নোনাজলের চাপে শরীর-সংসার
আড়ালে উপকূলীয় নারীর মনের ক্ষত
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪২
নোনাজলের চাপে শরীর-সংসার
প্রতিবেদকের নেয়া সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুসন্ধানী জরিপ। এটি পুরো উপকূলের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে এ থেকে বোঝা যায় পরিবেশগত চাপ কীভাবে দারিদ্র্য ও বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে মিলে নারীর ঝুঁকি বাড়ায়।
আঙ্গুর নাহার মন্টি, সাতক্ষীরা থেকে ফিরে
প্রিন্ট অঅ-অ+

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরার উপকূলে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে নোনাপানি। আম্পানের সময় ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন শ্যামনগর উপজেলা গাবুরার কাজল আক্তার (২৯)। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সংকটের মধ্যে তিনি মৃত সন্তান জন্ম দেন। শোকের সময়ে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকেই দোষারোপ ও নির্যাতন করেন। সন্তান ধরে রাখতে না পারার দায় চাপিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে স্বামী তালাক দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন।



প্রায় ছয় বছর পর গত আগস্টে চাকবারা গ্রামে ভাঙা বেড়িবাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন কাজল। তাঁর কথায়, “নদী ভাঙলো, বাঁধ ভাঙলো, ঘরে নোনা পানি ঢুকলো। তাতে আমার কী দোষ ছিল? সন্তান ধরে রাখতে পারিনাই বইলা আমারে তাড়ায়ে আরেকডা বিয়া কইরা ফেললো।”



একসময় খোলপেটুয়া নদীতে চিংড়ির পোনা ধরতেন কাজল। দীর্ঘ সময় নোনাপানিতে কাজ করতে গিয়ে ত্বকে চুলকানি ও সংক্রমণের সমস্যাও হয়েছে বলে জানান তিনি। এখন নদীতে নামতে পারেন না; ভাইয়ের মুদি দোকানে সহযোগিতা করেন। সন্তান-সংসার হারানো, অপমান ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাঁর জীবনে স্থায়ী ক্ষত হয়ে আছে।


উপকূলের নারীদের অভিজ্ঞতা এক নয়, কিন্তু ক্ষতির ধরণগুলো যেন একই সূত্রে গাঁথা। পদ্মপুকুরের মনিরা খাতুন (৪৫) নদীভাঙনে দুই বিঘা কৃষিজমি ও বসতভিটা হারিয়েছেন। এখন বাবার বাড়িতে থেকে সেলাই ও ছোটখাটো কাজ করে চলেন। অন্যদিকে, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপ নগরের শামসুন্নাহারের (ছদ্মনাম) স্বামী আম্পানের পর কাজের জন্য খুলনায় যান। পরে স্বামী অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে তাঁকে আনুষ্ঠানিক বিয়েবিচ্ছেদ ছাড়াই পরিত্যাগ করেন। ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকা শামসুন্নাহার জানান, তিনি অনিশ্চয়তাও হাল না ছেড়ে এখন স্থানীয় কলেজে স্নাতক পর্যায়ে পড়ছেন। তবে তাঁর মেয়েটি এখনো ঘুমের মধ্যে বাবার নির্যাতনের স্মৃতিতে কেঁপে ওঠে।


সাতক্ষীরার উপকূলে গত দুই দশকে সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯), ফণী ও বুলবুল (২০১৯), আম্পান (২০২০), ইয়াস (২০২১), সিত্রাং (২০২২) ও রেমালসহ (২০২৪) একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ হয়। এসব দুর্যোগের সঙ্গে দারিদ্র্য, জীবিকার সংকট এবং বিদ্যমান জেন্ডার বৈষম্য যুক্ত হয়ে নারীদের অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকা হারানোর সেই বিপর্যয়ের ক্ষত অনেকের জীবনেই এখনো শুকায়নি। তবে সব ক্ষতি চোখে দেখা যায় না। বিশেষ করে নারীদের শরীর, মন, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্পর্কে তৈরি হওয়া ক্ষত অনেক সময় থেকে যায় আড়ালে।


এ প্রসঙ্গে সাতক্ষীরা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানোর ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা নারীদের মানসিক চাপ বাড়ায়। কৃষি ও স্থানীয় কাজের সুযোগ কমে গেলে পরিবারের সদস্যরা কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যান। কখনো পরিবারের ব্যয় কমানোর যুক্তিতে কিশোরীদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। অপরিণত বয়স, সংসার পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব ও আর্থিক নির্ভরতা দাম্পত্য সংকট বাড়াতে পারে। সন্তানসহ তালাকপ্রাপ্ত নারীদের আবাসন ও জীবিকার অনিশ্চয়তাও তীব্র হয়।


