জামদানির উপরে ডকুমেন্টরি বানানোর ইচ্ছা মুক্তির
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ১৭:২৫
জামদানির উপরে ডকুমেন্টরি বানানোর ইচ্ছা মুক্তির
নাজমুন নাহার নুপুর
প্রিন্ট অ-অ+

প্রত্যেকটি মানুষের কিছু শখ থাকে।সে শখ পূরণে নানান ধরনের পাগলামীও করেন।বিশেষ করে নারীদের বেলায় সেটা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মনে শান্তি আসে না।এমনই একজন নারী জেসমিন সুলতানা মুক্তি। শখ ছিল দেশীয় জামদানি শাড়ি সম্পর্কে জানার, কীভাবে তৈরি করা হয় সেটা কাছে গিয়ে দেখার। জীবনের কঠিন একটা সময়ে সেটা তিনি পূরণ করেছেন।শেষে জামদানির প্রেমেও পড়েছেন। এখন সে প্রেম থেকে হয়ে গেলেন একজন সফল উদ্যোক্তা।


জেসমিন সুলতানা মুক্তির এ সফলতাটা একদিনে আসেনি। তাকে পেরোতে হয়েছে অনেক কঠিন পথ। যাত্রাপথে ছিল নানান ধরনের চ্যালেঞ্জ। কী ছিল সেই চ্যালেঞ্জগুলো? জানতে হলে যেতে হবে আরো অনেক পেছনে।



দুই ছেলের সাথে উদ্যোক্তা মুক্তি


জেসমিনের বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। মা গৃহিনী।শৈশবে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় কড়া নিয়ম ও শাসনের মধ্যে বেড়ে ওঠেন তিনি। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছিলেন। ক্লাস ফাইভ ও এইটে বৃত্তি পান। এরপর বাবার চাকরি সুবাদে যান যশোর নওয়াপাড়াতে।নওয়াপাড়া মডেল স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করেন। আবার ফিরে যান নিজের এলাকা গাংনীতে। কিন্তু তাকে ভর্তি করানো হয় রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে।


পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় বাবা-মা চাইতেন তাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাতে। কিন্তু রাজশাহী যাওয়ার পর সেখানে পরিবার ছাড়া নিজেকে খাপ খাওয়াতে অনেক সমস্যা হয়। ফলে ৪.২০পয়েন্ট পেয়ে পাস করেন এইচএসসিতে।পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন ইউনিভারসিটি অব ডেভোলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউওডা) ঢাকাতে। ওখান থেকে অনার্স এবং আশা ইউনিভারসিটি থেকে মাস্টার্স পাস করেন। এরই মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলেন। হাসবেন্ড উদ্যোক্তা। সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ঢাকা থেকে বিএডও সম্পন্ন করেন। তখন জেসমিন কোডাতে কিছুদিন চাকরিও করেন। ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে টিচিং প্রফেশনে যাওয়ার।


সংসার দেখাশোনার পাশাপাশি নিজের হাত খরচটা যাতে হাসবেন্ডের কাছ থেকে নেয়া না লাগে সেজন্য শুরু করেন টিচিং। চলছিল বেশ ভালই। কিন্তু প্রেগনেন্সির কম্পিকেশনের জন্য স্কুলের জব ছেড়ে দিতে হয় তাকে। দিন-রাত বাসায় বসে বসে বোর হচ্ছিলেন।ওই সময়টাতে রাতে ঘুম হত না তার। মাথায় নানা রকম চিন্তা আসত। অনেক সময় মন খারাপ থাকত। চাকরি ছেড়ে বাসায় বসে থাকাতে এক রকম ডিপ্রেশনে চলে যান।


তখন ঘরে বসে কিছু একটা করে কম পক্ষে হাত খরচটা যেন হয় এমন কিছু করার কথা ভাবেন জেসমিন। যেহেতু কিছু দিন জব করেছেন, নিজের টাকা নিজে ইচ্ছে মত খরচ করেছেন, তাই হাসবেন্ডের কাছে কোনো কিছুর জন্য টাকা চেয়ে নিতে হবে এটা মানতে নারাজ ছিলেন। তাই ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন।


