বুয়েটে যন্ত্রকৌশল নিয়ে পড়ে সফল হোটেল ব্যবসায়ী রাজন
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৩০
বুয়েটে যন্ত্রকৌশল নিয়ে পড়ে সফল হোটেল ব্যবসায়ী রাজন
‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেবো’ গ্রুপের পক্ষ থেকে দেয়া ‘নবীন উদ্যোক্তা স্মারক-২০১৮’ নিচ্ছেন রাজন। ছবি: ফেসবুক থেকে
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

যন্ত্রপাতির সাথে যার বন্ধুত্ব হওয়ার কথা ছিল, সে কিনা আজ সারাক্ষণ শুধু ভাবেন আর প্ল্যান করেন, কী করলে হোটেল ব্যবসাটা আরেকটু ভালো হবে। কোন আইডিয়াটা অ্যাপ্লাই করলে অরেকটা নতুন হোটেল চালু করা যাবে। সেখানে কী কী নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করলে পর্যটকরা আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাবেন।


বলছিলাম বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার ও স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা শাহেদ এজাজ আহমেদের (রাজন) কথা।


অন্য পাঁচটি ছেলের মতোই ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যন্ত্রপাতি বানাবেন। যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজের সাথে হবে সখ্য। বড় চাকরি করবেন। এমন উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন চাঁদপুরের ছেলে রাজন। পড়াশোনা শুরু করেন। যন্ত্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেও মনের দিক থেকে স্থির হতে পারছিলেন না। মন টানছিল অন্যদিকে।


সময়টা ছিল ২০১৬ সাল। চারদিকে বইছিল উদ্যোক্তা সংস্কৃতি চর্চার জোয়ার। বুয়েটে পড়েও বন্ধুবান্ধববিভিন্ন উদ্ভাবন নিয়ে চলে যাচ্ছিল স্বাধীনভাবে কাজ করতে। চাকরি করে চাকরের মতো জীবনযাপন না করে নিজে থেকে কিছু করার ভূত মাথায় চাপলো রাজনের। উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থেকে বুয়েটে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়ার সময় থেকেই ছোট ছোট বেশ কিছু উদ্যোগ নেন। কিন্তু উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, জ্ঞান, অভিজ্ঞতার অভাবে সে উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়।


থেমে যাননি রাজন। দ্বিগুণ উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে পুনরায় উদ্যোক্তা হওয়ার প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভের জন্য বিভিন্ন উদ্যোক্তা সেমিনারে যোগ দেন। এসব সেমিনারে উদ্যোক্তাদের জীবন সংগ্রাম শোনার পাশাপাশি তাদের কাজের অভিজ্ঞতাগুলো মন দিয়ে শুনতেন। যারা নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, কেন হয়েছেন, কী করে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন- এসব বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতেন। এসবের মধ্য দিয়ে রাজন বুঝে নিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাসে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার বলে নিজের কর্মক্ষেত্র নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে।


বুয়েটে পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠীরা যখন নানা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে চাকরি করছিলেন আবার কেউবা উচ্চ ডিগ্রি লাভের আশায় বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছিলেন, তখন রাজন নিজ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন।


বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার ও স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা শাহেদ এজাজ আহমেদ (রাজন) ছবি: ফেসবুক থেকে


২০১৭ সালের শেষদিকে একটা জাতীয় দৈনিকে মাসুদুর খান নামে একজন উদ্যোক্তার খোঁজ পান রাজন। তিনিও ছিলেন বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের। মাসুদুর খান দেশে বেশকিছু ছোটবড় কিছু উদ্যোগ নিয়ে এবং পেট্রোবাংলায় চাকরি চুকিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান।


বিদেশে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাক্স (আর্লিংটন) থেকে এমএস, এমবিএ করে, টয়োটা, জেনারেল মোটরসের মতো বাঘা বাঘা কোম্পানিতে লোভনীয় বেতনে চাকরি করেও সন্তুষ্ট না হয়ে নিজ উদ্যোগে ‘হোটেল ইন্ডাস্ট্রি’ দিয়ে শুরু করলেন এবং প্রচণ্ড পরিশ্রম, একাগ্রতায় বিদেশের মাটিতে প্রশান্ত মহাসাগরের কোলঘেঁষে ১৪টি হোটেলের মালিক হয়ে যান।


এ উদ্যোক্তার জীবন দেখে অনুপ্রাণিত হন রাজন। এক সময় তার খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করলেন। তার সাথে যোগাযোগের পর জানতে পারলেন এই বাংলাদেশেও তার ইনভেস্ট করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সঠিক আর নির্ভরযোগ্য পার্টনারের অভাবে সেটা সম্ভব হচ্ছে না।


রাজন এ সুযোগে নিজের উদ্ভাবনী ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ফেলেন। দেশি ও বিদেশি কয়েকজন বিনিয়োগকারীকে নিয়ে দুজন একসাথে ‘লাইফ স্টাইল হোটেল বিডি লিমিটেড’ নামে একটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর হোটেল ট্রপিক্যাল ডেইজির ব্যবস্থাপনার কাজে নেমে পড়েন।


শুরুতেই বুটিক কনসেপ্টে তারা হোটেলের রেনোভেশনের কাজে মনোযোগ দেন। হোটেলের লবি, রুম, রেস্টুরেন্ট, কনফারেন্স হল, রুফটপ লাউঞ্জ ডিজাইনে দেশীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য এবং লোকাল ম্যাটেরিয়ালকে প্রাধান্য দিয়ে চমৎকারভাবে রেনোভেশন করে নতুন রূপে হোটেল ট্রপিক্যাল ডেইজির পথচলা শুরু করে। এর নেতৃত্বে থাকেন রাজন।


