এক ব্যাগ বাজার করতে ক্রেতার পকেট শূন্য
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৮
এক ব্যাগ বাজার করতে ক্রেতার পকেট শূন্য
আবেদ হোসাইন
প্রিন্ট অঅ-অ+

সকাল হলেই রাজধানীর বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ে। কেউ হাতে বাজারের তালিকা নিয়ে ঘোরেন, কেউ দাম শুনে থমকে দাঁড়ান। কেউ পছন্দের মাছটি হাতে তুলে আবার রেখে দেন। কেউ এক কেজির বদলে আধা কেজি সবজি নেন। বাজারের দৃশ্য বদলায়নি। বদলে গেছে কেনার সামর্থ্য।


একসময় যে বাজারের ব্যাগ ভরতে কয়েকটি পণ্যই যথেষ্ট ছিল, এখন সেই ব্যাগ অর্ধেক ভরতেই শেষ হয়ে যায় নির্ধারিত বাজেট।ফলে বাজার করতে গিয়ে ক্রেতার সামনে এখন দুটি প্রশ্ন,কী কিনব? আর তার চেয়েও কঠিন কী বাদ দেব?


মিরপুর, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, আদাবর, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, মালিবাগ, রামপুরা সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস হাহাকার।


দামের আগুনে সবুজ বাজার
সবজির বাজারে এখন রঙের চেয়ে দামই যেন বেশি চোখে পড়ে।টমেটো ও গাজর ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি। লম্বা বেগুন ১০০, গোল বেগুন ১২০ টাকা। শিম প্রায় ২০০ টাকা কেজি।দেশি শসা ৮০ থেকে ৯০ টাকা, করলা প্রায় ১০০, কাকরোল ৮০ থেকে ১০০ টাকা।ঢেঁড়স, পটল, চিচিঙ্গা, ধুন্দল ও ঝিঙা প্রায় ৮০ টাকা কেজি। বরবটি ৯০ টাকা। কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা।


একটি লাউ কিনতেও গুনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা।কাঁচা মরিচের প্রয়োজন খুব বেশি নয়—কিন্তু রান্নাঘরে এর উপস্থিতি প্রায় প্রতিদিনের। এখন সেই মরিচের দাম প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি।


একজন ক্রেতার কাছে হয়তো ২০-৩০ টাকার মরিচ খুব বড় বিষয় নয়। কিন্তু একই সঙ্গে যদি বাড়ে সবজি, মাছ, ডিম, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম, তাহলে ছোট অঙ্কগুলোই মাস শেষে তৈরি করে বড় ঘাটতি।


জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শরীয়ত উল্লাহর কথায়, প্রতিদিনের বাজারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।


এটাই বাজারের নীরব চাপ। দাম বাড়ে একেকটি পণ্যে, কিন্তু তার ভার পড়ে পুরো সংসারের ওপর।--


সবজি বিক্রেতা ফারুক বলেন, ‘বেশি দামে কিনি, তাই বেশি দামে বিক্রি করি’


খুচরা বাজারের বিক্রেতাদের বক্তব্যও প্রায় একই।
সবজি বিক্রেতা আকাশ রহমানের ভাষ্য, তারা বেশি দামে পণ্য কিনছেন। তাই কম দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই।


এক কেজি সবজির পেছনে কত হাত?
একটি সবজি যখন কৃষকের জমি থেকে উঠে আসে, তখন তার সঙ্গে থাকে বীজ, সার, শ্রম, সেচ ও উৎপাদনের খরচ।


এরপর শুরু হয় আরেক যাত্রা। ট্রাকে ওঠে পণ্য। পথে যোগ হয় পরিবহন ব্যয়। পৌঁছায় আড়তে। সেখান থেকে যায় পাইকারের কাছে। শেষে খুচরা দোকানে।


ডিমও আর ‘সহজ খাবার’ নয়
পরিবারের খাবারের তালিকায় ডিম দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস। কিন্তু সেই ডিমের দামও এখন বাড়তি হিসাব দাবি করছে। লাল ডিম প্রায় ১৬০ টাকা ডজন, সাদা ডিম ১৫০ এবং হাঁসের ডিম ১৮০ টাকা।


ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি। কক মুরগি ৩১০ থেকে ৩৩০ টাকা।


গরুর মাংস প্রায় ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি।


অন্যদিকে মাছের বাজারে ‘পছন্দ’ এখন সামর্থ্যের বিষয়। মাছের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ক্রেতার চোখ এখন শুধু মাছের দিকে থাকে না। দামের দিকেও থাকে।


ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা। রুই ৪০০ থেকে ৬০০। কাতল ৩৫০ থেকে ৬৫০। চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি। পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০। শিং ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০। টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। পাঙ্গাস তুলনামূলক কম দামের হলেও সেটিও ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি।


মাছ কিনতে আসা শেখ রাসেলের অভিজ্ঞতা—আগের মতো পরিমাণে মাছ কেনা যায় না; এখন হিসাব করে কিনতে হয়।


অর্থাৎ বাজার শুধু দাম বাড়াচ্ছে না, মানুষের পছন্দের পরিধিও ছোট করছে।


শীতের সবজি আসবে, কমবে কি দাম?
শীতের মৌসুমে সাধারণত সবজির উৎপাদন বাড়ে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সুযোগ থাকে। কিন্তু উৎপাদন বাড়া আর ভোক্তার বাজারে দাম কমা—দুটি বিষয় সবসময় এক নয়। কারণ মাঠ থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত রয়েছে দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল। তাই এবারও অপেক্ষা—


শীত কি শুধু সবজি নিয়ে আসবে, নাকি বাজারে কিছুটা স্বস্তিও নিয়ে আসবে?


যদি মাঠে উৎপাদন বাড়ে কিন্তু ভোক্তার বাজারে দাম কাঙ্ক্ষিত হারে না কমে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে বাজারের ব্যাগ ছোট করে কেউ মাছের বদলে ডিম বেছে নেন। কেউ এক কেজির বদলে আধা কেজি মাংস নেন। কেউ কয়েক ধরনের সবজি বাদ দেন।কেউ মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারের তালিকা ছোট করেন।


এভাবেই দাম বাড়ার খবর ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে প্রতিটি পরিবারের খাবারের টেবিলে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com