কিন্তু কি নিয়ে ব্যবসা করবেন? তখনই তার মাথায় আসে জামদানি শাড়ি নিয়ে ভাবনা। আগে থেকেই যেহেতু জামদানিকে ভালোবাসতেন, তাই মনে হলো জামদানি নিয়ে কাজ করলে ভালো হয়। এরপর হাসবেন্ডের সাথে একদিন জামদানি পল্লী যেতে চান। তার কথায় হাসবেন্ড বেশ অবাক হন। যেহেতু এই শরীর নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, আবার ২য় প্রেগনেন্সির কারণে বেশ কিছু কমপ্লিকেশন ছিল। তাই তিনি তাকে নিতে চাচ্ছিলেন না। তারপরও জোর করায় হাসবেন্ড তাকে নিয়ে যান জামদানি পল্লীতে তাঁতীর কাজ ও তাঁতশিল্পকে দেখাতে।


জামদানি পল্লী ঘুরে ভীষণ ভালো লাগে জেসমিনের। জামদানি সম্পর্কে জানতে তিনি তাঁতীদের নানান প্রশ্ন করেন। তার মধ্যে সুতা সম্পর্কে প্রথম শেখেন ও জানেন। কোনটা রেশম আর কোনটা লাইলন। যেমন জামদানি আচলের শেষ মাথায় যে সুতা বের হয়ে থাকে দুই আঙু্ল দিয়ে ঘুরালে যেটা পেঁচিয়ে যাবে সেটা রেশম, আর যেটা যাবে না বা যেমন আছে তেমন থাকবে সেটা লাইলন। রেশম পোড়ালে ছাই হয়ে যাবে, লাইলন প্লাসটিকের মত জমে যাবে। এটা ছিল উনার জামদানি নিয়ে প্রথম শিক্ষা। জামদানি সম্পর্কে জানার আগ্রহটা আরো বেড়ে গেল তার।


সেই থেকে শুরু করেন জামদানি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা আর শেখা। ধাপে ধাপে শেখেন সুতি জামদানি ও হাফসিল্ক জামদানির পার্থক্য। জামদানিতে দুরকম সুতার ব্যবহার হয়। রেশম সুতা ও সুতি সুতা। যেটা তুলা থেকে তৈরি হয়। জামদানিতে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বি দুই দিকেই যদি সুতি সুতা ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটা হয় সুতি জামদানি। আর যদি রেশম ও সুতি সুতা মিলিয়ে করা হয় (লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি) তাহলে সেটা হাফসিল্ক জামদানি। হাফসিল্ক জামদানি বাসায় ওয়াশ বা লন্ড্রিতে ড্রাই ওয়াশ করা ঠিক না, তাঁতীদের দিয়ে কাটা ওয়াশ করানো ভালো। আর সুতি জামদানি যদি ১০০% পিওর সুতি সুতায় করা হয় তাহলে বাসায় ওয়াশ করা যাবে। সুতি জামদানি ফেসে যাওয়ার ভয় কম যেটা হাফসিল্কে অসাবধানতায় ফেঁসে যেতে পারে। তাই খুব যত্ন করে ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে হয়। এগুলো ছিল জেসমিনের জামদানি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা।



নিজের প্রতিষ্ঠানে মুক্তি


পরে তিনি কিছু জামদানি শাড়ি কিনে নিয়ে আসেন বাসায়। ফেসবুকে জেসমিনের একটা গ্রুপ ছিল। যেখানে গ্রুপের সবাই গল্প, মজা, গান কবিতা শেয়ার করতেন। তখন গ্রুপটা মোটামুটি একটিভ ছিল। নতুন আনা জামদানি শাড়ির কিছু ছবি ওই গ্রুপে পোস্ট করেন। পরে ‘জামদানি লাভারস’ নামে আরেকটা পেজও খুলেন।


বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়-স্বজনের মধ্যে বেশ ভাল একটা সাড়া পান তিনি। ছবি পোস্ট করার দুই দিনের মধ্যে তার এক বড় আপু যার সাথে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন একই হোস্টেলে ছিলেন, তিনি তাকে একটা লেমন রেড কম্বিনেশন জামদানির ব্যাপারে প্রথম নক করে নিতে চান। ওই আপু একজন ব্যাংকার। ঠিকানা ফোন নম্বর দিয়ে অর্ডারটা নিশ্চিত করেন জেসমিন। এই অর্ডারটা তাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে। তিনি আপুর অর্ডারটা সময় মত ডেলিভারি দেন। আপু জামদানিটি পেয়ে অনেক খুশি হন। এরপর এতটায় খুশি হন যে তার ব্যাংকের একটি অনুষ্ঠানের জন্য আরো একটি টকটকে লাল গোল্ডেন কম্বিনেশম জামদানি অর্ডার করেন। এই শাড়িটা কাস্টমাইজড শাড়ি ছিল। তখন জেসমিন ৩০ সপ্তাহের প্রেগনেন্ট এটা তার জন্য ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল।২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি ১ তারিখ ডিউ ডেট, এদিকে সেকেন্ড সি সেক। তাই ডক্টর দুই সপ্তাহ আগে মানে জানুয়ারির ১৫তে ডেট দেন সি সেক। আপুকে জানুয়ারির ফার্স্ট উইকে ডেলিভারি দিতে হবে। অনেক টেনশনে ছিলেন টাইমলি দিতে পারবেন কিনা।


তাঁতী জেসমিনকে কথা দেন ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেই শাড়ি রেড়ি করে দেয়ার, কিন্তু ৩১ ডিসেম্বরেও শাড়ি রেডি হয় না। একেতো প্রেগনেন্সির লাস্ট স্টেজে ছিলেন জেসমিন, একটু টেনশনে বিপি বেড়ে যায়। আপুর কাছে বার বার সরি বলেন। তখন ওই আপু তার অবস্থা বুঝে বলেন টেনশন না করতে, উনি অন্য কোনো শাড়ি পরে নেবেন অনুষ্ঠানে। শাড়ি রেডি হলে তখন নেবেন। তাঁতীকে রিকোয়েস্ট করেন আবার। হাসবেন্ডকে গিয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন। হাসবেন্ডও বিরক্ত হন। অবশেষে জানুয়ারির ৫ তারিখ তাঁতী ফোন দেন। শাড়ি রেডি। মনে শান্তি ফিরে আসে জেসমিনের। হাসবেন্ডকে দিয়ে শাড়ি আনেন। এনে সময় মত মানে আপুর প্রোগ্রামের একদিন আগে শাড়ি ডেলিভারী দেন। দুটি শাড়িই বেশ দামি রেঞ্জের ছিল। এটা তার জামদানি যুদ্ধ জয়ের প্রথম অভিজ্ঞতা।


২০১৭ সালের শেষ দিকে মাত্র ২০ হাজার টাকার মূলধন নিয়ে শুরু জামদানি ব্যবসায় এখন মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়।


হাসবেন্ড উদ্যোক্তা হওয়ায় জেসমিনের ব্যবসার কাজগুলো করতে অনেক সহজ হয়েছে।শুরু থেকেই হাসবেন্ড তাকে তার সব কাজ বুঝতে পেরেছেন এবং প্রয়োজন মতো পরামর্শ ও সহযোগিতা করে আসছেন।


তার সহযোগিতা না থাকলে তিনি হয়ত এত দূর আসতে পারতেন না। বাচ্চা-সংসার একা হাতে সামলানোর পর নিজের ব্যবসার কাজ করেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন কুরিয়ার সমস্যা, টাইমলি ডেলিভারি দেয় না। তাই অর্ডার ক্যানসেল হয়। অনেক সময় কুরিয়ার বিল টাইমলি দেয় না। তখন টাকা আটকে যায়, যার কারণে তাঁতীকে পেমেন্ট দিতে কষ্ট হয়ে যায় এইরূপ কিছু সমস্যায় পড়তে হয়।



