অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন বদলে দেবে এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:০৬
অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন বদলে দেবে এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের মালিক হবার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সাথে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি করেছে অস্ট্রেলিয়া। এই চুক্তিকে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছে যে শুধু চীনের চোখ-রাঙানিকেই তারা উপেক্ষা করছে তা নয়, তাদের নেটো মিত্র ফ্রান্সকেও ক্ষেপিয়ে তুলতে দ্বিধা করেনি।


চুপিসারে এবং অত্যন্ত গোপনে এ চুক্তির আলোচনাগুলো করা হয়- আর তা ঘোষণা করার ঠিক আগে একেবারে শেষ মুহূর্তে ফ্রান্সকে স্তম্ভিত করে অস্ট্রেলিয়া জানিয়ে দেয়- তারা ফ্রান্সের কাছ থেকে ১২টি ডিজেলচালিত সাবমেরিন কেনার জন্য করা চার হাজার কোটি ডলারের চুক্তিটি বাতিল করছে।


যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপ আর এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে বলছেন- এক মোড়-বদলকারী ঘটনা, যা পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত হিসেব-নিকেশ পাল্টে দেবে।


‘চুক্তিভঙ্গ’, ‘পিঠে ছুরিকাঘাত’, ‘বেইমানি’ - এরকম কথা শুনতে হয় হোক, পারমাণবিক সাবমেরিন আমাদের লাগবেই’ অস্ট্রেলিয়ার ভাবখানা ছিল এই রকমই। কিন্তু কেন?


পৃথিবীতে এখন মাত্র ছয়টি দেশের হাতে পারমাণবিক সাবমেরিন আছে। এরা হলো, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ভারত।


এর সুবিধাটা কী? সহজ কথায়, পরমাণু-শক্তিচালিত সাবমেরিন শত্রুপক্ষের চোখ এড়িয়ে গভীর সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকতে এবং দ্রুত চলাচল করতে পারে - আর তার উপস্থিতি চিহ্নিত করাও অনেক কঠিন।


সাধারণ সাবমেরিনের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে- এগুলো হয় ডিজেল বা বৈদ্যুতিক শক্তিচালিত। ডিজেল ইঞ্জিনে জ্বালানি পোড়ানোর জন্য বাতাস দরকার, আর ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের জন্য ঘন ঘন রিচার্জ করা দরকার।


এ কারণে সবচেয়ে উন্নত ধরনের ‘কনভেনশনাল’ সাবমেরিনও এক নাগাড়ে কয়েক দিনের বেশি পানির নিচে ডুবে থাকতে পারে না। তাদের জ্বালানির জন্য পানির ওপর ভেসে উঠতে হয়, বা বাতাস নেবার নলটিকে পানির ওপরে ভাসিয়ে রাখতে হয়।ফলে তা শত্রুপক্ষের চোখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।


অন্যদিকে এখন যেসব পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি হচ্ছে- সেগুলো কোন রিফুয়েলিং ছাড়াই মাসের পর মাস পানির নিচে থাকতে পারে। এগুলো অনেক বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে এবং তা অনেক বেশি দূর পর্যন্ত নিক্ষেপ করতে পারে।


সুতরাং পরমাণু-শক্তিচালিত সাবমেরিনের মালিক হবার পর অস্ট্রেলিয়ান সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। তারা অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে প্রশান্ত মহাসাগরের বহুদূর পর্যন্ত এলাকায় গোপন নজরদারি ও টহল দিতে পারবে।


অস্ট্রেলিয়া মনে করছে, এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব ও হুমকি এতটাই বেড়ে গেছে যে তা মোকাবিলা করতে হলে ঠিক এই জিনিসটাই তাদের দরকার, ডিজেলচালিত সাবমেরিনে তাদের চলবে না।


অস্ট্রেলিয়া পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর দানকারী একটি দেশ। তাই তাদের পক্ষে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বা তা মোতায়েন করা নিষিদ্ধ।


তাই মনে করা হচ্ছে, খুব সম্ভবত এই পারমাণবিক সাবমেরিনে প্রচলিত, সাবমেরিন-থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল থাকবে।


কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু এটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন- তাই এতে যদি শুধু প্রচলিত অস্ত্রই থাকে এবং এতে কোন বিদেশী ক্রু না-ও থাকে- তার পরও এটা প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নৌ-শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারবে।


এগুলো তৈরি হবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এ্যাডিলেইডে এবং এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য প্রযুক্তি ও পরামর্শ দেবে। কমপক্ষে আটটি সাবমেরিন তৈরি হবে, তবে এগুলো কোথায় মোতায়েন হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।


আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সাবমেরিনগুলোয় যে পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করা হয়, তা খানিকটা স্নায়ুযুদ্ধের যুগের মত। এতে জ্বালানি হিসেবে যে ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়- তা পরমাণু বোমা তৈরির উপযুক্ত অতি-উচ্চস্তরের ইউরেনিয়াম।


