রক্তস্বল্পতায় ভুগছে দেশের প্রায় অর্ধেক শিশু, কারণ ও করণীয়
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০১
রক্তস্বল্পতায় ভুগছে দেশের প্রায় অর্ধেক শিশু, কারণ ও করণীয়
ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল
প্রিন্ট অঅ-অ+

বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে—বিষয়টি কি আমরা জানি? এটা সত্যিই এলার্মিং। আমরা অনেকেই জানি না, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।


বাংলাদেশ এমআইসিএস ২০২৫-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১–৫ বছর বয়সী শিশুদের ৪৩.৯% রক্তস্বল্পতায় (Anaemia) আক্রান্ত। অর্থাৎ, প্রায় প্রতি দুই শিশুর একজন। রক্তস্বল্পতা মানে শুধু “রক্ত একটু কম”—খাওয়া-দাওয়া করলেই ঠিক হয়ে যাবে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।


রক্তস্বল্পতায় শিশুর কী ক্ষতি হতে পারে?


রক্তস্বল্পতা হলে শিশু—


* সহজেই দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে
* মনোযোগ কমে যেতে পারে
* পড়াশোনা ও শেখার আগ্রহ কমতে পারে
* শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব পড়তে পারে
* দীর্ঘস্থায়ী, বিশেষ করে আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় মস্তিষ্কের cognitive development বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে
* শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে
* ক্ষুধা কমে যেতে পারে এবং খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে
* খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা বা অতিরিক্ত অলসতা দেখা দিতে পারে
* মাঝারি বা তীব্র রক্তস্বল্পতায় শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড় হতে পারে
* গুরুতর রক্তস্বল্পতায় হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে


বিশেষ করে শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। তাই দীর্ঘদিনের রক্তস্বল্পতা শিশুর ভবিষ্যৎ শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।


কেন শিশুর রক্তস্বল্পতা হয়?


শিশুর রক্তস্বল্পতার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন—


১. আয়রনের ঘাটতি — সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর একটি।
২. কৃমি — কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ ও আয়রনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
৩. দীর্ঘদিনের অল্প অল্প রক্তক্ষরণ — অন্ত্রের পলিপ বা অন্যান্য সমস্যার কারণে হতে পারে।
৪. বংশগত রক্তের রোগ — যেমন থ্যালাসেমিয়া।
৫. অন্যান্য পুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতি — যেমন ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন B12 বা ভিটামিন A-এর ঘাটতি।
৬. Bone marrow-এর বিভিন্ন সমস্যা — কিছু ক্ষেত্রে রক্ত তৈরির প্রক্রিয়াতেই সমস্যা থাকতে পারে।


Hb কম দেখলেই কি আয়রন দেব?


এমন প্রশ্নে চিচিৎসকের পরামর্শ ‘না’।


শিশুর Hb কম দেখলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে, “আয়রনের ঘাটতি হয়েছে—তাই আয়রন খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”


বিশেষ করে—


* বারবার রক্তস্বল্পতা হলে
* Hb খুব কম হলে
* পরিবারে থ্যালাসেমিয়ার ইতিহাস থাকলে
* আয়রন দেওয়ার পরও Hb না বাড়লে


রক্তস্বল্পতার মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।


তাহলে করণীয় কী?


শিশুকে ফ্যাকাশে, দুর্বল, অস্বাভাবিক ক্লান্ত বা অলস মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী CBC (Complete Blood Count) এবং অন্যান্য পরীক্ষা করে রক্তস্বল্পতার কারণ নির্ণয় করা যায়।


একটি শিশুর সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সুস্থ মস্তিষ্কও প্রয়োজন।


রক্তস্বল্পতাকে ছোট সমস্যা মনে করে অবহেলা করবেন না।


সময়মতো সঠিক কারণ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা—একটি শিশুকে শুধু আজ সুস্থ রাখে না, তার ভবিষ্যৎ বিকাশ ও সম্ভাবনাকেও রক্ষা করতে পারে। তাই সচেতন হই। একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলা আমাদেরই দায়িত্ব।


লেখক : ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল, সহকারি অধ্যাপক -রক্তরোগ ও রক্তক্যান্সার বিভাগ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com