নারী উদ্যোক্তাদের সাথে জামদানি আড্ডায় কথা বলছেন মুক্তি


জামদানির পাশাপাশি টাঙাইল তাঁত, বাটিক, জর্জেটের উপর এমব্রডারি ৩ পিস, নিয়েও কাজ করেছেন জেসমিন। এসব বিক্রির জন্য তিনি ফেসবুকে ‘নীলিমা’ নামে একটা পেজ খুলেন। ‘জামদানি লাভারস’কে শুধু জামদানির জন্য স্বতন্ত্র করেন।


ফেসবুকের কল্যাণে পরিচয় হয় নারী উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় অনলাইন প্লাটফর্ম উইম্যান অ্যান্ড ই-কামার্স ফোরাম (উই) এর সাথে। উইতে একটিভ হওয়ার পর জেসমিনের অন্যান্য প্রডাক্টের সেল কমলেও জামদানির বিক্রি বেড়েছে অনেক বেশি। প্রায় ২৫০ পিসের মত জামদানি পাঞ্জাবি, জামদানি ওয়ান পিস, জামদানি ৩ পিস সেল করেছেন। জামদানি শাড়িরও বিক্রি বেড়েছে। এখন তার জামদানি শাড়ি, ৩ পিস, টুপিস, পাঞ্জাবি, জামদানি ওড়না, জামদানি কাপল সেট (পাঞ্জাবি + কামিজ + ওড়না), জামদানি ফ্যামিলি সেট (জামদানি পাঞ্জাবি, জামদানি কামিজ, বেবি পাঞ্জাবি) দেশের বাইরে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, কাতার, দুবাই, মালেয়শিয়া, ভারতসহ অনেক দেশে যাচ্ছে।


ই-ক্যাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সার্চ ইংলিশ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রাজিব আহমেদের কথা, উপদেশ সব সময় জেসমিনকে অনুপ্রেরণা দেয়। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, রাজিব ভাইয়া উইতে একটিভ হওয়ার পর আমি একটিভ হই। ভাইয়ার কারণে জামদানি ওয়েভ, দেশিপণ্যের জোয়ার শুরু হয়। বাংলাদেশে আর কোনো এমন ই-কমার্স গ্রুপ বা প্লাটফরম নেই যেখানে এভাবে দেশিপণ্যের চর্চা করা হয়। উইয়ে অফলাইন ইভেন্ট, আড্ডা, অনলাইন আড্ডাগুলো আমাদের মত তরুণ উদ্যোগক্তাদের জন্য অনেক উপকারি। এখান থেকে প্রতিনিয়ত ই-কমার্স নিয়ে নতুন কিছু শুনছি, জানছি, অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। আমাদের জন্য এমন একটি প্লাটফরম দেয়ার জন্য নিশা আপু ও রাজিব ভাইয়াকে ধন্যবাদ।



বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হোসনে আরা বেগমকে জামদানি দেখাচ্ছেন মুক্তি


জেসমিনের লেখালেখির হাতও অনেক ভাল। এক সময় প্রচুর লেখালেখি করতেন। ভালোবাসেন কবিতা আবৃত্তি করতে, বই পড়তে এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে। তার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাস, প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ।


কোনো কিছুর প্রতি একবার ভালোবাসা জন্মে গেলে সে বিষয়ে কত কি-ই না করতে ইচ্ছে করে। তেমনি জামদানিপ্রেমী জেসমিনও জামদানিকে নিয়ে করতে চান অনেক কিছু। জামদানি সম্পর্কে আরো বেশি করে জানতে, শিখতে চান তিনি। ইচ্ছে আছে জামদানি নিয়ে একটি বই লেখার। পরিকল্পনা করছেন খুব শিগগিরিই জামাদানি লাভারসের ব্লাগ সাইটটা ওপেন করার। সেখানে শুধুই জামদানি নিয়ে যত লেখা, ছবি থাকবে। জামদানি লাভারসের যে ইউটিউব চ্যানেলে রয়েছে সেখানে আরো বেশি করে ভিডিও আপ করতে চান এই জামদানিপ্রেমী। স্বপ্ন দেখেন জামদানি তাঁতশিল্প ও তাঁতীদের জীবন নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি ফিল্ম করার।


বিবার্তা/নুপুর/উজ্জ্বল/জাই


সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com