ভালোবাসার জন্য ধর্ম ছেড়েছিলেন বৃষ্টি
স্বামীর বিরুদ্ধে পেট্রোল ঢেলে স্ত্রীকে পোড়ানোর অভিযোগ
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ২১:০৬
স্বামীর বিরুদ্ধে পেট্রোল ঢেলে স্ত্রীকে পোড়ানোর অভিযোগ
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

একসময় ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন বৃষ্টি বিশ্বাস (৩২)। সেই স্বপ্নের টানে ভেঙেছিলেন আগের সংসার, ছেড়েছিলেন ধর্মীয় পরিচয়, পিতৃপরিবার ও পরিচিত সামাজিক পরিমণ্ডল। প্রতিবেশী ইব্রাহিম মোল্যার প্রেমের প্রস্তাব ও নানা প্রলোভনে সাড়া দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী বৃষ্টি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়ে ইব্রাহিম মিয়াকে বিয়ে করেছিলেন। তারপর কেটে গেছে ১৪ বছর। তাদের সংসারে জন্ম নিয়েছে দুই সন্তান। কিন্তু যে মানুষের জন্য একদিন সবকিছু ছেড়েছিলেন, আজ সেই স্বামীর বিরুদ্ধেই নির্যাতন, পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং বাড়ি থেকে বিতাড়নের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন তিনি।


ইব্রাহিম মোল্যা ময়না ইউনিয়নের ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বৃষ্টির অভিযোগ, ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্কের আগে এক হিন্দু যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসারে সুখে ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিবেশী ইব্রাহিমের প্রেম ও নানা প্রলোভনে আগের সংসার ভেঙে ধর্মান্তরিত হয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস বৃষ্টি নাম ধারন করে ইব্রাহিমের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেন। ধর্মান্তরিত হওয়ায় বিয়ের পর নিজের বাবা-মা ও পরিবারের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। ভালোবাসার জন্য হারান পুরোনো সংসার, ধর্মীয় পরিচয় ও পিতৃপরিবারের আশ্রয়। অথচ দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পর আজ সেই ইব্রাহিমই তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।


বৃষ্টি জানান, বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই স্বামীর আচরণ বদলাতে শুরু করে। ছেলের জন্মের পর দ্বিতীয় সন্তান সুপ্তি গর্ভে থাকতেই ভাগ্য বদলে সৌদি আরব পারি জমান ইব্রাহিম। আট বছর প্রবাসে জীবনযাপন করে দেশে ফিরে ইব্রাহিমের আচরণ পরিবর্তন হতে থাকে। সে মাদকাসক্ত হয়ে কাজকর্ম ছেড়ে ঘরে বসে থাকতো। গত তিন-চার বছর ধরে সন্দেহের বশে অযথাই দোষারোপ করতো পরকীয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে। এ নিয়ে শারীরিক নির্যাতন, গালিগালাজ, এমন কোনো নিগ্রহ নাই যা সে করেনি। দুই বছর আগে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বৃষ্টি । এতে তার হাত, বুকসহ শরীরের প্রায় ২৫ শতাংশ পুড়ে যায়। দুই হাতের ক্ষতির কারণে এখনো স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না তিনি। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একাধিক বার প্রশাসনের লোক এলেও ইব্রাহিমকে ভালবাসার জন্য মিথ্যা কথা বলে তাকে বাঁচিয়েছে বৃষ্টি। সে সময় মামলা করতে চাইলেও ইব্রাহিম আশ্বাস দিয়েছিল তার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করাবে। প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে সার্জরি করিয়ে আনবে। তার মিথ্যা আশ্বাসে আবারও প্রতারিত হয়েছে সে। সম্প্রতি ইব্রাহিম সালথা উপজেলার বাহিরদিয়া এলাকায় আরেকটি বিয়ে করেছেন বলে জানান বৃষ্টি। শুনেছি ইব্রাহিম আমাকে তালাক দিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোর্টের কোনো কাগজপত্র হাতে পাইনি।


তার অভিযোগ, নতুন স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমান বাড়িতে সংসার করার জন্য তাকে, তার বৃদ্ধ শাশুড়ি ও দুই সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ইব্রাহিম।


বৃষ্টির প্রশ্ন, যে সংসারের জন্য নিজের জন্মপরিবার, ধর্মীয় পরিচয় ও আগের জীবনের সব বন্ধন ছেড়েছিলেন, আজ সেই সংসারেই তার জায়গা নেই কেন? শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর উপার্জনের অর্থে কষ্ট করে তৈরি করা বাড়িতে দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতে চান তিনি।


তার ভাষ্য, সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো আশ্রয় নেই। প্রয়োজনে জীবন দেবেন, তবু বসতবাড়ি ছেড়ে যাবেন না। বৃষ্টির পাশে দাঁড়িয়েছেন তার শাশুড়ি জুলেখা বেগম (৬০) । ছেলের বিরুদ্ধে পুত্রবধূর অভিযোগের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি জানান, ছেলের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকেও মারধর এবং অপমানের শিকার হতে হয়। নিজের গর্ভে ধারণ করা ছেলে যা বলে তা মুখে উচ্চারণ করা যায় না। তিনি জানান, আমার ছেলে বলে- আমি নাকি বাহিরের লোক এনে পুতেরবৌ নাতি দিয়ে ব্যবসা করি। স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটা থেকে তাকেও বের করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে তিনি ওই বাড়িতেই থাকতে চান।


তিনি আরও জানান, ছেলে চাইলে অন্য জমিতে ঘর করে থাকতে পারে।


ইব্রাহিমের বোন শেফালী পারভীনের ভাষ্য- আমার ভাই মাদকাসক্ত, জালেম, বৌ ছেলে মেয়ে এমন কী আমার মাকেও সে মারধর করে। আমি চাই আমার মা নাতি ও বৃষ্টি আমার পৈতৃক ভিটায় থাকবে। ভাই নতুন বিয়ে করেছে তার যেখানে খুশি সেখানে থাক।


অভিযোগের বিষয়ে ইব্রাহিম মোল্যা জানান, বৃষ্টির চরিত্র ভালো নয়। তিনি তার সংসার ধ্বংস করেছেন। তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে । বৃষ্টি কোথায় যাবেন, তা তিনি জানেন না। তার মা ও সন্তানরা তার সঙ্গেই থাকবেন। বৃষ্টি নিজেই নিজের শরীরে আগুন লাগিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।


বৃষ্টি তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপত্তা এবং দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে বসতবাড়িতে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন। একটি সম্পর্কের জন্য নিজের পুরোনো জীবন বিসর্জন দেওয়া বৃষ্টির সমাজের বিবেকবান মানুষের দিকে প্রশ্ন ছুড়েছেন- সব হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবে? সব পথ যখন রুদ্ধ তাহলে কী সন্তানদের নিয়ে আত্মহত্যা করবো?


বিবার্তা/মিলু/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com