ওয়াশিংটন অনেকদিন ধরেই এই স্তরের জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করে কম-বিপজ্জনক জ্বালানি চালু করতে কাজ করছে- যাতে এগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে না পড়ে এবং যা অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা কঠিন।


তবে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে খুব সম্ভবত অতিউচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই ব্যবহার করা হবে। এতে বোঝা যায় বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।


এ বিষয়ে স্টিমসন সেন্টারের ইস্ট এশিয়া প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক ইউন সান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যে পরমাণু শক্তির অধিকারী নয় এমন একটি দেশকে এই প্রযুক্তি রফতানি করতে একমত হয়েছে- সেটা এখন স্পষ্ট, এবং এটাই এ চু্ক্তির অনন্য বৈশিষ্ট্য।


গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফাণ্ডের এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক বনি গ্লেজার বলেছেন, একটা অভিন্ন উপলব্ধি কাজ করছে যে সংঘাতের ঝুঁকি দূর করা এবং তা মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকাটা আমাদের জন্য দরকার এবং চীনের সামরিক ক্ষমতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদ্বেগ যে ক্রমশঃই বাড়ছে - তাও এতে বোঝা যায়।


বিশ্লেষকরা বলেছেন, অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করতে দেয়ার মধ্যে দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করতে এক বিশাল পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।


যুক্তরাষ্ট্র এর আগে সবশেষ পারমাণবিক সাবমেরিন প্রযুক্তি বিনিময় করেছিল ১৯৫৮ সালে এবং তা হয়েছিল ব্রিটেনের সাথে। এর পর আর কোন মিত্রের সাথে তারা এই প্রযুক্তি হস্তান্তর করেনি।


ওয়াশিংটন ও লন্ডন থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য চীন নয়। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন - অস্ট্রেলিয়াকে এ প্রযুক্তি দেয়ার পেছনে চীনকে ঠেকানো ছাড়া আর কোন কারণ থাকতে পারে না।


সাবেক অস্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা অধ্যাপক হিউ হোয়াইট বলেছেন, এক নতুন স্নায়ু যুদ্ধের কথা।


তিনি বলেন, এর মধ্যে দিয়ে এই অনুভূতি গভীর হচ্ছে যে এশিয়াতে সত্যি এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধ হচ্ছে, এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রই জিতবে বলে অস্ট্রেলিয়া বাজি ধরেছে। চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ব্যবস্থার সাথে অস্ট্রেলিয়া যুক্ত এবং এটা হলো তাকে আরো গভীর করার এক সিদ্ধান্ত।


চুক্তিটিতে এই তিন দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময়ের কথাও আছে- তবে মূল জিনিসটি হলো পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিক্রি করা হবে টোমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।


বাইডেন প্রশাসন- ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব খর্ব করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে- অর্থনৈতিক, সামরিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে।


গত আট মাসে চীন যেন সেমিকণ্ডাকটর সামগ্রীর মত কিছু উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হাতে না পায়- সেই পথ বন্ধ করেছে বাইডেন প্রশাসন। এ ছাড়া তারা হুয়াওয়েকে প্রত্যাখ্যানের জন্য বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানিয়েছে, তাইওয়ানের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে, হংকং এ চীনের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।


বাইডেন নিজে গত সপ্তাহে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর সাথে ফোনে কথা বলেছেন। নব্বই মিনিটের এ আলাপের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে খুবই কম।


চলতি সপ্তাহেই বাইডেন ‘কোয়াড’-এর নেতাদের সাথে বৈঠক করবেন। যাতে থাকবেন জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার নেতারা।


যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার পর এবং ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর তারা একসাথে মিলে চীনের হুমকি এবং এশিয়া-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের ব্যাপারে আরো মনোযোগী হতে চাইছে। আর অস্ট্রেলিয়া ওই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় ক্রমশঃই আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিল, তাই এখানে অভিন্ন স্বার্থের মিলন ঘটেছে।


চীন-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক কেন খারাপ হলো?


চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব আছে এবং বহু চীনা ছাত্র অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করে।কিন্তু এই সাবমেরিন চুক্তির পর অস্ট্রেলিয়া এখন নিজেকে চীনের বৈরী দেশে পরিণত করেছে।


করোনাভাইরাস মহামারির উৎস সন্ধানের এক বৈশ্বিক তদন্তে অস্ট্রেলিয়া সমর্থন দেবার পরই দুদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়। এরপরই দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা গভীরতর করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া।


পারমাণবিক সাবমেরিন পেলেই অস্ট্রেলিয়া যে চীনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে যাবে তা নয়, তবে এতে ওই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে যাবে। সূত্র: বিবিসি।


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com