাকরি সবই এক হাতে সামলাচ্ছেন জয়িতা। তার ভাষ্য, সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর অফিসে। সেখানে দুই থেকে তিন ঘণ্টার মতো সময় দিতে হয়। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাসায় ফিরি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে আউটসোর্সিং। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া বেশির ভাগ ক্লাসেই শেষ করি। এরপরও ছুটির দিনটি কাটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া নিয়ে।


নতুন যারা আউটসোর্সিং করতে চান, তাদের জন্য জয়িতার পরামর্শ, দক্ষ না হলে কাজ পাওয়া কঠিন। এ জন্য নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। নতুবা পিছিয়ে পড়তে হবে। কারণ, এখানে সারা বিশ্বের দক্ষ লোকজনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়।


ডিজিটাল মার্কেটিংটা সবার জন্য চ্যালেঞ্জিয়ের। এটা ছেলে-মেয়ে সবার জন্য একই কথা। কিন্তু আমি দেখেছি মেয়েরা এই সেক্টরে কম আসেন। হয়ত ভয় পান। আসলে ডিজিটাল মার্কেটিং এমন একটা সেক্টর যেখানে মেয়েদের জন্য অনেক বেশি সাফল্য আসতে পারে। আর সেক্টরটিতে লোকবল কম। তাই এখন সুযোগের অভাব নেই। আর কেউ যদি এই সেক্টরকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চায় তাহলে নতুন অনেক কিছু শিখতে পারবে, যা জীবনে কাজে আসবে।


জয়িতার লেখালেখির অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলায় তার সুন্দর একটা ডায়েরি ছিল। এতে নিয়মিত লিখতেন বড় হয়ে কী কী করতে হবে, কীভাবে নিজেকে জীবন যুদ্ধের জন্য তৈরি করতে হবে, কী করলে কী হবে, জীবনে কী হতে চান. . . এসব। এখন লেখালেখিটা হয়ে গেছে তার জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। নিজের ফ্রিল্যান্সিং জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটা বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘হাবলুদের ফ্রিল্যান্সিং’। বইটি জনপ্রিয় অনলাইন প্লাটফর্ম রকমারি.কমে ১৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। গত বছরের জুলাই মাসে এটি প্রকাশ করা হয়। ‘ফ্রিল্যান্সিং লাইভ’ নামে জয়িতার রয়েছে ইউটিউব চ্যানেলও।



জয়িতার অর্জনের ঝুলিতেও উঠেছে বেশ কয়েকটি পুরস্কার। কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় বিতার্কিক হিসেবেও নাম হয়েছিল তার। বিতর্ক, ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেয়েছেন ১৬টি পুরস্কার।


স্বপ্ন নিয়ে জয়িতা বলেন, এখন আমার আর তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। যা ইচ্ছে ছিল সবগুলোই পূরণ করে ফেলেছি। তবে স্বপ্ন দেখি ইউরোপের কোনো এক শহরে একটা ছোট্ট বাসা নিয়ে থাকার। এখন এটা পূরণ করতে চাই। আর জীবনে একজন বিনয়ী মানুষ হতে চাই।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/জাই

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com