তাঁর মতে, নারীদের ক্ষতি বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, নির্দিষ্ট সূচকভিত্তিক মূল্যায়ন এবং নারী ও শিশুকেন্দ্রিক টেকসই কর্মসূচি প্রয়োজন। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও পানি ও সুরক্ষাসেবা চালু রাখা এবং অভিযোজন পরিকল্পনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।



বিচ্ছেদ, সহিংসতা ও মর্যাদাহানি


গাবুরার জেসমিন খাতুনের (৩৬) পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার আগেই বিয়ে হয়। আইলার পর তাঁর তিন মাস বয়সী সন্তান মারা যায়। পরে প্রজননস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসার টাকা চাইতে গিয়ে স্বামীর মারধর ও অপমানের শিকার হন। একপর্যায়ে স্বামী তাঁকে তালাক দিয়ে আরেকটি বিয়ে করেন। এখন চিকিৎসা ও জীবন চালাতে গ্রামে গ্রামে শাড়ি বিক্রি করেন জেসমিন।


একই এলাকার আসমা খাতুনের (৩৫) স্বামী চার বছর আগে কাজের সন্ধানে শহরে গিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তিনি এখন বাবার বাড়িতে থাকেন এবং শুঁটকি মাছ বিক্রি করেন। মুন্সিগঞ্জের মাজিদা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১১ বছর বয়সে। স্বামী তাঁকে ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করায় ১০ বছরের ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকছেন তিনি।


কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ভাঙনে জমি ও বাড়ির বড় অংশ হারিয়েছেন জিন্নাতুন্নেছা (৪০)। মুদি দোকান চালানো ও সবজি চাষের চেষ্টা করলেও লবণাক্ততায় বাড়ির আঙিনার ফসল নষ্ট হয়। ইটভাটায় কাজ করতে যাওয়া তাঁর দিনমজুর স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছেন। তিন ছেলে অন্যত্র চলে গিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করছে। চকবারার আফরোজা খাতুন (৩৮) পাঁচ বছর আগে স্বামীর পরিত্যক্ত হওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এখন চিংড়িঘেরে কাজ করেন।


শৈশব থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পদ্মপুকুরের ফাতেমার (৩০) বাল্য বিয়ে হয়েছিল। স্বামী তাঁর চেয়েও বয়সে অনেক বড় এবং প্রতিবন্ধী ছিলেন। এক সন্তান হওয়ার পর স্বামী তাঁকে নির্যাতন করে ছেড়ে যান এবং আরেকটি বিয়ে করেন। প্রতিবন্ধিতার কারণে আইনি প্রতিকার পাননি বলে জানান ফাতেমা। এখন বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে থাকেন। প্রতাপনগরের স্বপ্না খাতুন (৪১) সিডর ও আম্পানে বাড়িঘর হারানোর পর স্বামীর পরিত্যক্ত হন। দুই সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকটপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন; দুর্যোগপ্রবণ উপকূলে এ হার ৮১ শতাংশ। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ‘স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স গার্লস ২০২৬’ প্রতিবেদনে জলবায়ু বিপর্যয়ের পর উপকূলে ২৮ শতাংশ নারী ও কিশোরীর বাল্যবিয়ে, বিচ্ছেদ, পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।


পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমজাদুল ইসলাম বলেন, বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকলে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। তিনি জানান, তার ইউনিয়নে দারিদ্র্য ও যৌতুকসংক্রান্ত বিরোধ থেকেও বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। ইউনিয়ন পরিষদে আসা অভিযোগের প্রায় ৮০ শতাংশ সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা হয় বলে তাঁর দাবি; সমাধান না হলে জেলা লিগ্যাল এইড, বিচারিক কর্তৃপক্ষ বা আদালতে পাঠানো হয়। তবে নারীদের অভিজ্ঞতাকে অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলেও তিনি স্বীকার করেন।



জেন্ডার ও নারী অধিকার বিশ্লেষক ফারহানা হাফিজের মতে, জলবায়ু-সম্পর্কিত ক্ষতিকে শুধু পরিবেশ বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে দেখলে মানবাধিকার, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামো আড়ালে থেকে যায়। নারীর মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির নিয়মিত মূল্যায়ন, নির্দিষ্ট বাজেট এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।




নোনাপানিতে প্রজননস্বাস্থ্য ও শরীরের ক্ষত


গাবুরার নাসিমা খাতুন (৩২) দুই সন্তানের খাবার জোগাতে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলপেটুয়া নদীর নোনাপানিতে নেমে চিংড়ির রেণু পোনা ধরেন। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় ত্বকে অ্যালার্জি, সংক্রমণ ও যৌনাঙ্গে ক্ষত হয়েছে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না।


সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানোর পর গাবুরার আকলিমা খাতুন ‘অপয়া’ বা ‘স্বামীখেকো’ অপবাদের শিকার হন। জরায়ুর সংক্রমণসহ শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বলে জানান তিনি এবং নোনাপানিতে কাজের সঙ্গে অসুস্থতার সম্পর্ক অনুভব করেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সোনিয়ার (২৩) বিয়ে হয়। ত্বকের রং কালচে হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ও ইভ টিজিং তাঁর বাল্যবিয়েতে ভূমিকা রেখেছিল বলে জানান তিনি। তাঁর শাশুড়ি শাহিদা বেগমের (৪৫) বিয়ে হয় ১০ বছর বয়সে; ১৩ বছর বয়সে তিনি মা হন।


সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) চলতি বছরের ‘উপকূলীয় নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন’ গবেষণায় জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলের ৮২ শতাংশ নারী ও কিশোরীর বিভিন্ন প্রজনন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত জটিলতার কথা বলা হয়েছে। এতে দৈনন্দিন নোনাপানির সংস্পর্শ ও পানি সংগ্রহের অতিরিক্ত শারীরিক চাপের সঙ্গে সমস্যাগুলোর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফারহানা ফেরদৌস ও সালমা বেগমের তুলনামূলক গবেষণার বরাতে বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ত উপকূলে নারীদের অনিয়মিত ঋতুস্রাবের হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ; সাধারণ এলাকায় ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। জননাঙ্গে চুলকানি ও সংক্রমণের হার যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ২ ও ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ; তলপেটে ব্যথা ৩৫ দশমিক ৪ ও ২০ দশমিক ২ শতাংশ; গর্ভাবস্থার জটিলতা ৪৮ দশমিক ৬ ও ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ।


সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, উপকূলের নারীদের জরায়ুর নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য সরাসরি লবণাক্ত পানিকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই; বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। তবে চিকিৎসা নিতে এসে শ্যামনগর ও আশাশুনির কিছু নারী মাসিক বন্ধ রাখতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খাওয়ার কথা বলেছেন।



পদ্মপুকুরের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ, দীর্ঘ সময় নদীতে কাজ করা নারী-পুরুষ সবারই ত্বক ও প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা দেখা যায়। দারিদ্র্য, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নারীদের ঝুঁকি বাড়ায়।




পানির সংকট, বাড়তি শ্রম ও মানসিক স্বাস্থ্য


নিরাপদ পানির অভাব নারীদের দৈনন্দিন শ্রম বাড়ায়; কমে বিশ্রাম, পড়াশোনা, আয় এবং চিকিৎসার সময়। শ্যামনগর ও আশাশুনির প্রত্যন্ত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পানি শোধনাগার ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অনেক পরিবারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক দেয়া হয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় এখনও অনেক কম। ফলে অনেক নারীকে প্রতিদিন পানি সংগ্রহে দূরের পথ পাড়ি দিতে হয়।


পানি সংগ্রহে প্রায় একই ধরণের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জের হীরা ও পার্বতী, বুড়িগোয়ালিনীর দীপা রানি ও তৃপ্তি রানি, পদ্মপুকুরের পারুল এবং প্রতাপনগরের স্বপ্না। তারা জানান, নিরাপদ পানি আনতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। পাশাপাশি ঘরের কাজ সামলাতে হয়; অসুস্থতার কারণে কাজ করতে না পারলে পরিবারের বকুনিও শুনতে হয়। অন্যদিকে খাবার পানি ছাড়া বাকিসব কাজই তাদের নোনা পানিতে সারতে হয়। ফলে প্রজননস্বাস্থ্য ও ত্বকে চুলকানিসহ নানা রোগেও ভুগছেন অনেকে। অভাবের কারণে তারা এসব সমস্যার চিকিৎসা নিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।


বিবিএস ও অক্সফামের ২০২৬ সালের ‘বাংলাদেশে অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ ও ক্ষয়ক্ষতি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ কাজে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, পুরুষদের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ইউএনডিপির ২০২৫ সালে প্রকাশিত ও চলতি বছরে হালনাগাদ করা উপকূলীয় পানিসংকট বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক নারীকে প্রতিদিন নিরাপদ পানির জন্য দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হয়; একাধিকবার পানি সংগ্রহে কারও কারও ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যয় হয়। পথে কটূক্তি, হয়রানি ও সম্মতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়াও তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য হুমকি।


