একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির: শতবর্ষী অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উপাখ্যান
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:০৪
একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির: শতবর্ষী অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উপাখ্যান
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

একদিকে কাঁসর-ঘণ্টা ও উলুধ্বনির সুর, ঠিক তার মাত্র ছয় ফুট ব্যবধানে ভেসে আসে আজানের পবিত্র ধ্বনি। কোনো প্রাচীর নেই, নেই কোনো কৃত্রিম বিভাজন; একই আঙিনায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়। লালমনিরহাট জেলা শহরের কালীবাড়ি এলাকায় অবস্থিত ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ এবং ‘কালীবাড়ি কেন্দ্রীয় মন্দির’ যুগ যুগ ধরে বহন করে চলেছে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহনশীলতার এক মহিমান্বিত স্মারক।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৩১ সালে এই স্থানে প্রথম মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে আশপাশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মপ্রাণ মানুষের কথা বিবেচনা করে হিন্দু সম্প্রদায়ের আন্তরিক সম্মতিক্রমে একই উঠানে নির্মিত হয় মসজিদটি। সেই থেকে আজ অবধি পাশাপাশি থেকে স্পন্দিত হচ্ছে দুটি ভিন্ন বিশ্বাসের হৃদয়।


একই আঙিনায় প্রতিদিন সুবিন্যস্ত নিয়মে উচ্চারিত হয় আল্লাহর জিকির ও দেব-দেবীর স্তুতি।


দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী ধরে এখানে বজায় রয়েছে পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও নিখাদ শৃঙ্খলা। প্রতিদিন আজানের সময় থেকে মসজিদে জামাত শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাক-ঢোল, কাঁসর, বাদ্যযন্ত্র ও মাইক বাজানো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হতেই আবার পরম স্বাভাবিকতায় প্রজ্জ্বলিত হয় আরতির আলো, শুরু হয় মন্দিরের আচার-অনুষ্ঠান। দুই সম্প্রদায়ের প্রবীণদের পারস্পরিক আলোচনা ও মমত্ববোধের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছিল এই যৌথ আঙিনা; কালক্রমে পার হয়ে গেছে বহু দশক, কিন্তু বিশ্বাসের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও এক চুলও নড়েনি।


বিশেষ করে শারদীয় দুর্গাপূজা কিংবা পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো প্রাক-উৎসবগুলোতে এই প্রাঙ্গণের রূপ আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। পূজা চলাকালে নামাজের সময়গুলোতে হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবকরা পরম যত্নে খেয়াল রাখেন যেন কোনো বাদ্যযন্ত্র বা গোলযোগ না ঘটে। অন্যদিকে, ঈদের দিন নামাজ শেষে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা পূজামণ্ডপে গিয়ে শুভেচ্ছা ও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।


এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা আবেগপ্লুত কণ্ঠে জানান, “আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে এই যৌথ উপাসনালয় দেখে আসছি। আজ পর্যন্ত কখনো কোনো বিবাদ বা অপ্রীতিকর ঘটনার রেখাপাত ঘটেনি এখানে। ধর্ম যার যার হতে পারে, কিন্তু সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বাঁধন আমাদের সবার।”


লালমনিরহাটের এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণটি আজ আর কেবল স্থানীয়দের প্রার্থনাস্থলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের জন্য এটি এক অনন্য তীর্থস্থান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ এই মেলবন্ধন দেখে অভিভূত হন। সংঘাতময় বিশ্বে লালমনিরহাটের এই উঠান যেন শান্তি, মানবিকতা ও ভাইচারার এক জীবন্ত পাঠশালা।


মন্দিরের ভক্ত বাবু কিশোর চন্দ্র বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন অন্য বিশ্বাসকে কীভাবে সম্মান করতে হয়। আজানের ধ্বনি কানে আসামাত্রই আমাদের ঢাকিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাঠি থামিয়ে দেন। এটি এখন আমাদের বিশ্বাসের অঙ্গ হয়ে গেছে।”


একই সুর প্রতিধ্বনিত হলো মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেনের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “আমরা যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত শান্তিতে পাশাপাশি ইবাদত করে আসছি। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা ও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ আমাদের এই আঙিনা।”


গত শুক্রবার রাতে মসজিদ ও মন্দির প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে গিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “বর্তমান বিশ্বে যখন নানা স্থানে অস্থিরতা দৃশ্যমান, তখন লালমনিরহাটের এই যৌথ আঙিনা সমগ্র পৃথিবীর সামনে শান্তি, সামাজিক সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার এক উজ্জ্বল ও চিরন্তন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।”


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com