রেনোভেশনের পাশাপাশি রাজন হোটেলের স্টাফ এবং নিজের ট্রেনিং পর্বটি ও সেরে ফেলেন। ম্যানেজমেন্টে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, কাস্টমাইজড গেস্ট সার্ভিস, ক্যাটারিং সার্ভিস, ইভেন্ট স্পেস, রেস্টুরেন্ট সার্ভিস, গেস্ট সার্ভিসে জিরো টলারেন্স নীতি, টিমের প্রতিটি সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রমের সুফল আসা শুরু হলো এক এক করে।


রাজন শুধু নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে থেমে থাকেননি। দিন দিন বাড়িয়ে চলেছেন কর্মসংস্থানও। মাত্র ২২ জন নিয়ে শুরু করা উদ্যোগটাতে এখন কাজ করছেন ৩৪ জন।


স্বপ্নের উদ্যোগ বাস্তবায়নের শুরুতে যে কোনো উদ্যোক্তাকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। রাজনকেও অতিক্রম করতে হয়েছে এসব কঠিন পথ। উদ্যমী এই তরুণ উদ্যোক্তার ভাষ্য, শুরুতে ব্যবসার পরিকল্পনা, প্রজেক্ট প্রোপোজাল তৈরি, ইনভেস্টর, পার্টনার খুঁজে বের করা- এসব কাজ নিজের হাতে করতে হয়েছে। যেহেতু ব্যবসার আইডিয়াটা নতুন, তাই এটাকে একটা প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে দিন-রাত অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।


মাসুদুর খান একজন আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনার। হোটেল ব্যবসা ভালো করে বোঝেন। এমন একজনকে ব্যবসার পার্টনার হিসেবে পেয়ে রাজন তার কাছে হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। পরিকল্পনা করে মাসুদুর খান দেশে আসতেন আর রাজনকে বিষয়গুলো সুন্দর করে শেখান।


হোটেল ট্রপিক্যাল ডেইজিতে রাজন। ছবি: ফেসবুক থেকে


সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা রূপসী বাংলাদেশের রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে যুগ যুগ ধরে বিদেশি পর্যটকরা বাংলাদেশে আসতেন। এখনো সারাবছর ধরেই আসেন এবং ভবিষ্যতেও আসবেন। পর্যটক আসার কারণেই বাংলাদেশে হোটেল ব্যবসায় রয়েছে অফুরাণ সম্ভাবনা।


এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের অনেক তরুণ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ কাজে এগিয়ে আসছেন। নিজ উদ্যোগে অনেকেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাই রাজনেরও পরিকল্পনা রয়েছে দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করার। সরকার দেশের পর্যটন বিকাশে নানা ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। একই সাথে বেকার তরুণদের হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের সুযোগ করে দিলে দেশের বেকারত্ব অনেকাংশে কমবে বলে রাজনের ধারণা।


যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ট্রাভেল অ্যান্ড হস্পিটালিটি অ্যাওয়ার্ড-এর পক্ষ থেকে হোটেল ট্রপিক্যাল ডেইজিকে কাস্টমার রিভিউ এবং ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে ‘বেস্ট বুটিক হোটেল অফ দ্য ইয়ার-২০১৯’ ঘোষণা করা হয়।


রাজনের এই অসাধারণ ও সাহসী উদ্যোগের জন্য ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেবো’ গ্রুপের পক্ষ থেকে গত জুন মাসে দেয়া হয় ‘নবীন উদ্যোক্তা স্মারক-২০১৮’। আর তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে হোটেল ব্যবসায় ভাল কাজ করার জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর হোটেল ট্রপিক্যাল ডেইজিকে ‘সাকসেসফুল ইয়ং এন্টারপ্রেনার’ ক্যাটাগরিতে দেয়া হয় ‘ফাস্ট বিজনেস লিডারস অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’।


তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি রাজনের ভাষ্য, পড়াশোনা বা চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে যে কোনো ব্যবসা শুরু করা উচিত। কেননা, প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর মধ্যে লুকিয়ে আছে নতুন কিছু সৃষ্টির অফুরাণ সম্ভাবনা। তাদের এ সৃজনশীল চিন্তাশক্তিকে দেশের যে কোনো জাতীয় সমস্যার সামাধানে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী কাজে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করতে পারলে আমাদের শিক্ষিত বেকারত্বের হার কমে আসবে। আর তাদের সৃজনশীল মনে যে কাজটি করার প্রবল ইচ্ছা জাগে, সে কাজটি দিয়েই শুরু করা যেতে পারে এ যাত্রাটি।


বিডিওএসএনের সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসানেরসাথে উদ্যোক্তা রাজন। ছবি: ফেসবুক থেকে


তার মতে, সব কাজই ‘চ্যালেঞ্জের ও পরিশ্রমের’। কিন্তু একাগ্রতা ও নিষ্ঠা এবং কাজে বিরামহীনভাবে লেগে থাকলে একদিন সাফল্য আসবেই।


রাজন স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের বড় বড় সব বিভাগীয় শহর এবং ট্যুরিস্ট জোনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেবা দেয়ার পাশাপাশি বিশ্বে একদিন নামকরা চেইন হোটেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/রবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com