
শিশুরা মহান আল্লাহর দেওয়া অমূল্য নিয়ামত। জাতির ভবিষ্যৎ।
পবিত্র কোরআনে ধন-সম্পদ ও সন্তানকে দুনিয়ার জীবনের শোভা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা। আর স্থায়ী সৎ কাজ তোমার রবের নিকট প্রতিদানে উত্তম এবং প্রত্যাশায়ও উত্তম।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৪৬) তাই শিশুকে বোঝা মনে করা নয়, তাকে ভালোবাসা, রক্ষা করা এবং তার মনের প্রতি যত্নশীল হওয়া ঈমানদারের দায়িত্ব।
শিশুর প্রতি দয়ার শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হয়ে সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়া উচিত।
শিশুর প্রথম আশ্রয় তার পরিবার। সুরা বনি ইসরাঈলে মা-বাবার প্রতি দয়ার কথা বলার সময় আল্লাহ বলেন, “আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৪)
এই আয়াতে মা-বাবার প্রতি বিনয়ী আচরণের আদেশের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয় পরোক্ষভাবে স্পষ্ট হয়ে যায়, শিশুদের যত্নসহকারে লালন-পালন করতে হয়।
কারণ শিশুর প্রতি দয়া আসলে ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগ। দুনিয়ায়ও, আখিরাতেও।
শিশু মানেই চঞ্চলতা, দুষ্টুমি এবং কান্না। অনেকে এসব পছন্দ করেন না, বিরক্ত হন, এমনকি শিশুর উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু এগুলো শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অংশ।
শিশু কথা বলতে পারে না বলেই কাঁদে, নতুন পৃথিবী বোঝে বলেই প্রশ্ন করে এবং খেলার মধ্য দিয়ে শেখে। তাই এসব ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। এটা আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর শিক্ষা। হাদিস শরিফে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে নামাজ শুরু করি। কিন্তু পরে শিশুর কান্না শুনে আমার নামাজ সংক্ষেপ করে ফেলি। কেননা, শিশু কাঁদলে মায়ের মন যে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে তা আমি জানি। (বুখারি, হাদিস : ৭০৯)
নামাজের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতেও আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) শিশুর কষ্টের কথা বিবেচনা করে কিরাত সংক্ষেপ করতেন। তাই আমাদের সামাজিক আচরণবিধিতেও শিশুর প্রতি নম্র ও আদরসুলভ ব্যবহার থাকা উচিত। কারণ কখনো কখনো শিশুর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণের কারণে মহানবী (সা.)-এর উম্মতের খাতা থেকে নাম কাটা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না, বড়দের সম্মান করে না, সৎ কাজের নির্দেশ দেয় না এবং অসৎ কাজে বাধা দেয় না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯২১)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, শিশুর প্রতি দয়া শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। প্রতিবেশী, শিক্ষক, আত্মীয়, অপরিচিত মানুষ ও শিশুর সঙ্গে ভদ্র ও কোমল আচরণ করতে হবে।
শিশুর মনে আঘাত দেওয়া থেকে বিরত থাকাও এই দয়ার অংশ। অপমান, কটূক্তি, উপহাস বা অকারণে ধমক শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে। শিশুর সামনে তার ভুল বারবার তুলে ধরা, তাকে তুলনা করা বা বিদ্রুপ করাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে; বরং নরম ভাষায় বোঝানো, ভুল শুধরে দেওয়া এবং উৎসাহ দেওয়াই ইসলামের শিক্ষা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমল, তিনি সব কাজে কোমলতা পছন্দ করেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৯৫)
অতএব, শিশুর প্রতি দয়া করতে হবে। কোনো ফরমেটে তাদের প্রতি সহিংস আচরণ করা যাবে না। শিশুর প্রতি দয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি ঈমান ও মানবতার পরিচয়। আমরা যদি শিশুর কান্না, দুষ্টুমি ও চঞ্চলতাকে ধৈর্য ও স্নেহ দিয়ে গ্রহণ করি, তাদের মনে আঘাত না দিয়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিই, তাদের পরম স্নেহের সঙ্গে ইসলামের রীতি-নীতি শিক্ষা দিই, তবে সেই শিশুরাই একদিন দয়াশীল, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি শিশুকে প্রকৃত মুমিন ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দান করুন। আমিন।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]