গাবুরার কুসুম নাহার (ছদ্মনাম) স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পর তীব্র মানসিক কষ্টে ভুগেছেন বলে পরিবার জানিয়েছে। চিকিৎসার বদলে তাঁর অবস্থাকে ‘ভূতে ধরা’ হিসেবে দেখা হয়; অবহেলার পাশাপাশি তাঁকে শারীরিকভাবে বেঁধে রাখার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।


বিএমসি উইমেনস হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় উপকূলীয় বাংলাদেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ৪ হাজার ৬৯৩ জন বিবাহিত নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন এবং ২৪ দশমিক ৯ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ওয়াশ ডেভেলপমেন্ট ও আইওয়াপের একটি গবেষণা এবং ফ্রান্স-সেনেগাল বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাকের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, আইসিডিডিআর,বি ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায়ও নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে নারীদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।



মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী মনিরা রহমানের মতে, অসুস্থতার সঙ্গে পরিবার থেকে দোষারোপ, তালাক, সামাজিক কলঙ্ক ও অবহেলা যুক্ত হলে নারীর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, জেন্ডার-সংবেদনশীল মূল্যায়ন, মানসিক আঘাত সম্পর্কে সচেতন স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং সম্পত্তি ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।



৪৫ নারীর অভিজ্ঞতা: ক্ষতির হিসাবে নেই যারা


গত ১৬–২১ আগস্ট সাতক্ষীরা সদর, শ্যামনগর ও আশাশুনির বিভিন্ন এলাকায় ৪৫ নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন (৬৮.৯ শতাংশ) পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদাহানি ও নির্ভরশীলতার কথা বলেছেন; ২৬ জন (৫৭.৮ শতাংশ) বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন; ৩৬ জন (৮০ শতাংশ) স্বামীর মারধর, বিবাহবিচ্ছেদ বা পরিত্যাগের অন্তত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ৪০ জন (৮৮.৯ শতাংশ) মানসিক আঘাত বা চাপ, ছয়জন (১৩.৩ শতাংশ) নিজের বা সন্তানের প্রতিবন্ধিতার কথা জানিয়েছেন; ২২ জন (৪৮.৯ শতাংশ) কুসংস্কার, সামাজিক কলঙ্ক বা মৌখিক হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। ৩৭ জন মনে করেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও লবণাক্ততা তাঁদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।


এটি ছোট পরিসরের সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুসন্ধানী জরিপ। এটি থেকে পুরো উপকূলের নারীদের সমস্যার হার নির্ধারণ করা যায় না। একই নারীর একাধিক ধরনের ক্ষতির অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সব সমস্যার একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, এমনটাও বলা যায় না। তবে সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়, পরিবেশগত চাপ কীভাবে দারিদ্র্য ও বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে মিলে নারীর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


প্রতিকারে প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়নে গুরুত্ব


জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩–২০৫০), জলবায়ু পরিবর্তন ও জেন্ডার কর্মপরিকল্পনা (২০২৪) এবং জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৪) অভিযোজন, স্বাস্থ্য ও জেন্ডার সুরক্ষার নীতিগত ভিত্তি দিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ক্ষতির নথিবদ্ধকরণ, প্রতিকার, অর্থায়ন এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তার ধারাবাহিকতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।



পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন উইংয়ের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, পরিবেশগত চাপের সঙ্গে জেন্ডার বৈষম্য, দারিদ্র্য ও দুর্বল সুরক্ষা যুক্ত হলে নারীর দুর্ভোগ বাড়ে। তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া স্বাস্থ্যসমস্যা, সহিংসতা বা বিবাহবিচ্ছেদের সব ঘটনাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা যাচ্ছে না। শক্তিশালী তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়ন ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।



তিনি আরও বলেন, জলবায়ু-সংবেদনশীল স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও জেন্ডার সমতা নিয়ে সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। নারীর অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির মূল্যায়ন ও প্রতিকারের জন্য আন্তর্জাতিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।


উপকূলের নোনাপানি চোখে দেখা যায়। দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ক্ষতিও। কিন্তু সেই পানির অভিঘাতে কোনো নারী যখন সন্তান হারান, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন, সংসার ও সামাজিক মর্যাদা হারান, কিংবা দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকেন—তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ শুধু জমি, ঘর বা আয়ের হিসাব দিয়ে সম্ভব নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ক্ষতি শনাক্ত করতে প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক গবেষণা, নারীর অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি, দীর্ঘমেয়াদি সেবা এবং কার্যকর প্রতিকার। তা না হলে জলবায়ু ন্যায়বিচারও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।


(প্রতিবেদনটি আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সহযোগিতায় তৈরি)


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com