রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে: টিআইবি
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৩৭
রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে: টিআইবি
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সাম্প্রতিক অধ্যাদেশগুলোতে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সংস্কারের পরিবর্তে এমন আইনগত কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যা কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।


সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।


তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করে আইনি সংস্কারে গতি দেখানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই জুলাই সনদের মূল চেতনা উপেক্ষিত হয়েছে। বরং সংস্কারের নামে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও সরকারি বিবেচনায় একের পর এক অধ্যাদেশ জারি হলেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বহু মৌলিক প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে সংস্কারের পরিবর্তে এমন আইনগত কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যা কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করছে।


ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার অংশ হিসেবে টিআইবি ধারাবাহিকভাবে আইন ও অধ্যাদেশের খসড়া পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই সুপারিশ গ্রহণ করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি খাতে যৌক্তিক প্রস্তাব উপেক্ষিত থাকায় সংস্থাটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।


সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আটটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি।


দুদক সংস্কার অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশনার সংখ্যা বৃদ্ধি, নারী কমিশনার ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি এবং সরাসরি এফআইআর করার ক্ষমতা দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা লঘু করার সুযোগ রাখাকে তিনি দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষার পথ বলে আখ্যা দেন। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোধে প্রস্তাবিত ইন্টিগ্রিটি ইউনিট বাতিল এবং পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা না থাকার বিষয়গুলোকে গুরুতর দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।


পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার মতে, প্রস্তাবিত কাঠামো একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনে ব্যর্থ হবে। সাবেক আমলা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য, সদস্য সচিব পদ সৃষ্টি এবং প্রাথমিক তিন বছরে অনির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ দেওয়াকে তিনি আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন।


জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও পরবর্তী সংশোধনে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই সীমিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কমিশনের আওতায় আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করায় কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


সব মিলিয়ে টিআইবির আশঙ্কা, সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষা করে প্রণীত এসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে। জুলাই সনদের চেতনা অনুযায়ী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণ হবে না বলেও তারা মনে করে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com