রাজনৈতিক দল এখন ক্ষমতাভিত্তিক ‘বিজনেস মডেল’: টিআইবি
নির্বাচন কমিশনের সৎ সাহসেরও অভাব
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:৪১
রাজনৈতিক দল এখন ক্ষমতাভিত্তিক ‘বিজনেস মডেল’: টিআইবি
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অঅ-অ+

ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও মনোনয়ন বাণিজ্য দলগুলোকে কার্যক্ষেত্রে একটি ক্ষমতাভিত্তিক ‘বিজনেস মডেলে’ রূপান্তর করেছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে দেশ পরিচালনায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও দলগুলোতে তৃণমূলের অংশগ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতির ফলে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক কর্তৃত্বপরায়ণতা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ক্রমাগত জাঁকিয়ে বসছে।


রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির মেঘমালা সম্মেলন কক্ষে (লেভেল-৫) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।


‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতা, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্রকাশনা থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়।


এসময় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও দলগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের চরম সংকট বিরাজ করছে বলেও জানান তিনি।


আইনি কাঠামোর দুর্বলতা-‘অর্থনির্ভর পৃষ্ঠপোষকতা’


গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রতিটি নির্দেশকেই ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। দেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও কার্যক্রম পরিচালনায় কিছু আইন ও বিধিমালা থাকলেও রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে কোনো সমন্বিত ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো নেই। বিদ্যমান আইনের প্রয়োগেও রয়েছে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের আইনি শর্ত আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক।


তিনি জানান, বিদ্যমান নিবন্ধন শর্তের কারণেই কার্যত ‘অর্থনির্ভর প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতা’ বা ক্লায়েন্টলিজম তৈরি হচ্ছে, যা দলগুলোকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য করে। ন্যূনতম শর্ত হিসেবে ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কোনো দলের কার্যালয় ও কার্যক্রম চালাতে যেখানে বছরে ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়, সেখানে সদস্যদের চাঁদা বাবদ ঘোষিত আয় হতে পারে সর্বোচ্চ ২৬ লাখ টাকা। একইভাবে সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক ব্যাপ্তি থাকলে বার্ষিক খরচ দাঁড়ায় ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা, যার বিপরীতে চাঁদা বাবদ সম্ভাব্য আয় মাত্র ১৪ থেকে ৩৮ কোটি টাকা। আর যেসব দলের সারা দেশে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃতি রয়েছে, তাদের বার্ষিক ব্যয় হয় ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, যার বিপরীতে চাঁদা থেকে আয় হতে পারে সর্বোচ্চ ১১৬ কোটি টাকা। আয়ের এই বিশাল পার্থক্যের কারণে দলগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, যার ফলে কালো টাকা ও অপরাধীকরণের পথ সুগম হয়।


মনোনয়ন বাণিজ্য ও ১০ বছর কাউন্সিলহীন দল


প্রতিবেদন উপস্থাপন পরবর্তী প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট ব্যর্থতা ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, দেশের প্রভাবশালী তিনটি রাজনৈতিক দল- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের নির্বাচনে একজন প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, যা দলগুলোর নিজস্ব নেতাদের বয়ানেই উঠে এসেছে। অথচ নির্বাচন কমিশনে দলগুলো বছরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল করে থাকে, যা চরম অবাস্তব ও উদ্বেগজনক।


দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রহীনতার উদাহরণ দিয়ে টিআইবি প্রধান উল্লেখ করেন, একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো কাউন্সিল আয়োজন করেনি। এ ছাড়া দেশের প্রায় ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত হয়ে থাকে। এর ফলে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মী ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর উঠে আসার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হচ্ছে এবং অভিজাততন্ত্রের জয়জয়কার চলছে।


সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জামায়াতসহ ৭ দলের গঠনতন্ত্র


প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের সাতটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র কোনো না কোনোভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। দলগুলো হলো- জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টি।


এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতার ঘাটতি তুলে ধরে তিনি জানান, গবেষণার জন্য তথ্য চেয়ে বারবার লিখিত আবেদন, টেলিফোনে যোগাযোগ ও সশরীরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ১০টি রাজনৈতিক দল টিআইবিকে কোনো ধরনের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি।


রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি- নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা


রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির পক্ষ থেকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে জানানো হয়, বিগত ১৩ বছর ৮ মাসে দেশে ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৪৬ হাজার ৩৫১ জন নেতাকর্মী আহত এবং ৭৪৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। এই সহিংসতা মূলত এক দলের সঙ্গে আরেক দলের এবং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ঘটেছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো সাধারণ মানুষের তথ্য সম্পূর্ণ আলাদা।


ড. ইফতেখারুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে চলমান সংঘাত ও ক্ষমতার রাজনীতির অবসান নিয়ে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।


নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা নির্ধারিত সীমার চেয়ে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি ব্যয় করলেও কমিশন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের যেমন সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, তেমনি তাদের সৎ সাহসেরও অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে কমিশন ততটুকুই কার্যকর হতে পারবে যতটুকু দেশের রাজনৈতিক দলগুলো চাইবে। দলগুলো পরিচালনা করতে বিশাল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয় বিধায় অর্থ উত্তোলনের স্বচ্ছ আইনি সংস্কার দরকার, যাতে দলগুলো অন্ধকারের লেনদেন বাদ দিয়ে প্রকাশ্যে ও বৈধ পথে তহবিল সংগ্রহ করতে পারে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com